জাহিদুল হক মনির, শেরপুর

  ০২ মার্চ, ২০২১

বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি

২৫ মার্চের পরই প্রতিরোধ গড়ি না.গঞ্জে

বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি, বীর-প্রতীক। ছবি : প্রতিদিনের সংবাদ

ধানুয়া-কামালপুর যুদ্ধজয়ের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সি, বীর-প্রতীক। জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় গ্রামের এক কৃষক পরিবারের সন্তান জহুরুল। বর্তমানে তিনি শেরপুরের শ্রীবরদী পৌর শহরের পশ্চিম বাজার মহল্লার বাসিন্দা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জামালপুরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দুর্গে আঘাত হেনে তা মুক্ত করেছিলেন যে অসীম সাহসী বীররা, তাদের মধ্যে অন্যতম তিনি।

একাত্তরে জহুরুল ছিলেন ২৬ বছরের টগবগে তরুণ। আজ বয়সের ভারে অনেকটাই শান্ত। তবু সে সময়ের দুঃসাহসী ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠেন তিনি। ফিরে যান সেই অগ্নিঝরা দিনে। জহুরুল হক মুন্সি বলেন, ‘আমি নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে শ্রমিক হিসেবে কাজ করি। ১৯৬৪ সালে হঠাৎ মনে করি সামরিক প্রশিক্ষণ নেব। পরে ডকইয়ার্ড থেকে তিন মাসের ছুটি নিয়ে চলে যাই আনসার ক্যাম্পে। অবশ্য ছুটি নেওয়ায় খুব একটা আর্থিক ক্ষতি হয়নি। কারণ প্রশিক্ষণকাল তিন মাসে মাসিক পঁয়তাল্লিশ টাকা করে দেওয়া হয় আমাকে। পরের বছর ১৯৬৫ সালে সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় আবার এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিই। সে প্রশিক্ষণই কাজে লাগে একাত্তরে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের হামলার খবর নারায়ণগঞ্জে পৌঁছালে আমিসহ কিছু শ্রমিক রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করি। ব্যারিকেড ভাঙতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ট্যাংক নারায়ণগঞ্জে ঢোকার খবর পেয়ে ডকইয়ার্ডের অস্ত্রখানার তালা ভেঙে ৩০টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল লুট করে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করি।’


আরও পড়ুন : সেনাপ্রধানের পরিবারকে ‘মাফিয়া’ ট্যাগ কোন উদ্দেশ্যে?


জহুরুল হক বলেন, ‘২৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জ বন্দর ও শহরে তুমুল যুদ্ধের একপর্যায়ে টিকতে না পেরে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। ওই সময় সেখান থেকে থ্রি নট থ্রি রাইফেলটি নিয়ে এলাকায় চলে আসি। এরপর ১১ নম্বর সেক্টরের অধীনে কামালপুর রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই।’ তিনি জানান, ১১ নম্বর সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার মাহেন্দ্রগঞ্জ ক্যাম্পে প্রথমে সেতু-কালভার্ট উড়িয়ে দেওয়ার ট্রেনিং নেন। পরে যুদ্ধের ট্রেনিং নেন তুরায়। এরপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন চেরাপুঞ্জিতে।

জহুরুল হক মুন্সি বলেন, ‘৬ নভেম্বর গাইবান্ধার তৎকালীন ট্রেজারিতে পাকিস্তানি সেনাক্যাম্পে কলা বিক্রেতা সেজে কলার ভেতর বিষ মিশিয়ে ২৮ সেনাকে হত্যা করি। সে সময় ৩০ পাকিস্তানি সেনার জন্য ৩০টি কলা নিয়ে গেলেও দুজন কলা না খাওয়ায় বেঁচে যায়।’

তিনি জানান, মিত্রবাহিনীর সহায়তায় ১৩ নভেম্বর কামালপুর-বকশীগঞ্জ সড়কে ঝোড়ার পাড়ে তার নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ৬টি জিপ উড়িয়ে দিয়ে ১১২ সেনা হত্যা করেন। সেই সঙ্গে ১৩ সেনাকে জীবিত অবস্থায় ধরে পাশের কর্ণঝোড়া পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে গাছের সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে মারা হয়। ওই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর মেজর রতন সিংসহ চারজন মুক্তিযোদ্ধা নিহত এবং ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর ২০ সদস্য আহত হন।

জহুরুল হক বলেন, ‘চিলমারী, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, কুড়িগ্রাম, কামালপুর ও জামালপুর শহরে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমাকে মুক্তিবাহিনী থেকে মিত্রবাহিনীতে স্থানান্তর করে। ব্রিগেডিয়ার বাবাজি ও মেজর জেনারেল নাগরার নেতৃত্বে নভেম্বরের প্রথমদিকে বকশীগঞ্জের কামালপুর এলাকায় মাইন পুঁতে গাড়ি উড়িয়ে পাকিস্তানি মেজর আইয়ুবকে হত্যা করি। ১৪ নভেম্বর কামালপুরের ঝড়াইপাড় এলাকায় তুমুল যুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬টি গাড়ি বিধ্বস্তসহ ১১২ সেনাকে মেরে ১৩ জনকে ধরে নিয়ে কর্ণজোড়া বাজারে টাঙিয়ে মেরেছি।’

পিডিএসও/হেলাল

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
বীর মুক্তিযোদ্ধা,জহুরুল হক মুন্সি,শেরপুর
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close