reporterঅনলাইন ডেস্ক
  ০৫ মার্চ, ২০২১

জঙ্গলে বউ খুঁজে না পেলে সারাজীবন অবিবাহিত থাকতে হয়

পৃথিবীতে বৈচিত্র্যের শেষ নেই। যে প্রান্তেই যান না কেন পরতে পরতে রয়েছে ভিন্নতা। সঙ্গে অদ্ভুত সব সংস্কৃতি। সবচেয়ে বেশি ভিন্নতা দেখা যায় আফ্রিকার দেশগুলোতে তিন কোটি দুই লক্ষাধিক বর্গকিলোমিটারের আয়তনে আফ্রিকাও তেমনি বিস্ময়ের অপর নাম। বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বর্ণমালার আবিষ্কারক এই মহাদেশকে বলা হয় সভ্যতার জননী।

আফ্রিকার কঙ্গোতে ওলেম্বা উপজাতির বিয়ে নিয়ে রয়েছে অদ্ভুত সব নিয়ম কানুন। এখানে বৌয়ের মূল্য ধরা হয় ৮টা তামার ক্রশ, ৩৫টা মোরগ এবং ৪টা কুকুর। এই দেশের বান্ডা গোত্রের মেয়েরা একটি কাঁচা আস্ত মুরগির বাচ্চা খেয়ে বিয়ের যোগ্যতা দেখায়। সঠিক রীতি অনুযায়ী খেলে বিয়ের যোগ্য বলে গণ্য হয়। পরবর্তী এক বছর সেই কনেকে পরিবার অতি আদর যত্নে রাখে। ইথিওপিয়ায় কোনো মেয়েকে পছন্দ হলে প্রপোজ নয়, তুলে নিয়ে বিয়ে।

সেখানে প্রায় ৬৯ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় এভাবেই। রুয়ান্ডাতে ওয়াটুসি গোত্রের বিয়েতে বর-কনে সবার উপস্থিতিতে মুখোমুখি দাঁড়ায়। বর-কনে উভয়ে কুলির পানি একে অন্যের গায়ে ছিটিয়ে দিলে বিয়ে হয়ে গেল। রুয়ান্ডাতে আরেকটি সম্প্রদায়ে বর নিজ হাতে কনের মুখ চুন দিয়ে সাদা করলে বউ হয়ে যায়। ইথিওপিয়ার গাল্লা গোত্রে বিয়ের বর কনেকে কোলে তুলে পানি ভরা একটি বড় পাত্রের উপর ফেলে। জোরে আওয়াজ হলে বিয়ে পাকাপোক্ত।

তবে ভারতের কেরলের আদিবাসীদের রয়েছে বিয়ে নিয়ে আরেক মজার রীতি। তাদের বিয়ে করতে হলে বউ খুঁজতে হবে জঙ্গলে গিয়ে! অবাক হচ্ছেন নিশ্চয়? অবাক হবেন বৈকি! বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিয়ের ভিন্ন রীতির প্রচলন রয়েছে কিন্তু এমন কখনও শুনেছেন যে বিয়ে করতে হলে জঙ্গল ঘেঁটে বউ নিয়ে আসতে হয় হবু বরকে? 

এমন রীতি এক সময় প্রতিবেশী দেশ ভারতেই ছিল। এখন জঙ্গলের অভাবে ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে যা। মুথুভান সম্প্রদায়ের ছেলেদের বিয়ের আগে এ ভাবেই জীবন বাজি রেখেই বউ খুঁজে আনতে হত। ভারতের কেরলের আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে মুথুভান হল একটি। সম্ভবত তামিলনাড়ুর মন্দির শহর বলে পরিচিত মাদুরাই থেকে তারা কেরলে এসে পৌঁছেছিলেন।

সে সময় মুথুভান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিয়ের রীতি সারা গ্রাম উপভোগ করত এক সপ্তাহ ধরে। কারণ বিয়ের আগে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হত হবু কনেকে। হবু বরকে নিজের সাহসিকতার প্রমাণ দিতে হত। গভীর জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজে বার করে আনতে হত হবু কনেকে। তারপরই তাদের বিয়ে হত।

হবু বর যদি কনেকে খুঁজে বের করতে না পারতেন তা হলে তাকে ব্যর্থ হিসেবে ধরে নিতেন গ্রামবাসী। সে ক্ষেত্রে হবু কনের জন্য আলাদা পাত্রের খোঁজ শুরু হত। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হওয়ার পর হবু কনের বন্ধুরাই তার মা-বাবার অনুমতি নিয়ে তাকে জঙ্গলে লুকিয়ে রাখতেন।

হবু কনে বিয়ের সাজেই বন্ধুদের সঙ্গে রওনা দিতেন গভীর জঙ্গলে। বন্ধুরা সেখানে তাকে আগলে রাখতেন এবং তার যাতে কোনো ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের সেসময় একমাত্র লক্ষ্য। এদিকে হবু বরও দলবল নিয়ে হাজির জঙ্গলে। কনের খোঁজে হন্যে হয়ে জঙ্গলে খোঁজ করতে শুরু করতেন। হবু কনেকে খুঁজে পেতে অনেকেরই দিনের পর দিন জঙ্গলেই কেটে যেত।

নানা রকম বিপদের সম্মুখীনও হতে হত তাদের। কিন্তু ভয়ে পিছিয়ে আসতে পারতেন না। হবু কনেকে খুঁজে না পেলে গ্রামবাসীর কাছে তার সম্মান চলে যাবে এবং সারাজীবন অবিবাহিতই থাকতে হবে। যে দিন হবু কনেকে খুঁজে পাবেন সে দিনই জঙ্গলের মধ্যে তাদের বিয়ে দেয়া হবে। সঙ্গে থাকা বন্ধুবান্ধবরাই বিয়ের ব্যবস্থা করে।

লাল চুড়ি এবং নতুন শাড়ি পরিয়ে বিয়ে সারতেন বর। এরপর সেই জঙ্গলেই তাদের একসঙ্গে রাত কাটাতে হবে। শুধু তাই ই নয়। নবদম্পতি থাকবেন গাছের উপর ঘর বেঁধে। পর দিন সকালে নববধূকে নিয়ে গ্রামে ফিরে আসবে বর। আনন্দে আত্মহারা গ্রামবাসীরা মেতে যেতেন উৎসবে।

এখনও কেরলে এই আদিবাসী সম্প্রদায় রয়েছে। তবে জঙ্গলের অভাবে বিয়ের এই আদি প্রথা প্রায় হারিয়েই গেছে। বসতি স্থাপনের জন্য জঙ্গল কেটে সাফ করা হচ্ছে নির্বিচারে। জঙ্গলের অভাবে এই প্রথাও দিন দিন মুছে যাচ্ছে। সম্প্রতি কেরলে ‘মুথুভান কল্যানম’ নামে এটি ছবি মুক্তি পেয়েছে। ছবিটি মূলত হারিয়ে যেতে বসা এই প্রথা নিয়েই তৈরি। তাতে এক মুথুভান সম্প্রদায়ের মানুষ তার নাতিদের কাছে পূর্বপুরুষদের এই প্রথা গল্প বলে শোনাচ্ছেন। চাইলে এখনোই দেখে নিতে পারেন সিনেমাটি। কয়েক ঘণ্টার জন্য হারিয়ে যেতে পারেন বউ খোঁজা দলের ভিড়ে।

পিডিএসও/ জিজাক

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
অবিবাহিত,বউ,জঙ্গল
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close