অরূপ তালুকদার

  ১৬ জানুয়ারি, ২০২১

আর কত জিম্মি হবে সাধারণ মানুষ

নানাভাবে ব্যবস্থা গ্রহণের পরও দেশের দুর্নীতিবাজ চক্রগুলোকে কিছুতেই যেন দমন করা যাচ্ছে না। তাদের কারণে বারবার ব্যাহত হচ্ছে সরকারের বিভিন্ন স্থানে গৃহীত উন্নয়ন কর্মসূচি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে নবনির্মিত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য দুর্নীতির মাধ্যমে অস্বাভাবিক মূল্যে বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য দ্রব্যাদি ক্রয়ের বিস্তারিত খবর।

সর্বশেষ একনেক বৈঠকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত প্রস্তাব তোলা হলে প্রধানমন্ত্রী ওই প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বাড়ানোয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এই প্রকল্প সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সাংবাদিকদের জানান, ২০১২ সালে ২৭৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দসহ কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকে পাস হয়। ২০১৪ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ করার জন্য বারবার সময় ও অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছিল। সেই ভাবে এবারও আবার উক্ত প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাড়ানোসহ ৬৮২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয় বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব করা হয়।

------এ ক্ষেত্রে অবাক বিষয়টি হচ্ছে, বিগত আট বছরে এই প্রকল্পটির কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ শতাংশ। পরিষ্কার বোঝা যায়, এই প্রকল্পটি ঘিরেও সেই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট তাদের ইচ্ছামতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিগত ২০১৮ সালে বড় ধরনের কিছু অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিলে পরবর্তীকালে কয়েকজন কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু এতসব কিছুর পরও এবারে পুনরায় বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য দ্রব্যাদি ক্রয়ের জন্য যে প্রস্তাব রাখা হয়েছিল, তা ছিল বিস্ময়কর। কারণ প্রায় সবকিছুরই মূল্য ধরা হয়েছিল প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে দু-চারশ গুণ বেশি। তার বিস্তারিত বিবরণ বিভিন্ন গণমাধ্যম এবং সংবাদপত্রে এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে।

এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, আট বছর ধরে যে প্রকল্পটিতে নানা টালবাহানায় সরকারের কোটি কোটি টাকা বিভিন্নভাবে লোপাট হয়ে যাচ্ছে, তা হয়েছে কাদের স্বার্থে এবং সহযোগিতায়? আর এটা বুঝতে এত সময় লাগল কেন? নিশ্চিতভাবে বলা যায়, দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা এবং বিগত দিনগুলোতে এ ধরনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না করার কারণেই বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস পাচ্ছে বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতিবাজ চক্র।

বলা বাহুল্য, এ ধরনের ঘটনা আমাদের স্বাভাবিকভাবেই রূপপুরের পারমাণবিক বালিশ ও মাদারীপুরের এক হাসপাতালের পর্দা কেনার ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন, বিভিন্ন প্রকল্পের কোনো কোনো প্রস্তাবে পরিকল্পনা কমিশনের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের জন্য সময় বৃদ্ধি এবং নানা অজুহাতে ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা বন্ধ না হওয়ার অর্থই হচ্ছে আড়াল থেকে দুর্নীতিবাজদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাওয়া। তাই এই ধরনের তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান করোনা মহামারির কারণে সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ের চিন্তা থেকে দীর্ঘমেয়াদি এবং কম গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু প্রকল্পের কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু প্রকল্প অগ্রাধিকারের বিবেচনায় বাস্তবায়নের জন্য চলমান রাখা হয়েছে। আর তাই হয়তো দুর্নীতিবাজদের সিন্ডিকেট এই করোনাকালেও সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে এই স্বাস্থ্য খাতেই। এদেরকে দমন করতে না পারলে দেশের সাধারণ মানুষের জিম্মিদশা যেমন কমবে না, তেমনি সরকারও চোখের আড়ালে থাকা এসব দুর্নীতিবাজের কবল থেকে মুক্ত থাকতে পারবে বলে মনে হয় না।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ২০২০ সাল করোনা মহামারির কারণে সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ছিল এক বিভীষিকাময় সময়। জানি না ২০২১ সাল আমাদের জন্য শুধু নয়, এই পৃথিবীর মানুষের কাছে কী বার্তা নিয়ে এসেছে? তবে নববর্ষের শুরু থেকেই কোভিড-১৯ ভাইরাস পুনরায় যেভাবে ইউরোপ ও আমেরিকাকে ধরেছে তাতে মনে হয় না এ বছরটাতেও পৃথিবীর মানুষ এই ভয়ংকর ভাইরাসের কবল থেকে সহজে মুক্তি পাবে। আর এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এ পর্যন্ত করোনা মহামারি এবং তার আতঙ্ক দেশের কোনো মানুষকে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে দেয়নি। বরং উপহার দিয়েছে এক নিউ নরমাল লাইফ; যা ছিল আমাদের জন্য একেবারেই অভাবিত।

