সুপ্রিয় চাকমা, রাঙামাটি
বরকল ও ফারুয়াতে ৮ দিনেও মেলেনি ত্রাণ

টানা ভারী বৃষ্টিতে বান্দরবানের বাঘাইছড়ি, বরকল ও বিলাইছড়ি উপজেলাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় বরকলের ছোট হরিণা ও বড় হরিণা এবং বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নে বসতবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয় এবং ধর্মীয় উপসনালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রথম দফায় ৬ জুলাই ও দ্বিতীয় দফায় ৯ জুলাই রাতে প্লাবিত হয়ে পানির নিচে তলিয়ে যায় ফারুয়া বাজারসহ ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বসতবাড়ি, দোকানপাট, রাস্তা-ঘাট, বিদ্যালয় এবং ধর্মীয় উপাসনালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলি জমিও। বন্যায় প্লাবিত হওয়ার আট দিন চলে গেলেও এখনো অনেকেই কোনো সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা পাননি।
অন্যদিকে বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ইউনিয়নে ত্রাণ সহায়তা পেলেও ছোট হরিণা ও বড় হরিণার বাসিন্দারা এখনো ইউনিয়ন পরিষদ বাদে আর কারো কাছ থেকে ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় টানা বর্ষণের কারণে পানির নিচে তলিয়ে যায় বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফারুয়া বাজার, গোয়াইনছড়ি, চাইন্দ্যাছড়ি, শুকরছড়ি, এগুজ্যাছড়ি, যমুনাছড়ি, উলুছড়ি, তক্তানালা ও ওরাছড়ি গ্রামের প্রায় ১২ হাজার মানুষ। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একবার ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। যাদের বসতঘর পানির নিচে তলিয়ে গেছে সেসব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার বাদ পড়েছেন ত্রাণ সহায়তা থেকে। প্লাবিত হওয়ার আটদিন চলে গেলেও এখনো সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও জেলা পরিষদের ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি ফারুয়া ইউনিয়নে। অন্যদিকে একই চিত্র বরকল উপজেলার ছোট হরিণা ও বড় হরিণা ইউনিয়নে।
গোয়াইনছড়ি গ্রামের কার্বারি নিরোচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘বিশেষ করে ফারুয়া বাজার ও সড়কের পাশে বসবাস করা পরিবার ত্রাণ পেয়েছে। যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে একটা পরিবারের জন্য কখনো পর্যাপ্ত নয়। দুর্গম এলাকা পানছড়ি, চোংড়াছড়ি ও পশ্চিম মন্দিরা ছড়া এলাকায় পানিবন্দী হয়ে এবং পাহাড়ধসে প্রায় ১০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সাইচল এলাকায় পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কিছু পরিবার। তাদের কাছে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছায়নি।’ তারাছড়ি গ্রামের বাসিন্দা শিমুল কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা ত্রাণ সহায়তা পাননি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন বাদে এখনো মন্ত্রী-এমপি-জেলা পরিষদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। আমার কথা বাদ দিলাম। আমি তো নিজেই ত্রাণ পাইনি। উপজেলা প্রশাসন থেকে যে পরিমাণ চাল, ডাল, আলু ইত্যাদি দেওয়া হয়েছে সেগুলো একটা পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়।’
সুদত্ত তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘ফারুয়া বাজার, গোয়াইনছড়ি, এগুজ্যাছড়ি, তারাছড়ি, যমুনাছড়ি, ওরাছড়ি, তক্তানালা, উলুছড়ি, চাইন্দ্যাছড়ি এলাকা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্করছড়ি, গবাইছড়ি, সাংগ্রাছড়ি, পানছড়ি এসব এলাকা তুলনামূলক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই ত্রাণ সহায়তা পাননি। দুর্গম এলাকাতেও অনেকে ত্রাণ সহায়তা পায়নি।’
বরকলের ছোট হরিণার তারেঙ্গ্যাঘাটের বাসিন্দা সুবিমল চাকমা বলেন, ‘তারেঙ্গ্যাঘাট, বাজেছড়া, বামে কুকিছড়া ও গুইছড়ি চার গ্রামে প্রায় ২০০ পরিবার ভারী বর্ষণে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো জেলা পরিষদ, এমপি-মন্ত্রী কারোর ত্রাণ সহায়তা পায়নি। তবে ভূষণছড়ার দিকে বাঙালিরা পেয়েছেন। সেখানে এমপি নিজে এসে দিয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা চার গ্রামবাসী কোনো কিছু পাইনি।’
বরকলের বড় হরিণার কুকিছড়া বাজারের বাসিন্দা প্রতি বিন্দু চাকমা বলেন, ‘শ্রী নগর বাজার, ভাইবোনছড়া, তাগলক ছড়া, কুকিছড়া চার গ্রাম মিলে কমপক্ষে ১০০ পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ বাদে আর কোনো ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে চাল দেওয়া হয়েছে তা একটা পরিবারের জন্য পর্যাপ্ত নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘অন্যান্য এলাকায় মন্ত্রী-এমপিদের দেখা গেলেও বড় হরিণাতে তাদের দেখা নেই। জেলা পরিষদেরও কোনো সহায়তা দেওয়া হয়নি।’
বড় হরিণা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিলাময় চাকমা বলেন, ‘বড় হরিণাতে বন্যায় মোট ৭৭ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ মিলে প্রতি পরিবারকে ১০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে।’
ছোট হরিণা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘ছোট হরিণার ১, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ৪৪টি গ্রামে ১০ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পিআইও এর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছিল। ত্রাণ এখনো দেওয়া হয়নি। তবে আজকে দেওয়া হবে।’
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলাপ্রশাসক (সার্বিক) রুহুল আমীন বলেন, ফারুয়াতে ১ হাজার পরিবারের জন্য ত্রাণ সহায়তা প্যাকেজিং করা হয়েছে। এর আগেও ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। ফারুয়ার জন্য নতুন করে ৩০ টন চাল পাঠানো হয়েছে। যারা একটু দূরে তারা হয়তো একটু দেরিতে পাচ্ছে। বরকলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ বাদ পড়বে না। ক্ষতিগ্রস্ত সবাই পাবে। বরকল ও বিলাইছড়ি দুই ইউএনওকে বিষয়টি জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।’
"







































