হাফিজুর রহমান, ধনবাড়ী (টাঙ্গাইল)

  ০৪ জুন, ২০২৬

ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টার

কৃষি সম্ভাবনার অনন্য মডেল

টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টার একসময় একটি সাধারণ সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে গত ৩ বছরে এটি দেশের উদযান উন্নয়ন ও কৃষি সম্ভাবনার এক অনন্য মডেলে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছেন কৃষিবিদ মো. রাসেল পারভেজ তমাল। তার সুদক্ষ নেতৃত্ব, দূরদর্শী পরিকল্পনা ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টায় ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টার পৌঁছেছে নতুন উচ্চতায়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি সেন্টারটিকে শুধু চারা উৎপাদন ও বিপণনকেন্দ্র হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত মাতৃবাগান এবং বিরল দেশি-বিদেশি ফলদ, মসলাজাতীয় ও শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদের এক বিশাল সমাহারে রূপ দিয়েছেন। বর্তমানে এটি একটি জীবন্ত জার্মপ্লাজম সংরক্ষণাগার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। নির্মাণাধীন টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরিও সেন্টারটির সক্ষমতাকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।

বর্তমানে সেন্টারটিতে প্রায় ১২৭ প্রজাতির দেশি-বিদেশি মাতৃগাছ রয়েছে। শুধু আমেরই রয়েছে ৩৮টি উন্নতজাতের মাতৃগাছ। এর মধ্যে বারোমাসি কাটিমন, বারি-১১, মিয়াজাকি, ব্রুনাই কিং, কিং অব চাকাপাত, নাম ডক মাই, গৌড়মতি, ব্ল্যাক স্টোন, রেড পালমার, বানানা ম্যাংগো, আমেরিকান সুন্দরী ছাড়াও দেশীয় ল্যাংড়া, হাড়িভাঙ্গা ও হিমসাগরের মতো জনপ্রিয় জাত উল্লেখযোগ্য।

সেন্টারের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে গড়ে তোলা হয়েছে মসলাজাতীয় ফসলের সমৃদ্ধ মাতৃবাগান। সেখানে দারুচিনি, তেজপাতা, গোলমরিচ, চুইঝাল, লবঙ্গ, জয়ফল ও অলস্পাইসের মতো মূল্যবান গাছ রয়েছে। অন্যদিকে উত্তর সীমানার পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে উদযানতত্ত্ববিদের নিজ হাতে রোপণ করা ৩০টি ভিয়েতনামি বারোমাসি আঠাবিহীন কাঁঠালের গাছ আজ ফলভারে সমৃদ্ধ, যা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। পুকুরপাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল অ্যাভোকাডোর মাতৃবাগান। পাশাপাশি স্টার অ্যাপেল, ম্যাকাডেমিয়া, রোলিনিয়া, সাওয়ারসপ (করসোল), রুবি লংগান, নাশপাতি, এপ্রিকট, মিরাকল বেরি, কিউই ও ডুরিয়ানসহ নানা বিদেশি ফলের সংগ্রহশালা গড়ে তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া শতাধিক অ্যারাবিকা কফি গাছ, ড্রাগন ফল, কাশ্মীরি আনার, বিভিন্ন জাতের কমলা ও মাল্টা, বোম্বাই ও সিডলেস লিচু, চায়না-৩, বেদানা, লটকন, কোকো, জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, টপ লেডি পেঁপে এবং জাবুটিকাবা (ব্রাজিলিয়ান আঙুর) সেন্টারটিকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী বৈচিত্র্য। এখানেই শেষ নয়। ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারে রয়েছে বিপুলসংখ্যক শোভাবর্ধনকারী ও ইনডোর প্ল্যান্টের সংগ্রহ। এর মধ্যে অর্কিড, অ্যাডেনিয়াম, ক্যাকটাস, জিজি প্ল্যান্ট, এগলোনেমা, ড্রাসিনা, সাকুলেন্ট, বাগানবিলাস, গন্ধরাজ, পদ্ম, শাপলা, জবা, টগর, পাম ও বনসাই উল্লেখযোগ্য। ওষুধি উদ্ভিদের মধ্যে অর্জুন, নিম ও বহেরার মাতৃগাছও রয়েছে।

সেন্টারের নিজস্ব মাতৃগাছ থেকে উৎপাদিত চারা ও কলম সরকার নির্ধারিত সুলভ মূল্যে বিক্রি করা হয়। ফলে কৃষকরা সহজেই বিশুদ্ধ জাতের চারা সংগ্রহ করতে পারছেন। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৫ থেকে ১৭ লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব আয় করছে। মাশরুম উৎপাদন ও উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ে প্রদর্শনী স্থাপন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণে রাসেল পারভেজ তমালের ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত। তার হাতে-কলমে প্রশিক্ষণে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে বহু সফল কৃষি উদ্যোক্তা, যারা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি তার মানবিকতা, আন্তরিকতা ও জনবান্ধব আচরণ তাকে সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় করে তুলেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে কৃষক- সবার কাছেই তিনি কেবল একজন কৃষিবিদ কর্মকর্তা নন, বরং একজন নির্ভরযোগ্য কৃষিবন্ধু। ধনবাড়ী হর্টিকালচার সেন্টারের এই রূপান্তর প্রমাণ করে, সঠিক নেতৃত্ব, সুপরিকল্পনা ও নিষ্ঠা থাকলে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও সম্ভাবনার আলোকবর্তিকায় পরিণত হতে পারে। কৃষিবিদ মো. রাসেল পারভেজ তমালের এই কর্মযজ্ঞ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন নয়; এটি এ অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়