হয়তো সে কারণেই দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা, আমরা এখনো আমাদের নিয়তির ক্রীড়নক হয়ে আছি। নিয়তি আমাদের যেন সহজে ছাড়ছে না। কোনো দিন আমরা কি কল্পনা করতে পেরেছি কোভিড-১৯ ভাইরাসের মতে, কোনো জীবন বিপন্নকারী ভাইরাস আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে একেবারে তছনছ করে দেবে!

এদিকে, অন্যান্য সময়ের মতো কদিন আগে গত বছর দেশজুড়ে যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে মৃত ও আহতদের সংখ্যা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। তাতে দেখা গেছে, গত এক বছরে দেশব্যাপী সড়কপথে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৮৯১টি, যাতে নিহত হয়েছে ৬,৬৮৬ জন এবং আহত হয়েছে ৮,৬০০ জন। এর পাশাপাশি নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) রেল ও নৌপথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার যে বিবরণ সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায়, গত বছর বিভিন্ন সময়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০৯২টি, এতে মৃত্যু ঘটেছে ৪৯৬৯ জনের, আহত হয়েছে ৫০৮৫ জন। অথচ গত বছরের বেশির ভাগ সময়েই সড়ক এবং মহাসড়ক পথে যানবাহনের চলাচল ছিল খুবই সীমিত। কারণ করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে সরকারি নির্দেশেই অফিস-আদালত এবং শিক্ষাঙ্গনসহ দোকানপাট পর্যন্ত প্রথমদিকে লকডাউন ও ছুটি ঘোষণা করে পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিন-চার মাস পরে ধীরে ধীরে অফিস-আদালত এবং কিছু কিছু দোকানপাট খুলতে শুরু করে। সেই কারণে স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাঘাটে যানবাহন চলাচল ছিল খুবই কম। তার পরও বিভিন্ন রুটের দুর্ঘটনা এবং তাতে নিহত ও আহতের পরিসংখ্যান দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না।

এদিকে, জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। সেই সঙ্গে অঙ্গীকার ছিল, দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান দেখে তাদের সেই ঘোষণা অন্তত আমাদের দেশে কতটা সফল হয়েছে, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বলতে বাধা নেই, আমাদের দেশে দিনের পর দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। এটা এখন যেন একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে দিনের পর দিন প্রচুর সভা-সেমিনার ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, কিন্তু পরবর্তীকালে তাতে বলার মতো তেমন কোনো কাজ হয়েছে বা হচ্ছে, অবস্থাদৃষ্টে এমনটা মনে হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বছরের পর বছর সড়ক নিরাপত্তা এবং সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নানা ধরনের কাজ করেছেন, বিভিন্ন কৌশল ও কার্যক্রমের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা আনার চেষ্টা করেছেন, তাতেও কি খুব একটা কাজ হয়েছে? এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কোথাও পাওয়া যাবে না।
প্রসঙ্গত, উল্লেখ করা যায়, ২০১৯-এর সেই ‘সড়ক পরিবহন আইন’-এর কথাও সেই আইন বাস্তবায়ন করতে কত সময় ধরে কত কাঠখড় যে পোড়াতে হয়েছে, সে কথা সবাই জানে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলো যে কত শক্তিশালী তা বোঝা যায় যখন তারা যেকোনো দাবি নিয়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়। তখন অসহায়ভাবে যাত্রীরা তাদের খামখেয়ালির শিকার হয় এবং দিনের পর দিন জিম্মি হয়ে থাকে ও ভুক্তভোগী ছাড়া সেই দুর্ভোগের কথা কাউকে বোঝানো যাবে না। এখানে সবচেয়ে বড় কথাটা হচ্ছে, সড়ক পরিবহন সম্পর্কিত যে আইন এখন বলবৎ রয়েছে, সে আইনকি যথাযথভাবে প্রয়োজনবোধে প্রয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে? মনে হয় না।

আমরা সবাই জানি, বেশ কিছু আগে থেকেই দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ভ্যানসহ সব রকমের ধীরগতির ছোট ছোট যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে আইন ঠিকভাবে মানছে কি কেউ? ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, দিনের পর দিন সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হচ্ছে না। তাদের জিম্মিদশাও আর কাটছে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক
[email protected]

পিডিএসও/ জিজাক

রূপপুর পারমাণবিক,প্রকল্প
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close