অসমাপ্ত চিংড়ি খামার

উৎপাদন শুরুর আগেই লভ্যাংশ!

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

মাগুরা প্রতিনিধি

মাগুরায় ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে চিংড়ি উৎপাদন খামার নির্মিত হয়েছে। তবে দুই বছরেও তা চালু হয়নি। তাতে কী নিয়মিতই সরকারি বরাদ্দ আসছে এই চিংড়ি প্রকল্পে। আরো অবাক করা তথ্য হচ্ছে, চালু না করেই এই চিংড়ি উৎপাদন খামার থেকে লভ্যাংশ বাবদ দুই বছরে ২ লাখ ১০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমাও হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত দুই বছরে সেখানে ২ লাখ পিএল চিংড়ি পোনা উৎপাদনের পর চাষিদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে বলেও খাতা কলমে দেখানো হয়েছে।

স্বাদু পানির চিংড়ি চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮ সালে মাগুরায় চিংড়ি পোস্ট লার্ভা-পিএল উৎপাদনের জন্যে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। জেলা মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের সীমানার মধ্যে ৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের হ্যাচারিটি নির্মাণ করা হয়। যশোরের আনোয়ার হোসেন মোস্তাক ছিলেন কাজটির ঠিকাদার। ওই বছরের জুনে অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়। কিন্তু সঠিকভাবে নির্মাণ না করায় ব্যবহারের অনুপযোগী হওয়ায় দুই বছরেও এটি চালু হয়নি। তবুও চালু না হলেও অদ্ভুতভাবেই আসছে সরকারি বরাদ্দ।

স্থানীয় কর্মকর্তাদের মতে, যেহেতু বরাদ্দ আসছে তাই বরাদ্দ ধরে রাখতে উৎপাদনও দেখাতেই হচ্ছে। যদিও এই উৎপাদন কাগজে-কলমে। বাস্তবে কিছুই নেই।

সরেজমিন দেখা যায়, চিংড়ি হ্যাচারিটি তালাবদ্ধ। এর পাশে অবস্থিত খামার ব্যবস্থাপকের কার্যালয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি। অফিস সহায়ক জানান, ব্যবস্থাপক আর তিনিই এখানে স্টাফ। এছাড়া চিংড়ি খামারের জন্য আলাদা কোনো কর্মচারী নেই। ব্যবস্থাপক সরকারি কাজে বাইরে গেছেন।

পাশে অবস্থিত জেলা মৎস্য অফিসের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ চিংড়ি খামারের ভেতরে বিভিন্ন উপকরণ পড়ে আছে যত্রতত্র। ভবন আলো বাতাস নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেটি বাস্তবায়ন করেনি। হ্যাচারিতে থ্রি ফেজ বিদ্যুৎ সংযোগ অপরিহার্য হলেও লাগেনি সেটি। স্থাপিত হয়নি ওভারহেড পানির ট্যাংক, শক্তিশালী সাবমারসিবল পাম্প।

অন্যদিকে হ্যাচারি নির্মাণের দুই বছর পরও জেলায় গলদা চিংড়ি চাষে সম্পৃক্ত ১১৫ জন চাষিকে পিএল সংগ্রহের জন্যে দূর-দূরান্তে সাগর এলাকার খামারগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে করে তাদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে সবকিছু পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলেও খামার ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে খাতাপত্রে আদৌ চালু না হওয়া এই হ্যাচারিতেই দুই বছর ধরে চিংড়ি পিএল উৎপাদন দেখানো হচ্ছে। মৎস্য বিভাগ সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা গেছে, এত টাকা ব্যয়ে হ্যাচারিটি স্থাপন করা হলেও এটি চিংড়ি পিএল উৎপাদনের জন্যে আদৌ উপযুক্ত নয়। রয়েছে লবণ পানির অপ্রাপ্যতা। তারপরও প্রতি বছর এখানে ১ লাখ চিংড়ি পিএল উৎপাদন বাধ্যতামূলক করে ৮০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রকল্পের অ্যাকুয়াকালচার ইঞ্জিনিয়ার (খুলনা) আবদুল মান্নান বলেন, প্রকল্পের ডিজাইনে বিদ্যুৎ, পানির ট্যাংক কিংবা পাম্পের কথা উল্লেখই নেই। আর মাগুরা লবণাক্ত এলাকা না হওয়ায় পানির অপ্রাপ্যতার কারণে এ হ্যাচারিটি চালু করা যায়নি।

মাগুরা মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারের ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি দুই বছরে পিএল উৎপাদনের বিপরীতে ২ লাখ ১০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, এ কথা সত্যি যে, এটি মৎস্য চাষিদের কোনো কাজেই আসেনি। যেহেতু সরকারি বরাদ্দ আসছে তাই চালু দেখাতে হচ্ছে হ্যাচারিটি। শুধু তাই নয়, পিএল উৎপাদনের জন্যে বরাদ্দকৃত অর্থের সঙ্গে প্রতি বছর অন্য খাতের ২০ হাজার টাকা যোগ করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হচ্ছে আমাদের। এটা আমাদের জন্য একটা বড় চাপ।

মাগুরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম আশিকুর রহমান বলেন, নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির ট্যাংক, পাম্প সংযুক্ত না হলেও পুরোনো পাম্প দিয়েই উৎপাদনের চেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু পানিতে আয়রণের মাত্রা বেশি থাকায় সেটিও সম্ভব হয়নি। অবকাঠামোগত অসম্পূর্ণতার পাশাপাশি জনবল সংকটও প্রকট। যে কারণে খামারের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। তবে এমন অসম্পূর্ণ এবং ভুল জায়গায় তৈরি করা প্রকল্পটি নিয়ে এখনো তিনি আশাবাদী। এই মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আশা করছি, সাতক্ষীরা থেকে পানি সংগ্রহ করে আগামী বছর থেকে উৎপাদনে যাওয়া যাবে।’

 

 

"