অলোক আচার্য

  ২৭ অক্টোবর, ২০১৯

পর্যবেক্ষণ

ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ

ক্ষুধা এবং দরিদ্রতা পারস্পরিক সম্পর্কিত একটি বিষয়। অনুন্নত এবং দরিদ্র দেশেই এই সমস্যা বেশি প্রকট দেখা যায়। পৃথিবী থেকে দরিদ্রতা দূরীকরণে বহু গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। দরিদ্রতা দূরীকরণে অবদানের জন্য এ বছর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটির) অর্থনীতির অধ্যাপক দম্পতি অভিজিৎ ব্যানার্জি এবং এস্তার ডুফলো। তাদের ২০০৪ সালে প্রকাশিত বই ‘পুওর ইকোনমিক্স’ এ বলেছেন, দরিদ্রদের অবস্থার পরিবর্তনের শুধু দক্ষতা, ইচ্ছাশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ালেই হবে না, প্রয়োজন আরো কিছু বেশি। দরিদ্রতা দূরীকরণে এ রকম বহু ব্যক্তি নতুন নতুন মতবাদ দিয়েছেন, মডেল দিয়েছেন এবং প্রয়োগ করেছেন। প্রতিটি দেশের প্রধান এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ থাকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যদূরীকরণ। এই দুটি ক্ষেত্রে উন্নতি করার পর অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ক্রমোন্নতির দিকে ধাবমান। উন্নয়নের প্রতিটি সূচকেই এ উন্নতি দৃশ্যনীয়। ক্ষুধা ও দরিদ্রতা দূরীকরণ ছিল বাংলাদেশের প্রধানতম লক্ষ্য। এ দেশে কোনো মানুষ দরিদ্র থাকবে না, কেউ না খেয়ে ঘুমাতে যাবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তানের চেয়েও ভালো। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট জিএইচআই-২০১৯ এ প্রকাশিত চলতি বছরের ক্ষুধা ও অপুষ্টির সূচকে ১১৭ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। গত বছরের তুলনায় দুই ধাপ অবনতি হলেও এ বছর সার্বিক চিত্র বিবেচনায় উন্নতির দিকেই রয়েছে বাংলাদেশ। গত কয়েক বছর ধরেই এই উন্নতি লক্ষণীয়। পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি জীবেরই রয়েছে ক্ষুধার অনুভূতি। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ প্রাণী ছুটেছে ক্ষুধা মেটানোর উদ্দেশ্যে। কেউ নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাদ্য নিয়ে উচ্ছিষ্ট ফেলে দেয় আবার সেই উচ্ছিষ্ট খেয়েই দিন কাটিয়ে দিচ্ছে অনেকে। কেউ আবার আধপেটা বা এক বেলা খাওয়ার জন্য হাড় ক্ষয় করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক প্রতিবেদনে জানায়, ১৪ শতাংশের মতো উৎপাদিত খাদ্য প্রতি বছর নষ্ট হচ্ছে, যার বেশির ভাগই মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে। মোট খাদ্যের প্রায় ২১ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। দোকানে স্থান পাওয়ার আগেই বিশ্বে নষ্ট হচ্ছে ৪০ হাজার কোটি ডলার মূল্যের খাবার। ক্রয়ের পরই বার্ষিক প্রায় ৩৭ শতাংশ প্রাণিজ পণ্য এবং এক-পঞ্চমাংশ ফল ও শাকসবজি নষ্ট হয়।

