জুয়েল রানা লিটন, নোয়াখালী
৩০ বছরের ভিক্ষাবৃত্তি, নতুন সম্বল ‘আছিয়া স্টোর’

আমার বিয়ে হয়েছিল চাঁদপুরে। স্বামী পুলিশে চাকরি করতেন। বিয়ের পর আমার একটি ছেলেসন্তান পৃথিবীতে আসে। সে পৃথিবীতে আসার কিছুদিন পর আমার স্বামী আমাদের ছেড়ে চলে যান। আমার সন্তানটি হয়েছিল শারীরিক সমস্যা নিয়ে। এরপর থেকে আমার এ সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে কখনো লাকড়ি কুড়িয়ে, কখনো পরিত্যক্ত পলিথিন সংগ্রহ করে, আবার কখনো হাট-বাজারে ভিক্ষা করে সন্তানের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। গত ঈদুল আজহার দিন সেই ছেলেও আমাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যায়। আমি এখন একা হয়ে গেছি- কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবে কথাগুলো বলছিলেন হাতিয়া উপজেলার বাসিন্দা আছিয়া খাতুন (৬৫)।
আছিয়া খাতুনের কাছে জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন তার কাছে একেকটি নির্মম লড়াইয়ের গল্প। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার তমরদ্দি ইউনিয়নের ওয়াপদা ৩ নম্বর ওয়ার্ডের (পূর্বতন ২ নম্বর ওয়ার্ড) এ বাসিন্দা। দীর্ঘ তিন দশক ধরে এক বুক কষ্ট আর অভাবকে সঙ্গী করে বেঁচে আছেন। একসময় চাঁদপুরে ছিল আছিয়া খাতুনের শ্বশুরবাড়ি। তার স্বামী আক্তার হোসেন পুলিশে চাকরি করতেন। কিন্তু এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সংসার শুরু করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিবন্ধী সন্তানটিকে আছিয়ার কোলে রেখে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান।
এরপর থেকে একমাত্র বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে শুরু হয় আছিয়ার এক অসম যুদ্ধ। কখনো লাকড়ি কুড়িয়ে, কখনো পলিথিন টোকাই করে, আবার কখনো হাট-বাজারে ভিক্ষা করে সন্তানের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিয়েছেন তিনি। শত কষ্টের মাঝেও সন্তানের প্রতি তার মমতায় কোনো কমতি ছিল না। এবার ঈদুল আজহার দিনের সে সন্তানটিও তাকে ছেড়ে চলে যান। স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন নামে এক যুবক তার অসহায়ত্ব দেখে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেন। সে আবেদন দেখে সন্তান হারিয়ে চরম অসহায় ও দিশেহারা হয়ে পড়া এ বৃদ্ধার পাশে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল। সঙ্গে সঙ্গে তাকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেন। গত ১৬ তারিখে সমাজসেবার সহযোগিতায় আছিয়া খাতুনের হাতে তুলে দেন ‘আছিয়া স্টোরের’ চাবি।
দীর্ঘ ৩০ বছর যে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন, গত ঈদুল আজহার দিন সেই ছেলেও তাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে যান। ছেলেসন্তান হারিয়ে আছিয়া খাতুন বলেন, ‘সন্তানডারে লইয়া কত কষ্ট করছি, ভিক্ষা করছি, তাও তো চোখের সামনে আছিল। এহন আমি একদম একা হইয়া গেলাম। কথা গুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।’ স্থানীয় মনির হোসেন জানান, আমরা ছোটবেলা থেকে উনাকে এভাবে দেখেছি। উনার একটা সন্তান ছিল বিশেষ প্রতিবন্ধী ঈদের দিন ওই সন্তানটি মারা যায়। বিষয়টি নিয়ে আমরা ইউএনও বারবার একটা আবেদন করলে তিনি তাৎক্ষণিক আবেদন গ্রহণ করে ১৫ দিনের মধ্যে একটি দোকান তৈরি করে দেন। আছিয়া খাতুন বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে সন্তানের শোক কাটিয়ে কিছুটা হলেও শেষ দিনগুলো সুন্দরভাবে কাটাতে পারবেন। নতুন দোকান উপহার দিয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাসেল ইকবাল বলেন, মানবিকতার জায়গা থেকে আছিয়া খাতুনকে ভিক্ষাবৃত্তির জীবন থেকে ফিরিয়ে এনে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারে এজন্য তাৎক্ষণিক একটি উদ্যোগ নিই। আমি যখন এ আবেদনটি পাই, তখন তার কথাগুলো শুনে আমি নিজেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। পরে সেই আবেদনের ১৫ দিনের মধ্যে তার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছি। তারই অংশ হিসেবে আমরা তার হাতে তুলে দিয়েছি ‘আছিয়া স্টোর’ নামে একটি দোকান। যে দোকান দিয়ে তিনি আত্মনির্ভরশীল হয়ে যেন আমাদের সমাজে বাঁচতে পারেন।
স্থানীয়রা জানান, আছিয়া খাতুনের এ জীবনসংগ্রাম শুধু একজন নারীর একা লড়াইয়ের গল্প নয়; এটি সমাজের জন্য এক বড় বার্তা। ইউএনওর এ মানবিক উদ্যোগের ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আছিয়া খাতুন হয়তো নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন। হারানো সন্তান কিংবা অতীত তো আর ফিরে আসবে না, তবে মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়ালে যে এখনো বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছা জাগে, আছিয়া খাতুন তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
"









































