নাজমুল ইসলাম, পাবিপ্রবি

  ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

দেড় যুগেও কাটেনি শিক্ষক সংকট

পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) পাঁচটি অনুষদভুক্ত ২১টি বিভাগে বর্তমান স্থায়ী শিক্ষক ১৮৪ জন। এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও এমফিল প্রোগ্রামে অধ্যয়নরত মোট শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৪০০ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সাধারণ অনুপাত ১:৩৫। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরে। এর ওপর আবার ১৮৪ শিক্ষকের মধ্যে ৪৮ জন আছেন শিক্ষা ছুটিতে। সে হিসাবে শতকরা ২৬ ভাগ শিক্ষকই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের বাদ দিলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত দাঁড়ায় ১:৪৭। অথচ আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী এই অনুপাত হওয়ার কথা ১:২০।

শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকের বিপরীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে আন্তর্জাতিক মানদ-ে আরো পিছিয়ে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্বব্যাপী উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গড় অনুপাতের ন্যূনতম মানদ- অনুযায়ী ২০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে কমপক্ষে একজন শিক্ষক থাকতে হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৪৭ শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র একজন শিক্ষক রয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টির ২১টি বিভাগের মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতে ১৯ বিভাগেই আন্তর্জাতিক মান নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রকৌশল অনুষদভুক্ত ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগ আন্তর্জাতিক মানদ- মেনে চলছে। এই দুটি অনুষদের বাকি বিভাগগুলো মানহীন। এদিকে বাকি তিনটি অনুষদের (জীব ও ভূ-বিজ্ঞান, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ) সবগুলো বিভাগই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরে। ফলে শিক্ষক সংকটে চাপ বেড়েছে বর্তমান শিক্ষকদের ওপর। অধিকাংশ বিভাগে ব্যাহত হচ্ছে ক্লাস-পরীক্ষা। বাড়ছে সেশনজট। করোনাকালীন জটের পরও শিক্ষক সংকটে জট বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে পিছিয়ে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত ফার্মেসি বিভাগের সাতজন শিক্ষকের মধ্যে চারজনই রয়েছেন শিক্ষা ছুটিতে। বিভাগটিতে স্নাতকের পাঁচটি ও স্নাতকোত্তরের দুটি ব্যাচের প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র তিনজন। এদিকে পরিসংখ্যান বিভাগেও সাতজন শিক্ষকের মধ্যে তিনজনই শিক্ষা ছুটিতে। বিভাগের সাতটি ব্যাচের প্রায় ২৮০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। এছাড়া মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের প্রায় সব বিভাগ এবং প্রকৌশল অনুষদের ইইই বাদে সবকটি বিভাগেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনুপাতে শিক্ষক নেই।

ইউজিসির ৪৮ ও ৪৯তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে আরো জানা যায়, গত ২০১৯, ২০, ২১ ও ২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪,৪০৭ জন, ৫৩৭৮ জন, ৫৪৮৭ জন এবং ৬৪০০ জন। এদিকে ২০১৯, ২০, ২১ ও ২২ সালে শিক্ষক সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৭৪ জন, ১৭৫ জন, ১৭৭ জন এবং ১৮৪ জন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ছিল যথাক্রমে ১:২৫, ১:৩১, ১:৩১ এবং ১:৩৫। বিগত বছরগুলোর বিশ্লেষিত তথ্যানুসারে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও আনুপাতিকহারে বাড়েনি শিক্ষক সংখ্যা। ফলে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষক সংকট কাটছে না। বরং ওই সংকট আরো প্রকট হচ্ছে।

এদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং লোড ক্যালকুলেশন নীতিমালা অনুসারে, একজন শিক্ষকের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা হবে ৪০ ঘণ্টা। এই কর্মঘণ্টা কন্টাক্ট আওয়ার এবং নন-কণ্টাক্ট আওয়ার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ হবে। ৪০ ঘণ্টার মধ্যে একজন শিক্ষক গড়ে ১৩ ঘণ্টা ব্যয় করবেন কন্টাক্ট আওয়ার হিসাবে। কিন্তু বিভাগ/ইনস্টিটিউটের প্রধানের সাপ্তাহিক কন্টাক্ট আওয়ার ৬ ঘণ্টা হবে। কিন্তু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট থাকার ফলে কর্মে নিয়োজিত থাকা শিক্ষকদের বাড়তি টিচিং লোড পড়ছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শিক্ষক সংকটে অনেক শিক্ষক একাধিক কোর্সের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। চাপ বেশি হওয়ায় অল্প ক্লাস নিয়েই শেষ করছেন কোর্সগুলো। ফলে কোর্স শেষ হয়ে গেলেও অজানাই থেকে যাচ্ছে অনেক বিষয়। এদিকে চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স শেষ হতে লেগে যায় পাঁচণ্ডছয় বছর। এছাড়া পাঁচ বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স (বি.ফার্ম প্রফেশনাল) শেষ করতে সময় লাগছে সাত বছর।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, তার বিভাগের মোট ৯ জন শিক্ষকের মধ্যে ৪ জনই শিক্ষা ছুটিতে আছেন। ক্লাস-পরীক্ষার দীর্ঘ সূত্রিতায় সেশনজট তীব্র হচ্ছে। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধুরা পাস করে বেড়িয়ে গেলেও আমরা আটকা পড়ে আছি। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম বলেন, আমরা ইউজিসির বাজেট সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক পাচ্ছি না। ১০০ শিক্ষকের চাহিদা জানিয়ে ১০ জন শিক্ষকও পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমান জানান, চাহিদার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকমাস আগেই সাতজন শিক্ষক দেওয়া হয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়