বাংলার কথা, বঙ্গবন্ধুর নাম এখন মহাকাশে পৌঁছে গেছে। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে মাঝারি আয়ের দেশে উন্নতি হওয়া আমাদের দেশ নতুন এক সাফল্য স্পর্শ করেছে। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু এত কিছুর ভেতরেও দেশ ক্রমোন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। ক্রমোন্নতির এই ধারায় বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় বাংলাদেশ অবশ্যই উন্নত দেশে পরিণত হবে। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষে আমাদের দেশকে কটাক্ষ করা সেই তলাবিহীন এই ঝুড়ির তলা আজ মজবুত। দেশের মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়েছে আমাদের গড় আয়ু। এখন আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও এগিয়েছে। অর্থাৎ উন্নতির সবগুলো ক্ষেত্রেই আমরা এগিয়ে চলেছি। বর্তমান সরকারের হাত ধরে আরো অনেক বড় বড় সাফল্য এসেছে। সেসব কাজের আগেও নানা সমালোচনা এসেছে। তারপরও সেই কাজ থেমে থাকেনি। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো পদ্মা সেতু। বাইরের দেশ যখন মুখ ফিরিয়ে নিল তখনো বাংলাদেশ হাল ছাড়েনি। হাতে হাত রেখে পদ্মা সেতু তৈরিতে লেগে গেল। যারা এত দিন হবে না, সম্ভব না বলে মুখ ফিরিয়ে হাসছিল তারা অবাক হয়ে লক্ষ করল যে কাজ শুরু হয়ে গেছে। আজ সে স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তবায়নের পথে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন হবে এই পদ্মা সেতুর কাজ সমাপ্ত হলে। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর অনেকটাই আজ দৃশ্যমান। এক দিন আমরা দেখব সেই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। সেই দিনও বেশি দেরি নয়। বিভিন্ন গবেষণায় আমাদের দেশের শক্তিশালী অর্থনীতির চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে ব্লুমবার্গ এক প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি বছর থেকে আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জনে যে ২০টি দেশ আধিপত্য দেখাবে তার মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ৮৫ দশমিক ৮ শতাংশ থাকবে এই ২০টি দেশের দখলে। বাকি ১৪ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বিশ্বের বাকি দেশগুলো। প্রতিবেদনে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে যে ২০টি সেরা দেশ বেছে নেওয়া হয়েছে সেই দুটি তালিকাতেও বাংলাদেশের নাম রয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে তা সুফল পেতে শুরু করেছে। টেকসই উন্নয়ন করার জন্য যে লক্ষ্য রয়েছে তা অর্জনের পথে।

মাঝারি আয়ের দেশে উন্নতি হওয়া আমাদের দেশ নতুন এক সাফল্য স্পর্শ করেছে। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। কিন্তু এত কিছুর ভেতরেও দেশ উন্নতির দিকে ধাবিত হয়েছে। এ দেশের অর্থনীতি হবে একসময় এশিয়ান টাইগার। দরিদ্র দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ঘটেছে। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদের মধ্যে রয়েছে জনশক্তি। এ ক্ষেত্রে চীন বড় একটি উদাহরণ। বিশাল জনশক্তি নিয়েও চীন আজ অর্থনীতি, সামরিকসহ সব দিক থেকে উন্নত দেশ। ভারত তার জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে। জনশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করার জন্য জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তোলা আবশ্যক। জনগণকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। শিক্ষিত বেকারদের অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং করেও আজ দেশের বহু যুবক-যুবতী দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এভাবে চাকরির আশায় না ঘুরে তাদের যদি স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা যায় তাহলে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি আরো তরান্বিত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্ভাবনাময়। বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী হয়েছে।

ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য একটি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। এর পেছনের কারণগুলো সমাধান করা তাই জরুরি। ২০১৫ সালে এন এজেন্ডা ফর দ্য গ্লোাবাল ফুড সিস্টেম শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এশিয়া বা আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্ব থেকে দরিদ্রতা দূর করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। আরো উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে প্রতি রাতে কমপক্ষে ৮০ কোটি মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়। বিভিন্ন দেশ এ থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভালো খাদ্য ব্যবস্থা গড়তে গ্রামাঞ্চলে উন্নত কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিয়ে যে কেবল আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোই চিন্তিত বিষয়টা এমন নয়। অনেক উন্নত দেশেই ক্ষুধা এবং পুষ্টি বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। মাথাপিছু আয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র নির্দেশ করে। প্রকৃত উন্নয়ন তখন সম্ভব হবে যখন দরিদ্রতার হার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম হব। এটা একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্যদূরীকরণে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে সারা বিশ্বের সামনে নিজের উন্নয়ন একটি মডেল। উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। তবে এসডিজি অর্জন করতে হলে অবশ্যই দারিদ্র্যের হার একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়া বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সফলভাবে এগিয়ে চলেছে।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়