মো. কায়ছার আলী
স্মরণ
শিক্ষা শান্তি প্রগতির বন্ধনে ছাত্রলীগ

ছাত্রলীগ। ঐতিহ্যবাহী একটি ছাত্র সংগঠন। একটি জীবন্ত ইতিহাস। বাংলা ও বাঙালির স্বাধীনতা ও স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্যে মূল দল আওয়ামী লীগের জন্মের এক বছর আগেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল গৌরব ও ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এ সংগঠন ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। মওলানা ভাসানী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন বলেই তার পক্ষেই অনেক অসম্ভব কাজ সম্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে আনুষ্ঠানিকভাবে এর পদযাত্রা শুরু হয়। ২৮ বছরের টগবগে যুবক, তরুণ নেতা সব সময়ের সাহসী সন্তান বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় একঝাঁক মেধাবী তরুণের উদ্যোগে গৌরব ও সৌরভ ছড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে নবযাত্রা শুরু করেছিল ছাত্রলীগ। ৬৯ বছরে ছাত্রলীগ দিয়েছে জাতির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা, মুক্তির স্বপ্ন বাস্তবায়ন, স্বাধীনতার লাল সূর্য ছিনিয়ে আনা, গণতন্ত্র ও প্রগতির সংগ্রাম বাস্তবে রূপদান। প্রতিষ্ঠালগ্নে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলীম ছাত্রলীগ’ পাকিস্তান আমলেই ‘মুসলীম’ শব্দটি বাদ দিয়ে স্বাধীন তারপর নাম হয় ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ ছাত্রদের স্বার্থ তথা অধিকার রক্ষার পাশাপাশি পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলের অনেক সংকটকালে ছাত্রলীগ ছিল আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিভিন্ন দাবি আদায়ের সংগ্রামে ঝরে গেছে বহু নেতাকর্মীর প্রাণ। প্রতিষ্ঠাকালীন ১৪ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন নাঈমউদ্দীন আহম্মেদ। ১৯৪৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আরমানিটোলায় ছাত্রলীগের প্রথম সম্মেলনে দবিরুল ইসলাম সভাপতি ও মোহাম্মদ আলী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা ৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ পরিশ্রমে যুক্তফ্রন্টের বিজয় নিশ্চিত, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। ৬৬-এর ছয় দফা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়া ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পাক-শাসককে পদত্যাগে বাধ্য করে কারাগারের বন্দিদশা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে। মহান মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের উত্তরণসহ প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে ছাত্রলীগের অসামান্য অবদান দেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।
‘শিক্ষা শান্তি প্রগতি’, ছাত্রলীগের মূলনীতি। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ঐবহফরঃৎরধ অর্থাৎ তিনের মধ্যে এক। তিনটি শব্দের সমাহার আদর্শ প্রকাশের রীতি বেশ পুরোনো। ইংরেজ দার্শনিক জন লক এ রীতি উদ্ভাবন করেন। আমাদের মহান স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সুবিচার আমেরিকায় জীবন, মুক্তি, পরে সম্পদ, কানাডায় শান্তি, শৃঙ্খলা, সুশাসন; জার্মানে ঐক্য, সুবিচার, মুক্তি, ফ্রান্সে মুক্তি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি রয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রের আদর্শ বা দর্শনের এমনই সেøাগান রয়েছে। এদিক থেকে বিচার করলে ছাত্রলীগের মূল নীতি সার্থক ও যথার্থ। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘ছাত্রলীগের ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস, ছাত্রলীগের ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস।’ বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে অনেক শীর্ষস্থানীয় জাতীয় নেতার হাতে খড়ি হলো ছাত্রলীগে। তবে স্বাধীনতার পর সংগঠনটি বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা তৎকালীন ছাত্রলীগে বেশ কজন ছাত্রনেতা সংগঠন ছেড়ে ৭২ সালে জাসদ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ওই সময় জাসদ ছাত্রলীগ নামে আলাদা ছাত্র সংগঠনও গড়ে ওঠে। এর পরেও কয়েক দফা ভাঙা-গড়ার কবলে পড়তে হয়েছে ছাত্রলীগকে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন নূরে আলম সিদ্দীকি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দীর্ঘদিন জেলে থাকা এ ছাত্রনেতার বক্তব্য শোনার জন্য ছাত্রসমাজের মধ্যে গণজোয়ার সৃষ্টি হতো। তার বাবা-মাও তাকে রাজনীতিতে উৎসাহ জোগাতেন। তার বাবা ৩০-৪০ কিমি পর্যন্ত হেঁটে বা কষ্ট করে গিয়ে ছেলের বক্তৃতা শুনতেন। ৬৭ সালে মোনায়েম খাঁ চেয়েছিলেন তাকে সারাজীবন জেলখানায় রাখতে। তিনি জানতেন, তার বাবা কখনো তাকে জেলখানা থেকে দাসখত দিয়ে বের করবেন না। সেই বাবা অসুস্থ স্ত্রীর মৃত্যু হয়ে জেলখানায় গিয়ে ছেলের সামনে কাঁদতে থাকেন। ছেলে বললেন, ‘বাবা কাঁদছ কেন?’ বাবা বললেন, ‘আজ সাদা কাগজে সই দিয়ে একদিনের জন্য তোমাকে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিলাম। কিন্তু আমার এ আবেদন মঞ্জুর হয়নি।’ ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের আইয়ুব সরকারের পতন হলে নূরে আলম সিদ্দীকি জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মায়ের কবরের পবিত্র মাটি কপালে মাখিয়ে বলেন, ‘মা যারা আমাকে তোমার পবিত্র মুখখানা শেষবারের মতো আমাকে দেখতে দেয়নি, আমি এই মাতৃভূমির মাটিকে স্বাধীন না করে আর কখনো তোমার কবর জিয়ারত করব না।’ কী অসীম ত্যাগ! যুদ্ধের সময় তিনি সারা দেশ চষে বেরিয়েছেন এবং দেখেছেন অনেক মায়ের সন্তান হারানোর আর্তনাদ, অনেক বোনের বৈধব্যের যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস, অনেক নিষ্পাপ রমণীর সতীত্ব হারানোর বেদনায় কুঁকড়ে ওঠা যন্ত্রণার কথা মিশ্রিত আছে এই মহান বিজয়ের তথা ছাত্রলীগের ইতিহাসে। সে সময়ে তিনি ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন তখন অনেক বোন বলেছে, ‘এই কলঙ্কিত জীবন নিয়ে আর বাঁচতে চাই না।’ মাথায় হাত মেখে তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘দুঃখ করো না বোন। মুক্তির সূর্য উঠবেই। সেই সূর্যের দীর্ঘরশ্মিতে মুছে যাবে তোমার মুখের ওপর ছড়ানো-ছিটানো কান্নার দাগ। সত্যি তাই হয়েছে। তারিখটি নির্দিষ্ট করে মনে নেই তবে তিনি একবার টিভি টকশোতে বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে যদি স্বাধীনতার প্রদীপ্ত সূর্যরশ্মির সঙ্গে ছলনা করা হয় তবে তার বক্ষে ধারণ করা বিস্তৃত আকাশ হলো ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুকে যদি বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে মাটিতে প্রোথিত শেকড় হলো ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুকে যদি সাগরের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তার উর্মিমালা হলো ছাত্রলীগ। তখন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহজাহান সিরাজ, সে সময় তিনি স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেছিলেন। ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রব তুলে ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা এবং ডাকসুর বিপ্লবী জি এস ছিলেন অকালেই চলে যাওয়া আবদুল কুদ্দুস মাখন। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এ চার নেতাকে ছাত্রসমাজ ভালোবেসে বা আদর করে চার খলিফা বলতেন। ডাকসু মানেই ছিল উৎসবমুখর নির্বাচন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২১ সালে জন্ম হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বাদ দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ও অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ডাকসুকে বলা হয় মিনি পার্লামেন্ট। এ মিনি পার্লামেন্ট থেকেই বেরিয়ে আসতেন দেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব। আপসহীন ও বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক গণবিরোধী শাসকশ্রেণির দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলনের ডাক দেয় ডাকসু। পুরো দেশ ও জাতি ডাকসুতে নির্বাচিতদের কাছ থেকে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। তারাই রাজনৈতিক ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে পারে। প্রথম ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯২৪ সালে আর শেষ নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালে। দীর্ঘ ২৭ বছর দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন জানি ছাত্রসংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। মনে হচ্ছে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা চলছে। কেন এ বন্ধ্যত্ব? বুঝতে পারছি না, কেন ডাকসু একেবারেই নির্জীব? ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং সামরিক শাসনের আমলেও দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের নিয়মিত নজির রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ সামরিক তন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক শাসনের নতুন সোপানে পা রাখলেও অদৃশ্য কারণে রুদ্ধ হয়ে আছে ছাত্রসংসদ নির্বাচন। ছাত্রসমাজের গণতন্ত্রচর্চায় সর্বোৎকৃষ্ট ছাত্রসংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনকে বাধ্যতামূলক করা হলে দূর হয়ে যেত জঙ্গিবাদ, মাদকের ভয়াল থাবা, টেন্ডার, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অসামাজিক কাজ। গত বছর বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করলেও আমাদের বিরলে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৭ সকাল ১০টায় বিরল উপজেলা চত্বরে মুক্তমঞ্চে সববৃহৎ ছাত্র সমাবেশে বা নেতাকর্মীদের এক পুনর্মিলনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জননেতা খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি। মাননীয় এমপি তেজোদীপ্ত কণ্ঠে সেদিন বলেন, ‘১৬ কোটি বাঙালির অনুভূতির নাম ছাত্রলীগ। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে ভরসার জায়গা ছাত্রলীগের মতো এত বৃহৎ ছাত্র সংগঠন আর পৃথিবীতে নেই। এত বেশি আত্মত্যাগ পৃথিবীতে বিরল। ‘এ দেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যে সর্বদা নেতৃত্বদান করেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ অপরাজেয়, অপ্রতিরোধ্য, অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না, দুর্দমনীয় এবং অতীত ইতিহাস ভুলে যায় না। তথ্য ও প্রযুক্তির যুগে এ দেশের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রলীগের প্রয়োজনীয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
শধরংধৎফরহধলঢ়ঁৎ@ুধযড়ড়.পড়স
"




































