বাগেরহাট প্রতিনিধি
খানজাহান আলী মাজারের দীঘির কুমিরটি হিংস্র হয়ে উঠেছে কেন

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন দীঘিতে কুমিরের বাস শত শত বছর ধরে। কথিত আছে, দীঘি খননের পর খানজাহান আলী (রহ.) এখানে দুটি কুমির ছাড়েন। সেই থেকে এখানে কুমির আছে। তবে খানজাহান আলী আমলের সেই কুমির ও তার প্রজন্ম শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ‘ধলা পাহাড়’ নামের শতবর্ষী পুরুষ কুমির মারা যায়। কিন্তু মাজারের দীঘিতে এখনো কুমির আছে। ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও দীঘিতে কুমিরের বিচরণ অব্যাহত রাখতে ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে আনা ছয়টি কুমির ছাড়া হয় এখানে। সেটার সবশেষ কুমিরটি এখনো টিকে আছে মাজারের দীঘিতে।
গত সোমবার এই কুমির দীঘির সংরক্ষিত মহিলা ঘাট থেকে আনুমানিক ৭-৮ বছর বয়সি এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায়। পরে গত মঙ্গলবার ভোরে ফাতেমা নামের শিশুটির মরদেহ ভেসে ওঠে দীঘির পূর্ব পাশে। মাজারের মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে ফাতেমাকে দাফন করা হয়। ফাতেমার মা মানসিক ভারসাম্যহীন।
শিশুটির মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে এখানে একটি কুকুরকে আক্রমণ করেছিল কুমিরটি। ওই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল লোকালয়ের একটি দীঘিতে এমনভাবে কুমির রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে।
এরই প্রেক্ষিতে বাগেরহাটের হজরত খান জাহান আলী (রহ.) মাজারসংলগ্ন দীঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটি স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল থেকে বন বিভাগ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা কুমিরটি ধরার কার্যক্রম শুরু করেন। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দীঘির পূর্বপাড়ে কুমিরটির অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে দুপুর ১২টার দিকে কুমিরটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে দীঘি থেকে তোলা হয়। পরে বিশেষ ব্যবস্থায় কুমিরটিকে গাড়িতে করে খুলনায় বন বিভাগের বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো হয়। বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, ‘জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাজারের দীঘি থেকে কুমিরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপাতত প্রাণীটিকে খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে কুমিরটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
হঠাৎ কুমির ‘আক্রমণাত্মক’ কেন
বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা বলছেন, কুমির মূলত জন্মগতভাবেই হিংস্র ও শিকারি স্বভাবের হয়ে থাকে। তবে তাদের অতিরিক্ত হিংস্র হয়ে ওঠার পেছনে প্রাকৃতিক পরিবেশ, নিজস্ব পরিবেশ রক্ষা ও মানুষের কার্যকলাপকে বিবেচনা করা হয়।
দীর্ঘ বছর ধরে কুমির নিয়ে কাজ করেন বন বিভাগের কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির। সুন্দরবনের করমজলে অবস্থিত কুমির প্রজনন ও পর্যটনকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই কর্মকর্তা মাজারের এই কুমিরের চিকিৎসায় এসেছেন একাধিকবার। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, খাবারের অভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, বিষয়টি তা নয়। আমি আমার কেন্দ্রে কুমিরকে বেশি খাবার দিয়েও দেখেছি। খেতে না পারলেও কুমির ঠিকই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এসে তা গ্রহণ করে। পরে দেখা যায়, না খেয়ে ফেলে রাখতে। এটা কুমিরের আচরণগত বৈশিষ্ট্য।’
এর সঙ্গে এই কর্মকর্তা যোগ করেন, মাজারের এই কুমিরকে সেখানে শিকার করে খেতে হয় না। এদের খাবার দেওয়া হয়। ইতিপূর্বে অসুস্থ কুমিরের চিকিৎসা করাতে গিয়ে বেশ কিছু বিষয় লক্ষ্য করেছি। সেখানে কুমিরকে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়। কারণ দূরদূরান্ত থেকে বহু লোক কুমির দেখতে মাজারে আসেন। তাদের কুমির দেখানোর জন্য এগুলো করে কিছু লোক। পাশাপাশি কুমিরের সামনে খাবার দিয়ে, জীবিত প্রাণী ফেলে আবার নিয়ে যাওয়া হয়। এসব বিষয়ের কিছু প্রভাব তো আছেই।
হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, মাছ ধরতে ওই দীঘিতে জাল দেওয়া হয়। এগুলো কুমিরের বিচরণের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে। প্রাণীটি একেবারে নিঃসঙ্গ হিসেবে আছে। সব কিছুরই প্রভাব আছে।
অব্যবস্থাপনাসহ নানা অভিযোগ : কুমির দেখিয়ে টাকা নেওয়া থেকে শুরু করে মাজারে তাবিজ বিক্রি, মানত নিয়ে বিক্রিসহ পর্যটক হয়রানির অভিযোগ আছে। সাকিব হাওলাদার নামের এক তরুণ অভিযোগ করেন, খানজাহান আলী মাজার পুরোপুরি অরক্ষিত এবং পর্যটকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই দীঘি ও মাজার স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে জিম্মি। তাদের মর্জিতেই এখানে সব চলে। মানত ও তাবিজ বিক্রির নামে চলে প্রতারণা। এই কুমিরের নামে বিভিন্ন পেজ খুলে কুমিরের বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তার।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানিয়েছেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে দীঘিতে থাকা একমাত্র কুমিরটি সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মাজারে কুমিরের ঐতিহ্য : ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ চন্দ্র মিত্রের লেখা ইতিহাস গ্রন্থ অনুসারে, খানজাহান আলীর এ দীঘিতে ‘কালা পাহাড়’ (পুরুষ) ও ‘ধলা পাহাড়’ (স্ত্রী) নামে দুটি কুমির ছাড়েন এবং লালন-পালন করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, খানজাহান আলীর মৃত্যুর পরও মাজারের খাদেম ও ভক্তরা ওই কুমির দুটিকে নিয়মিত খাবার দিতেন। ক্রমে এ কুমির যুগল বংশবিস্তার করে এবং সাড়ে ৬০০ বছর ধরে বংশানুক্রমে তারা এ দীঘিতে বসবাস করে আসছিল।
১৯৯০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মাজারের দীঘিতে খানজাহান আলী আমলের ৬টি কুমিরের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে কুমিরের মৃত্যুর ওই পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। এর আগে ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালে মাজারের দুই খাদেম কুমিরের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরে দুই দিনে দুটি কুমিরের মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালের দিকে মাজারের দীঘির একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছোট পুরুষ কুমির অন্য একটি বড় কুমিরের আক্রমণে মারা যায়। এরপর ২০০০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর খাদেমদের জালে পেঁচিয়ে দীঘির সর্ববৃহৎ একটি মাদি কুমিরের মৃত্যু হয়। ২০০৪ সালের ৪ ডিসেম্বর দীঘির দুটি মাদি কুমিরের মারামারিতে একটির মৃত্যু হয়।
কুমিরের সংখ্যা কমতে শুরু করলে ২০০৪ সালের ২৬ জুন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক থেকে ৬টি মিঠাপানির কুমির এনে এখানে অবমুক্ত করা হয়। ২০০৫ সালের ৫ আগস্ট এই ৬টি কুমিরের মধ্যে দুটি পুরুষ কুমিরের আক্রমণে দীঘির একটি পুরুষ কুমিরের মৃত্যু হয়। পরের বছর ২০০৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দীঘির আরেকটি পুরুষ কুমির মারা যায়। আর দীঘিতে থাকা খানজাহান আলী আমলের কুমিরের শেষ বংশধরটি মারা যায় ২০১৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি।
অবমুক্ত করা ৬টি কুমিরের মধ্যে দুটি কুমির মারা যায়। অবশিষ্ট ৪টির মধ্যে ২টি কুমির নিজেদের মধ্যে মারামারির পর সুন্দরবনের করমজল বন্য প্রাণী ও কুমির প্রজননকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। সুস্থ হলে ওই দুটি কুমির নেওয়া হয় সাফারি পার্কে। এরপর টিকে থাকা দুটি কুমিরের মধ্যে পুরুষটি মারা যায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। বর্তমানে দীঘিতে শুধু ১টি কুমির আছে।
"







































