সঞ্জীব কুমার রায়, নাজিরপুর (পিরোজপুর)

  ২৩ ঘণ্টা আগে

নাজিরপুর

ভাসমান সবজি চাষে সাফল্য

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলায় কৃষকদের উদ্ভাবিত ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ এবং সবজির চারা উৎপাদন করে সফলতা অর্জনের কৌশল এখন বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল দেউলবাড়ী, কলারদোয়ানিয়া ও মালিখালী এই তিন ইউনিয়নের অধিকাংশই বিলাঞ্চল। এ অঞ্চলে মনোহরপুর, পদ্মডুবি, দেউলবাড়ী কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, বৈঠাকাটা ও মালিখালী বিলাঞ্চল যা বছরের ১২ মাসের মধ্যে অধিকংশ সময়ই ৮-৯ ফুট পানির নিচে ডুবে থাকে। পানিবন্দি এসব বিলাঞ্চলের বাসিন্দাসহ চাষিদের বছরে একটি মৌসুমের ফসলে তাদের অভাব অনটনের মধ্যে থাকতে হতো। তবে তাদের বিকল্প আয়ের পথ উদ্ভাবন করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। পানিতে ধাপের ওপর ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ, ধাপ তৈরি ও সবজির চারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত সবজি ও চারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে। লাভবান হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা। অভাব- অনটন বিদায় করে ভালো আছেন এ অঞ্চলের কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। লাভজনক হওয়ায় সহস্রাধিক কৃষক ভাসমান পদ্ধতিতে-১৮০ হেক্টর জায়গায় ভাসমান ধাপের ওপর বিভিন্ন প্রজাতির- লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, ঢেঁড়স, শিম, বরবটি, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লালশাক, পালংশাক ও মসলাসহ ৩৪ প্রজাতির সবজি চারা উৎপাদন করে এবং ওই তিন ইউনিয়নের জলাভূমিসহ বিলাঞ্চলের প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে ভাসমান নয়নাভিরাম ব্যতিক্রমী ধাপ ও মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষাবাদের ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে।

প্রায় ২৫০ বছরেরও অধিক সময় ধরে চলে আসা এ বিরল কৃষিকাজ পদ্ধতি আজ বিশ্ব স্বীকৃতি অর্জন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) থেকে ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই স্বীকৃতিপত্র বাংলাদেশ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরাও বর্তমানে জলমগ্ন এসব জলাভূমিতে এ ধরনের বিশেষ পদ্ধতির চাষাবাদের প্রশিক্ষণ, কৃষিঋণসহ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে উৎসাহিত করছেন।

উপজেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বৈঠাকাটা বাজারের আশপাশে মুগারঝোর গ্রামের জলাভূমিসহ ৭টি বিলাঞ্চলের প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমিতে নয়নাভিরাম ব্যতিক্রমী এ চাষাবাদের ব্যাপকতা চোখে পরার মতো। বর্ষার ভরা মৌসুমে অর্থাৎ আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত ৫ মাস ধরে কৃষকদের ভাসোমান কচুরিপানা দিয়ে তৈরিকৃত পানির ওপরে ভাসমান ধাপের ওপর বিভিন্ন ধরনের ৩০-৩৪ প্রজাতির শাকসবজি চারা উৎপাদন করে বিক্রি করে। আষাঢ় মাস শুরুর আগে-ভাগেই কৃষকরা ভাসমান ধাপ তৈরির কাজে ব্যাস্ত হয়ে ওঠে। কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা, টোপাপানা, গুড়িপানা ইত্যাদি জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে খড়কুটা, নারিকেলের ছোবড়ার গুঁড়া স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি করা হয় ভাসমান বীজতলা বা ধাপ। আর ভাসমান এসব ধাপের ওপরের অংশ পচে তৈরি হয় উন্নতমানের জৈব ও কেঁচো সার। প্রতিটি ধাপ ১৩০-১৫০ ফুট লম্বা এবং ৭-৮ ফুট চওড়া এবং ২-৩ ফুট উচ্চতায় বীজতলাগুলো ৮-১০ ফুট পানির ওপরে ভেলার ন্যায় ভাসতে থাকে। এক্ষেত্রে পুরুষরা ধাপ তৈরি, চারা স্থাপন, পরিচর্যা, চারা উত্তোলন ও বিক্রির কাজ করে থাকেন। পাশাপাশি নারী ও ছোট ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে বসে চারা তৈরির প্রাথমিক কাজ দৌল্লা তৈরি ও বীজের অঙ্কুরোদগম ঘটানোর কাজ করে। শ্যাওলা, পচানো ক্ষুদেপানা, নারিকেলের ছোবড়া ও কেঁচো সার দিয়ে ছোট ছোট বল আকারে তৈরি করে স্থানীয় ভাষায় একে টেমা বা দৌল্লা বলে। এর মধ্যে বীজ রেখে অঙ্কুরোদগম ঘটানো হয়। যা পরে ভাসমান বীজতলার ওপর স্থাপন করে পরিচর্যার মাধ্যমে চারায় পরিণত করা হয়।

সরজমিনে দেখা যায়, বিলাঞ্চলের ভাসমান বেডে- শসা, কাঁকরোল, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, শিম, কপি, টমেটো, পেঁপে ও মরিচের চারা ছাড়াও লালশাক, পালংশাক, মুলাসহ নানা ধরনের সবজি চারা তৈরির কাজ করছে। অবশ্য শীত শেষে পানি নিচে নেমে গেলে ওই জমিতেই বোরো ধান রোপণ করা হয়। মুগারঝোর গ্রমের চাষি ইব্রাহিম হাওলাদার (৬০) বলেন- এলাকার অধিকাংশ জমিতেই বছরে একবার ধানচাষ হয়। বাকি ৬ মাসেরও বেশি সময় পানিতে ডুবে থাকে। শুনেছি এবং অনেকটাই দেখেছি- এলাকার মানুষের অভাব অনটন তবে সবজি চাষের কারণেই আমাদের অভাব-অনটন আজ আর উপলব্ধির মধ্যে আসছে না। তিনি আরো বলেন বেডপ্রতি আমাদের ৯-১০ হাজার টাকা খরচ হয়। চারা বিক্রি করে ২১-২২ হাজার টাকা লাভ থাকবে প্রতি বেডে। এবছর তার ১৩টি বেড রয়েছে। দেউলবাড়ীর রজব আলী জানান- সপ্তাহে দুদিন বৈঠাকাটা ও দুদিন গাওখালীর বাজারে নৌকায় করে চারা বিক্রি করি। কখনো কখনো পাইকারি ব্যাবসায়ীরা বাড়ি থেকে বা ক্ষেত থেকে সবজি বা সবজি চারা কিনে নেয়। পরিবেশবান্ধব ও বিষমুক্ত হওয়ায় সবজি ও চারার ভীষণ চাহিদা রয়েছে। ফলে এসকল সবজি ও চারা ঢাকাসহ চলে যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইশারাতুন্নেছা এশা বলেন- উপজেলার মুগারঝোর এলাকায়ই ২ হাজারের বেশি ভাসমান বেডে চারা উৎপাদন করা হয় এবং তিনটি ইউনিয়নের বিলাঞ্চলের প্রায় ২ হাজার হেক্টর জায়গায় আজ বিষমুক্ত সবজি চাষ হচ্ছে যা অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়েও দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হলে উপযুক্ত মূল্য ও দ্রুত সরবরাহ হলে স্থানীয় কৃষকরা আরো লাভবান হবেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়