ব্রেকিং নিউজ

সিলেটে ভয়ংকর কিশোর গ্যাং

* তুচ্ছ ঘটনায় জড়াচ্ছে খুনোখুনিতে * সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব নিত্যদিনের ঘটনা * বাড়ছে ইভটিজিং, ধর্ষণ

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

এহিয়া আহমদ, সিলেট

সিলেট নগরে বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। ‘ছোট ভাই-বড় ভাই’ মিলে আড্ডা দিতে দিতে তারা হয়ে উঠছে ভয়ংকর অপরাধী। তুচ্ছ ঘটনায় জড়াচ্ছে খুনোখুনিতে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্বও এখন নিত্যদিনের ঘটনা। প্রতিদিন কোনো না কোনো এলাকায় কিশোরদের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটছে। যার শেষ পরিণতি অস্ত্রবাজি থেকে রক্তারক্তির মতো ঘটনা। আর এসব অপরাধে এখন অস্থির নগরীর বাসিন্দারা।

সবশেষ গত মঙ্গলবার তাঁতীপাড়া গলির সামনে ১০ থেকে ১২ জন কিশোর জড়িয়ে পড়ে মারামারিতে। এর তিন থেকে চার দিন আগে জিন্দাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে সিনিয়র-জুনিয়র নিয়ে পাঁচজন কিশোর মিলে একজনকে বেদম মারধর করে। পথচারীরা দেখে থানায় খবর দিলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এরও আগে গত ২৫ সেপ্টেম্বর এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে স্বামীকে আটকে রেখে ১৯ বছরের গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়।

এভাবে বছরজুড়ে আলোচনায় থাকছে কিশোর অপরাধীদের নৃশংসতার নানা ঘটনা। স্কুল-কলেজ ও এলাকায় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তার কিংবা দ্বন্দ্ব মেটাতে কয়েকজন কিশোর মিলে গড়ে তুলছে গ্যাং। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন স্পটে কিশোর-তরুণরা মিলে নিয়মিত আড্ডা দিচ্ছে পাশাপাশি মেয়েদেরও উত্ত্যক্ত করছে।

জানা যায়, নগরীর শাহী ঈদগাহ, কাজীটুলা, নয়াসড়ক, জেল রোড, উপশহর, শিবগঞ্জ, টিলাগড়, বালুচর, কল্যাণপুর, শাপলাবাগ, মেজরটিলা, লামাপাড়া, মাদানীবাগ, জল্লারপার, জিন্দাবাজার, লামাবাজার, মির্জাজাঙ্গাল, রিকাবীবাজার, তালতলা, তেলিহাওর, শেখঘাট, মাছুদিঘিরপার, জামতলা, সুরমা মার্কেট, বন্দরবাজার, মিরবক্সটুলা, আম্বরখানা, দর্শনদেউড়ি, রাজারগলি, হাউজিং এস্টেট, ইলেকট্র্রিক সাপ্লাই, মজুমদারি, বাঘবাড়ি, মদিনা মার্কেট, পীরমহল্লা, ফাজিলচিশতসহ নগরীর প্রায় সবক’টি এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর অপরাধের দায় নিতে হবে পরিবার আর রাষ্ট্রকেই। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের নৈতিক চেতনা ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কিশোর অভিভাবকদের অতীত বা বর্তমান হাল চিত্র তার সন্তানদের কাছেই বিতর্কিত।

আস্থার স্থানগুলো বিতর্কিত হয়ে উঠলে নীতি মূল্যবোধ বলে কিছু থাকে না। অপরাধীদের অভয়ারণ্য সর্বত্র। তাদের নিয়ন্ত্রণেই সমাজ। এ সময় পিতা বা অভিভাবকদের ভয়ে নত থাকত তার কিশোর সন্তান, এখন সেই কিশোরের কোনো অপরাধের বিচার পিতা বা অভিভাবক পর্যন্ত নিয়ে গেলে বিগড়ে যায় পরিস্থিতি। নীতি নৈতিকতার শৃঙ্খলা যে অবশিষ্ট নেই এটাই তার প্রমাণ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর হাওয়াপাড়া এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, দিন দিন কিশোর গ্যাংয়ের কারণে পাড়ায় হাঁটা-চলা দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ মিলে সংঘবদ্ধ হয়ে পাড়ার মোড়ে বসে ধূমপান করছে, একজন আরেকজনকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করছে, পাড়ার মেয়েদের ইভটিজিং করছে। এটা দেখে কেউই প্রতিবাদ করতে এগিয়ে আসে না তাদের ভয়ে। সবাই নীরবে মুখ বুঝে সহ্য করে নেয়। তারা দিন দিন লাগামহীন হয়ে পড়ছে। এমতাবস্থায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

সিলেট সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, সমাজে বেপরোয়া কিশোর গ্যাং বৃদ্ধির প্রধান কারণ হচ্ছে স্মার্টফোন। এই ফোন হাতে পেয়ে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা বিপথগামী হচ্ছে বলে আমি মনে করি। কারণ তারা বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ায় নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি আরো জানান, এসব কিশোর গ্যাং রুখতে প্রত্যেক পরিবারকে সচেতন হতে হবে। তাদের ছেলেমেয়েরা কি করছে? কার সঙ্গে মিশছে? কোথায় যাচ্ছে? এগুলোর দিকে নজর দিতে হবে! যদি তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সেটা না পারা যায়, তবে প্রশাসনের সহযোগিতা নিতে হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে অবহিত করতে হবে। ধীরে ধীরে এই দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিলে একটা সময় সমাজ থেকে কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলীর শেখ জানান, সিলেটের পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ব্যাপারে প্রশাসন সবসময়ই তৎপর রয়েছে এবং তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ওপর প্রশাসনের কড়া নজরদারিও রয়েছে। পূজায় আলাদাভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এবারের পূজায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ওপর কড়া নজরদারি থাকবে। পুলিশি পোশাকের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও পুলিশের সদস্য রয়েছেন।

 

"