হাজী সেলিমের দখলে জবির ‘তিব্বত হল’

নাম বদলে স্ত্রীর নামে ‘গুলশান আরা সিটি’

প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২০, ১৫:০৭

রায়হান তন্ময়, জবি

ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অর্পিত সম্পত্তি শাখার তথ্য অনুয়ায়ী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) বেদখলকৃত ১২টি হলের মধ্যে একটি হলো ‘তিব্বত হল’। বর্তমানে হলটি ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের দখলে। ২০০১ সালে হলটির অবকাঠামো পরিবর্তন করে স্ত্রীর নামে ‘গুলশান আরা সিটি’ নামক একটি বহুতল মাকের্টে পরিণত করা হয়। 

শিক্ষার্থীরা হলটি উদ্ধারে বহুবার আন্দোলন করে সরকারের আশ্বাস পেলেও আজও তা বেদখলে। ২০০৯ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ হল উদ্ধারের দাবি জানায়। 

প্রায় চৌদ্দহাজার বর্গফুটের ‘তিব্বত হলটি’ যা দখলদাররা ব্যবহার করছে তা প্রশাসনের সহযোগিতায় উচ্ছেদ করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা প্রতিষ্ঠায় হল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণ পরিকল্পনায় হলগুলো রয়েই গেল বেদখলে। বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনও হলগুলো উদ্ধারে নেয়নি কোনও উদ্যোগ।  

তিব্বত হলের বিষয়ে জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমার এ বিষয়ে কোন মতামত নাই। তুমি আমার সাথে সরাসরি দেখা কর।

দখলকৃতহলগুলোর বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমকে ড. মীজানুর রহমান জানান, এগুলো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কখনো মালিকানা ছিল না। এগুলো হিন্দুদের পরিত্যক্ত বাড়ি, ছাত্ররা এখানে থাকত। তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ কর্তৃপক্ষ হলগুলোর কোন কাগজপত্র আমাদের দেয়নি।

জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ) বেদখলকৃত হলসমূহে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বসবাস করে আসছিলেন। ওই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি আরমানিটোলায় স্থানীয়দের সঙ্গে শহীদ আব্দুর রহমান হলের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষেও পর তিনটি বাদে বাকি হলগুলো বন্ধ করে দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে পাটুয়াটুলীর ওয়াইজঘাট ৮ ও ৯ নম্বর জিএল পার্থ লেনের ‘তিব্বত হল’ একটি। শিক্ষার্থীরা নব্বইয়ের দশকে একবার হলটি ফেরত নিতে গেলে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে স্থানীয়রা ওই ভবনের দোতলায় আগুন দিলে তখনকার অধ্যক্ষ ড. হাবিবুর রহমান শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনেন। পার্থ লেনের বিভিন্ন স্থানে ২০১১ সাল পর্যন্ত ‘তিব্বত হল’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা গেলেও শিক্ষার্থীরা আর সেখানে ফিরতে পারেননি।

সর্বশেষ ২০১৪ সালে জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা হলটি ‘ঘেরাওয়ে’ গেলে হাজী সেলিমের সমর্থকরা হামলা করে এবং পুলিশ লাঠিপেটা ও গুলি করে। ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান নাসিরউদ্দীন গুলিবিদ্ধসহ তিন শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এসময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধার আন্দোলনে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। 

সাধারাণ শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, দখলকৃত হলগুলো উদ্ধারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ফলে আমরা যারা মেসে থাকি তাদের কষ্টও লাঘব হতো পাশাপাশি খরচাও বেচে যেত। কারণ আমাদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হল উদ্ধার করতে আন্দোলন করে। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকেও এ হল উদ্ধারে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তা আর হয়নি। সরকারের উচিত এ জায়গা উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা।

হল উদ্ধার ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এফ এম শরীফুল ইসলাম জানান, ২০১৪ সালের হল উদ্ধার আন্দোলন তীব্র্র হয়। সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হল উদ্ধার কমিটি গঠন করা হয়।

২০০৬ সাল থেকে ২০১১ এর মধ্যে হাজী সেলিম গুলশান আরা সিটির অবকাঠামো পরিবর্তন করে দোকান হিসাবে পজিশন বিক্রি করে দেয়। তখন হল উদ্ধার আন্দোলনে হাজার হাজার ব্যবসায়ীদের সাথে আমাদের মুখোমুখি হতে হয়। তাই আমরা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবসায়ীদের সাথে ওপরে উঠতে পারি নাই।

হল উদ্ধারে সরকার কর্তৃক গঠিত উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হল উদ্ধার কমিটির আহ্বায়ক জগন্নাথ কলেজ ছাত্রসংসদের সাবেক ভিপি ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল উদ্ধারের জন্য একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়া হয়েছে। কয়েকটি হল উদ্ধারও হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এ বিষয়ে কোন খোঁজখবর না রাখায় হলগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। 

গুলশান আরা সিটি মার্কেটের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হাজী মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘মার্কেটটি কখনও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিল না। এটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছিল না এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমাদের সে সময়ে একটি চিঠিও দিয়েছেন।’

পিডিএসও/এসএম শামীম