পাঠান সোহাগ

  ২৬ অক্টোবর, ২০১৭

বিটি বেগুনে স্বাস্থ্যঝুঁকি তবুও চাষের অনুমতি

বিটি বেগুনে স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে। এতে দেশের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদী এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এই বেগুন উৎপাদন ও খাওয়ার ফলে মানুষ নানা ধরনের রোগব্যাধি, এমনকি ক্যানসারের মতো মরণঘাতী রোগের সম্মুখীন হতে পারে বলেও তারা ধারণা করছেন। এ কারণে বিটি বেগুন চাষের বিপক্ষে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি জানিয়ে আসছেন তারা। এসব আপত্তি উপেক্ষা করেই কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সাধারণ কৃষকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে এই বেগুনের চারা।

জানা গেছে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশের ৬৪ জেলায় প্রণোদনা হিসেবে ‘জিন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত’ (জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড বা জিএম) করা বিটি বেগুনের চারা বিতরণ করা হবে। দেশের চার হাজার এক বিঘা জমিতে চাষাবাদের জন্য মোট চার হাজার একজন কৃষকের হাতে এই চারা তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু তার আগেই নানা কারসাজিতে এই বেগুনের চারা বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় এজেন্টগুলো জনপ্রিয় জাতগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে গছিয়ে দিয়েছে কৃষকদের কাছে। বাজার সয়লাব হয়ে গেছে বিটি বেগুনে। জানা গেছে, ভারতে ও ফিলিপাইনে ইতোমধ্যে বিটি বেগুন চাষ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশে কেন উল্টো এই জাতের বেগুন চাষ করা হবে-এমন প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের।

এদিকে বাজার সয়লাব হলেও চেনার উপায় নেই কোনটি দেশি জাতের বেগুন আর কোনটি ‘বিটি বেগুন’। নিয়ম অনুসারে জিএম শস্যে ট্যাগ লাগানোর কথা। যাতে একজন ক্রেতা সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারেন। কারণ একজন ক্রেতার স্বাধীনতা রয়েছে জিএম ফসল কেনার অথবা না কেনার। এভাবে ক্রেতার স্বাধীনতা নষ্ট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবেশবাদীরা। দেশের বাজারে জনপ্রিয় নয়টি স্থানীয় জাতের বেগুনকে জেনেটিক্যালি মোডিফায়েড (জিএম) করা হয়েছে। কিন্তু ট্যাগ না থাকায় চেনার উপায় থাকছে না। ধরা যাচ্ছে না কোনটি প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ করা বেগুন। বেশির ভাগ ক্রেতা না জেনেই বিটি বেগুন কিনছেন। পরিবেশ অধিদফতরের নির্দেশনা অনুসারে বিটি বেগুনের গায়ে লেবেল বা ট্যাগ লাগানোর কথা থাকলেও বাজার ঘুরে কোথাও চোখে পড়েনি বিষয়টি।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারের সবজি বিক্রেতাদের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তারা জানান, বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বেগুনগুলোর বিভিন্ন নাম আছে। তবে এ ব্যবসায় যারা জড়িত তারা বেগুনের জাত চেনেন না। তারা জানান, ‘আমাদের দেশে যদি বিদেশি আপেল, মাল্টা ফলে লেবেল বা ট্যাগ লাগানো থাকে, কিন্তু বিটি বেগুনের ক্ষেত্রে নেই।’

ময়মনসিংহের বেগুনচাষি মো. ফরহাদ বলেন, ‘১০ বছর ধরে বেগুন চাষ করি। এবার এলাকায় বাজার থেকে বিটি বেগুন নামের চারা এনে রোপণ করেছি। এই বেগুনে সাধারণ বেগুনের তুলনায় অনেক কম পোকা ধরে। গাছ দুই থেকে আড়াই হাত লম্বা, বেগুনের আকার গোলাকার, ছোট ও দেখতে সুন্দর হয়। তবে দাম একটু বেশি।’

তিনি আরো জানান, বিটি বেগুনে কীটনাশক দু-তিনবার ব্যবহার করতে হয়। তবে বীজ চাষে খরচ বেশি। তবে বেগুনে লেবেল বা ট্যাগ লাগানোর বিষয়গুলো তার অজানা। ‘আমরা চাষ করি, চাষেই আমাদের মনোযোগ। ট্যাগ লাগাবেন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতারা।’

পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন জানান, ‘বেগুন শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, এর রয়েছে অনেক গুণ। এই সবজি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের জন্য উপকারী। উচ্চমাত্রার আঁশযুক্ত বেগুন কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে, শরীরের মেদ কমাতে, স্মৃতিশক্তি বাড়াতে ও ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে সহায়তা করে। সব ধরনের বেগুনের এই গুণ থাকে। ফলে বিটি বেগুনের কার্যকারিতাও একই থাকবে।’

এদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বিটি বেগুন নিয়ে আপত্তি করছেন দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানী, কৃষিবিদ ও পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, জিএম বেগুনের সুদূরপ্রসারী পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কায় ভারত ও ফিলিপাইনে চাষের অনুমোদন পায়নি। কিন্তু বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে চাষিরা চাষ করছেন।

জানা গেছে, ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা প্রতিরোধী বেগুনের জাত উদ্ভাবনের গবেষণা চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। জিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ফল ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা মারার জন্য বেগুনের ভেতর একটি ব্যাকটেরিয়ার জিন ঢুকিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিটি বেগুন। দুটি ব্যাকটেরিয়ার নামের প্রথম অক্ষর বি এবং টি নিয়ে জিনটির নাম দেওয়া হয়েছে বিটি জিন। বিটি জিন ঢোকানো হয়েছে বলে এর নাম বিটি বেগুন।

বারির পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘বিটি বেগুন দীর্ঘ গবেষণার ফল। এর খাদ্যমান ও রাসায়নিক উপাদান দেশি-বিদেশি উন্নত গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উপাদান পাওয়া যায়নি। পুষ্টিমান বিবেচনায় এটি প্রচলিত বেগুনের অনুরূপ। এখন পর্যন্ত এ বেগুন খেয়ে কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে আমি শুনিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিক্রির জন্য বাজারে আনা বেগুনের গায়ে লেবেল বা ট্যাগ লাগানোর জন্য কৃষকদের বারবার বলা হয়েছে। কিন্তু সেটা তারা মানছেন না।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘বাংলাদেশসহ তিনটি দেশে এই বেগুনের চাষের কথা হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে ফিলিপাইনের আদালতের নির্দেশে এবং ভারতের সরকারের আদেশে এর চাষ বন্ধ আছে। এখন বাংলাদেশে এই বেগুন চাষের চেষ্টা চলছে। দেশের স্বাস্থ্য, মৎস্য, পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকেও বিটি বেগুন চাষ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় রাজনৈতিক চাপে চাষিদের এই বেগুন চাষে নানাভাবে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে মানুষ। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।’

বাংলাদেশে বিটি বেগুন : বেগুনের উৎপত্তিস্থল এশিয়ায়, মূলত ভারত উপমহাদেশের প্রাচীন ও স্থানীয় উদ্ভিদ হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় বেগুনের চাষ হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইট অনুসারে বাংলাদেশের প্রায় ১৫ শতাংশ সবজি চাষের জমিতে বেগুনের আবাদ হয়। তবে বিটি জিন ও বিটি জিন প্রযুক্তির মেধাস্বত্ব ও মালিকানা মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি মনস্যান্টোর। ভারতীয় করপোরেট কোম্পানি মাহিকো এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন লাভ করে। বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনে বিটি বেগুন নিয়ে গবেষণা শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে। প্রকল্পটির অর্থ সহায়তা দেয় মার্কিন দাতা সংস্থা ‘ইউএসএইড’। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ২০০৫ সালের ১৪ মার্চ বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে। এর মাধ্যমে বিটি জিন ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের উত্তরা, কাজলা, নয়নতারা, শিংনাথ, দোহাজারী, চ্যাগা, খটখটিয়া, ইসলামপুরী, ঈশ্বরদী লোকাল-এ ৯টি বেগুন জাতের ভেতর। বিটি বেগুন প্রকল্প সফল করতে ২০০৫ সালে বাংলাদেশ একটি বায়োসেফটি গাইডলাইন তৈরি করে। ২০০৬ সালে জাতীয় খাদ্যনীতিতে জিএম খাদ্যকে বৈধতা দেয়। ২০১০ সালে জৈব নিরাপত্তা আইন খসড়া করে। ২০১৩ সালে বিটি বেগুন গবেষণার মাঠদিবস উদ্যাপন করে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ৩০ অক্টোবর বারি কর্তৃক ছাড়পত্রের জন্য আবেদনকৃত চারটি বিটি বেগুন জাত বিষয়ে সাতটি শর্তসহ একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি কৃষিমন্ত্রী বিটি বেগুনের চারা তুলে দেন গাজীপুর, পাবনা, রংপুর ও জামালপুরের ২০ কৃষকের হাতে। পরে দেশের ১০৬ জন কৃষককে বিটি বেগুনের চারা দেওয়া হয়।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist