প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

  ১০ ঘণ্টা আগে

প্রযুক্তি

সৌরবিদ্যুৎ প্রসারে বড় নীতিগত পদক্ষেপ

বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভরতা কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। এ লক্ষ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানিতে শূন্য শতাংশ শুল্কের প্রস্তাব করা হয়েছে। জ্বালানি খাতে এটিকে একটি যুগান্তকারী নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী হবে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৪০ শতাংশের বেশি গ্যাসভিত্তিক। কিন্তু স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন ক্রমেই কমে যাওয়ায় সরকারকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে কয়লাসহ অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশলের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ধরে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এ উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। ২০৫০ সালের মধ্যে এ হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি রুফটপ, শিল্প ও কৃষি খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সরঞ্জামের উচ্চ মূল্য সৌরবিদ্যুতের বিস্তারের অন্যতম প্রধান বাধা। দেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ সৌর সরঞ্জাম- সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি সিস্টেম, চার্জ কন্ট্রোলার ও মাউন্টিং স্ট্রাকচার হলো আমদানিনির্ভর। এসব পণ্যের ওপর বিভিন্ন স্তরে শুল্ক, ভ্যাট ও কর মিলিয়ে প্রায় ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় যুক্ত হয়। ফলে প্রকল্পের খরচ বেড়ে যায় এবং ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

এ প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত বাজেটে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর সরঞ্জাম আমদানিতে শূন্য শতাংশ করহার এবং সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধে ব্যবহারকারীদের ৫ শতাংশ কর রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সরকার শুধু আমদানিতে শুল্ক সুবিধাই নয়, দেশে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের জন্যও বিভিন্ন প্রণোদনা বিবেচনা করছে।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, এ নীতি বাস্তবায়িত হলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসিক খাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারিত হবে। একইসঙ্গে রুফটপ সোলার স্থাপনের খরচ কমে যাওয়ায় সাধারণ গ্রাহকরাও উপকৃত হবেন।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মশিউর রহমান বলেন, বর্তমানে বাসাবাড়িতে সোলার স্থাপনের খরচ অনেক বেশি। কর কমলে এটি সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে। বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি কমাতেও মানুষ সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকবে।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে ছোট পরিসরে সৌরবিদ্যুতের সফল ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি মসজিদে স্থাপিত সৌরব্যবস্থার মাধ্যমে একসঙ্গে ২০টি ফ্যান ও ১০টি বাতি চালানো হচ্ছে। প্রকল্পটির ব্যয় ছিল মাত্র দেড় লাখ টাকা। এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ এলাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে আরো দৃশ্যমান করে তুলেছে।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ১ হাজার ৮০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৫১২ মেগাওয়াটই সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসে। তবে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় এ হার এখনো অনেক কম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে সৌর সরঞ্জাম উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, ইনস্টলার, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী এবং উৎপাদন খাতের শ্রমিকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি স্থানান্তর ও স্থানীয় শিল্পের বিকাশের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে প্রতি বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে এলএনজি, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে কর-সুবিধার পরিধি আরো বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের দাবি, আবাসিক, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী খাতও যেন সমানভাবে এ সুবিধা পায়।

বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসআরইএ) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আতাউর রহমান সরকার রোজেল বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের গুরুত্ব স্বীকৃতি পেলেও সব অংশীজনের প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়নি। রুফটপ সোলারের বিস্তার ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারী, আমদানিকারক এবং ক্ষুদ্র ব্যবহারকারীদের জন্যও সব সৌর পণ্যে কর শূন্যে নামিয়ে আনা এবং আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন।

সৌর খাতে সফল হতে হলে বাংলাদেশকে এখাতে পাকিস্তানের মডেল অনুসরণ করতে হবে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর ও শুল্ক সুবিধা, সহজ অর্থায়ন এবং রুফটপ সোলারের সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশটি এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সৌর সরঞ্জামে কর ও শুল্ক হ্রাস অত্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের নীতিগত সহায়তার দাবি ছিল, যা আগের কোনো সরকার বাস্তবায়ন করেনি। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারিত হবে।

তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মডেল অনুসরণের উপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার যদি কর-শুল্ক সুবিধার পাশাপাশি সহজ ঋণ, নেট মিটারিং সম্প্রসারণ, দেশীয় উৎপাদনে প্রণোদনা এবং দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়