আনোয়ার হোসেন, কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী)

  ১৫ ঘণ্টা আগে

জীবনযাপন

এ যেন জসীমউদ্দীনের আসমানীদের কুঁড়েঘর

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে দারিদ্র্যের করাল গ্রাসে নিষ্পেসিত হয়ে নিত্যদিনের অনাহার-অর্ধাহার আর দুরবস্থার জীর্ণ ঘরে জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে বয়সের ভারে ন্যুব্জ অসহায় দুর্গাচরণ রায়ের। এ ভাগ্যবিড়ম্বিতের জীবন প্রণালী যেন পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের আসমানীদের জীবন কবিতার হৃদয়ছোঁয়া বর্ণনাকে মানায়। যেন দেখার কেউ নেই! এ দারিদ্র্যপিড়িতের বাস উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের বড়ভিটা আবদারিয়া গ্রামের কোলঘেঁষে বহমান সেচ ক্যানেলের ধারে। তার একচিলতে জমি না থাকায় একসময় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে সেচ ক্যানেলের জলাশয়ের ধারে মাথাগোঁজার ঠাঁই নেয়। দীর্ঘ অভাব-অনটন আর নিষ্পেসিত জীবনে দিনমজুরের কাজ করে পরিবার-পরিজনের মুখে দু’মুঠো অন্ন জোটায়।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস গত ১০ বছর আগে পরম মমতায় আগলে রাখা জীবন সঙ্গিণী স্ত্রী পরলোক গমন করেন এবং ঘামের শ্রমে বড় করা এক ছেলে বিয়েশাদি করে অন্যত্র (পাড়ি জমায়) বসবাস করেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়েপড়া দুর্গাচরণ রায় জীবন সায়াহ্নে এসে এখন চরম অসহায়ত্ব ও একাকিত্বের মধ্যে অনাহার-অর্ধাহারের সঙ্গে যেন নিত্য সখ্য গড়ে উঠেছে তার। ভুতুড়ে মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় হিসেবে রয়েছে হাজারো জোড়াতালির জরাজীর্ণ ও ভাঙ্গাচোরা একটি ঘর। এ ভুতুড়ে ঘরের অবস্থা এতটাই শোচণীয় যে সেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করছেন এক অমানবিক মানবেতর জীবনবাস।

মাথায় বাসা বেঁধেছে বড় আকারের একটি টিউমার। রোগ-শোক ও বার্ধক্যের কারণে নিয়মিত কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি। ফলে আয়ের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকায় খাবার জোগাড় করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় প্রতিবেশীদের সহায়তায় একবেলা খাবার মিললেও বেশিরভাগ দিনই তাকে অনাহার-অর্ধাহারে কাটতে হয়। তার এমন নির্মম ও নিষ্ঠুর বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, খাদ্য ও বাসস্থানের অভাবে পড়ন্ত জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এ অমানবিক দুঃখ-কষ্টও মর্মস্পশী জীবনযুদ্ধের মাঝেও অন্ধ সমাজ ব্যবস্থায় ভাগ্যে জোটেনি সরকারি কোনো অনুদান (সহায়তা) বা কোনো সামাজিক সুরক্ষা। প্রবীণ বয়সের ৬৭ বছরেও মেলেনি বয়স্ক ভাতা। সব মিলিয়ে নিত্যদিনের অসহনীয় কষ্ট আর বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তিনি যেন হয়ে উঠেছেন অবহেলিত জনপদের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, নড়বড়ে ও ঠেস দেওয়া খুঁটির উপর কোনোরকমে দাঁড়িয়ে থাকা, দুর্গাচরণের একমাত্র মাথাগোঁজার ঠাঁই টিনের ঘরটি অত্যন্ত ভগ্নদশায় বেহাল হয়ে পড়েছে। এ ঘরের অধিকাংশ ছাউনির টিন মরিচায় জরাজীণ হয়ে খসে পড়েছে। টিনশূন্য ঘরে পলিথিন মোড়ানো হলেও পুরোনো হয়ে ঝড়-বৃষ্টিতে ছিঁড়ে একাকার হয়ে পড়েছে। জরাজীর্ণ টিন আর পলিথিনের অগণিত ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে অনায়াসে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করে ঘরের মেঝে হাঁটু সমান পানি জমানোসহ বিছানাপত্র ও পরিধানের পোমাকাদি ভিজে একাকার হয়ে যায়। ঘরের বেড়ার চার দিক একইভাবে যুক্ত করা হয়েছে অসংখ্য জরাজীর্ণ টিন, সুপারির পাতা, পলিথিন, পুরোনো প্লাস্টিক-চটের বস্তা, পুরোনো মশারি ও জামা-কাপড়।

