মুক্তমত

ক্ষমতাই বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র

অলোক আচার্য

প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

গত বছরের প্রায় পুরোটা সময় বিশ্ব ছিল অস্থিতিশীল। বিভিন্ন দেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, পারমাণবিক অস্ত্রের ঝনঝনানি, হুমকি-পাল্টা হুমকি, বাণিজ্য বিরোধ এসব নিয়েই কেটেছে সারা বছর। গত বছর এশিয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব। বলা যায়, সারা বছরজুড়েই এই উত্তেজনা চরমে ছিল। পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাবনাও সামনে চলে আসে। পৃথিবীর মানুষ এই গ্রহের অস্তিত্ব টিকে থাকা নিয়েও সন্দিহান হয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার পর পরবর্তী যুদ্ধ যে তৃতীয় যুদ্ধ হবে এবং তা হলে সত্যিই এই পৃথিবীর প্রাণ অস্তিত্ব সংকটে পড়বে, তা আমরা ভালোভাবেই জানি। পৃথিবীর হাতে আরো শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। গত বছর এশিয়ার কাশ্মীর থেকে শুরু করে হংকং, সুদান, ভেনিজুয়েলা, আমাদের দেশে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা যাদের জায়গা হয়নি নিজ দেশে, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন, ভেনিজুয়েলা এ রকম আরো দেশ যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘাত, হিংসা, ক্রোধ সব মিলেমিশে গণতন্ত্রকে কব্জা করে বন্দুকের নলের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। এখন বিশ্বের লক্ষ্য হলো, অস্ত্রের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নিজের সামর্থ্য জানান দেওয়া। নিজেকে সুপার পাওয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। না হলে অন্তত নিজস্ব বলয় তৈরি করা। সেই বলয়ে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে অগ্রসর হওয়া। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভার্চুয়াল অধিবেশনে বিশ্বনেতাদের ভাষণেও উত্তপ্তের আঁচ পাওয়া গেছে। এসেছে করোনা প্রসঙ্গ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস করোনাভাইরাস নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্রর মুখোমুখি অবস্থান বিশ্বকে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের যুগে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এ স্নায়ুযুদ্ধ এড়াতে বিশ্ববাসীকে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভার্চুয়াল ভাষণে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান কাশ্মীর প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু বিশ্ব মূলত নতুন করে কোনো স্নায়ুযুদ্ধ দেখতে চায় না। দ্বন্দ্বের অবসান চায়। আর এখন দ্বন্দ্ব মানে ক্ষমতা; যা বিশ্বকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

এখন বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্র রয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। যেখানে একদিকে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যদিকে রয়েছেন জো বাইডেন। কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা ঘিরে সেখানে অনেক দিন ধরেই উত্তাল অবস্থা বিরাজ করছে। করোনাভাইরাস নিয়েও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দেওয়া বিভিন্ন সময় বক্তব্য সমালোচনায় পড়েছে। আবার নির্বাচনে পরাজয়বরণ করলেও যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন, সেই প্রতিশ্রুতিও তিনি দিতে রাজি হননি। যদি এটা ঘটে, তাহলে পরিস্থিতি সংকটে পড়তে পারে। তাছাড়া করোনা পরিস্থিতি তো কেবল আমেরিকায় নয়, বরং সারা বিশে^ই প্রাণসহ নানাবিধ ক্ষতির কারণ হয়েছে। এশিয়ায় দুই উঠতি পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। বেশ কয়েকবার আলোচনার পর এখন উভয়পক্ষই শান্ত রয়েছে। তবে তা কত দিন থাকে, সেটাই দেখার বিষয়। এ সময়ে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি রয়েছে আলোচনায়। মধ্যপ্রাচ্যে দুই প্রধান শক্তি হলো সৌদি আরব এবং ইরান। দুই দেশের নিজস্ব বলয় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব। সৌদি আরব এবং ইরানের সম্পর্ক ভালো নয়। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। পাল্টে যাচ্ছে অনেক সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ।

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে ইসরায়েলের। যে চুক্তিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন ভোর বলে উল্লেখ করেছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক চুক্তি। এই নতুন ভোরের আলোয় আরো কোনো আরব দেশ যোগ দেয় কি না, তাই এখন দেখার বিষয়। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকায় আরব লিগের সদস্য মৌরিতানিয়া ১৯৯৯ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করলেও ২০১০-এ সম্পর্ক ত্যাগ করে। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েলের সূচনার পর বাহরাইন ও আরব আমিরাত যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ উপসাগরীয় দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল।

এত দিন আনুষ্ঠানিক ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশ ছিল মিসর ও জর্ডান। তার যথাক্রমে ১৯৭৮ সালে ১৯৯৪ সালে ইসলায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এদিকে মধ্যস্থতা করার ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশংসা পাচ্ছেন। তবে নির্বাচনে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা বলা যায় না। কারণ করোনাভাইরাস এবং কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা নিয়ে তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আরব দেশগুলোর মধ্যে বহু বছরের ঐকমত্য ছিল যে, ইসরায়েলে সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক একমাত্র ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার মাধ্যমেই সম্ভব। ফিলিস্তিনিরা বলছে, নতুন এ চুক্তির ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো ওই প্রচেষ্টা ভঙ্গ করেছে। এই চুক্তির ফলে ওই অঞ্চলে পারস্পরিক সম্পর্কে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেটাই দেখার বিষয়।

এদিকে তুরস্কের প্রভাব বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। তুরস্কের আধিপত্য বাড়ার ফলে ওই অঞ্চলে নতুন হিসাব হবে। অতীতের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের কতৃত্ব অনেকটাই কমেছে। তাছাড়া সম্প্রতি দেশটির নির্বাসিত কয়েকজন ভিন্নমতাবলম্বী সৌদি নাগরিকরা ‘ন্যাশনাল আ্যাসেম্বলি পার্টি’ নামের বিরোধী দল গঠন করেছেন। ইরানের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার অভিযোগ এনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। যে চুক্তি থেকে ২০১৮ সালেই ইরানের সঙ্গে পরমাণুচুক্তি ত্যাগ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এখন আবার সেই চুক্তিকে কেন্দ্র করেই ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে। বিষয়টিতে সায় নেই ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর। কার্যত একাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ইরান চলেছে আপন পথেই। জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর চীন ও রাশিয়া থেকে অস্ত্র কিনবে ইরান এমনটাই ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ দেশ দুটির সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বেশ ভালো। ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে জাতিসংঘের আরোপিত একটি নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আগামী ১৮ অক্টোবর শেষ হতে যাচ্ছে। ২০১৫ সালে বিশ্বের ছয় শক্তিধর দেশের সঙ্গে ইরানের পরমাণু চুক্তির আওতায় এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়। এই টানাপড়েনের অবসান হওয়া প্রয়োজন। শক্তি থেকে পরাশক্তির জন্ম হয়। তারপর বিশ্বে যখন প্রভাব বিস্তারের রাজনীতি শুরু হয়; তখন দেখা দেয় অবস্থান করা পরাশক্তির সঙ্গে পরোক্ষ প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতা প্রায়ই মানবসভ্যতার টিকে থাকার জন্য শুভ হয়ে ওঠে না।

লেখক : কলামিস্ট

[email protected]

 

 

"