এ যেন বেড়া নয়, মাকড়সার জাল। যা এর ভেতর দিয়ে অনায়াসে নানা ধরনের পোকা-মাকড়, সাপ, ব্যাঙসহ হুহু করে ঝড়-বৃষ্টি প্রবেশ করে সব মিলে এক দুরবস্থায় নিদ্রাহীন রাত কাটে। শীতকালে কনকনে বাতাস আর ঘন কুয়াশায় সৃষ্টি হয় একই অবস্থা।

কথা হলে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে দুর্গাচরণ বলেন, আমি খুবেই নিঃস্ব মানুষ। আমার খুবেই কষ্ট। এ কষ্টের সীমা নাই। ঘর-দরজা, চাল-চুলা কিচ্ছু নাই। বয়সের ভারে অক্ষম হয়ে পড়ায় কর্ম নাই, পেটে ভাত যায় না। প্রতিবেশী যা একনা দেয়, তাকে খাই। না দিলে অনাহারে থাকি।

এক বেটা (ছেলে) আছে তাও আমার উদিস খবর করে না। ঘরোত থাকাও যায় না। বৈষন-বাতাসে সেই রকম কষ্ট। আমার যে কষ্ট সেই জনায় জানে, আমি বলতে পারব না। বৈষন-বাতাস (ঝড়-বৃষ্টি) এলে কাপড়-চোপড়, পলিথিন মাথায় দিয়ে ঘরের কোণে বসি থাকি।

মেম্বার-চেয়ারম্যান কোনো সরকারি অনুদানও দেয় না। এ দুঃখের কথা কাকে কই, বয়স হইছে আশি বছরের উপরে। বয়স্কভাতার আবেদন করে অফিসে পাক পারছি মেলা। কেউ কোনো বয়স্ক ভাতাও দেয় নাই। এ যাবত কোনো খবরও নাই। যেখানে মুখের অন্ন জোটে না, সেখানে ঘর মেরামত করা প্রশ্ন উঠে না।

না বলার দুঃখ-কষ্ট লাঘবে সরকারসহ কোনো দয়ালু ও হৃদয়বান ব্যক্তি যদি আমার শেষ বয়সে একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার আশ্রয় ও পেটের খুদা মেটাতে তিন বেলা তিন মুঠো খাবারের সংস্থান করে দিত তাহলে আমি আশীর্বাদ করতাম। স্থানীয়রা জানান, উন্নত রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্গাচরণের অমানবিক জীবন সংগ্রাম জাতির জন্য বড়ই লজ্জা। তাই মানবিক সহায়তা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অসহায় দুর্গচরণের পড়ন্ত বয়সের জীবনযাত্রার কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তারা সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যাতে জীবন রক্ষায় তার জন্য দ্রুত খাদ্য সহায়তা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। এ ব্যাপারে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা লতিফুর রহমান যাচাই-বাছাই করে ছুর্গাচরণকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। অপরদিকে বয়স্ক ভাতার বিষয়ে সমাজসেবা কর্মকর্তা জাকির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্রুততার সঙ্গে ঙ্গুর্গাচরণকে বয়স্ক ভাতার আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়