কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাচ্ছেন আজ
তিস্তা এনআরসি সীমান্ত হত্যা তুলবে ঢাকা

শেখ হাসিনার নয়াদিল্লি সফরে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, আসামের নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) এবং সীমান্ত হত্যার প্রসঙ্গ তুলবে বাংলাদেশ। তিন দিনের ভারত সফরে আজ বৃহস্পতিবার সকালে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে নয়াদিল্লি যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তিনি।
গতকাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্কের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। এই সফরে বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হবে বলে জানান তিনি। তবে কী কী বিষয়ে চুক্তি হবে, তা স্পষ্ট করেননি। এর কারণ ব্যাখ্যায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এখনো সব কিছু চূড়ান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ১০ থেকে ১২টি চুক্তি হবে।
ভারত ও বাংলাদেশ বর্তমানে ‘সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক’ পার করছে বলে অনেকে মনে করেন। গত ১০ বছরে দুই দেশের মধ্যে শতাধিক চুক্তি হয়েছে, যার ৬৮টিই হয়েছে গত তিন বছরে। কয়েক দশকের স্থলসীমান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে, সমুদ্রসীমা নিয়েও বিরোধ কেটে গেছে। তবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এ ছাড়া আসামের জাতীয় নাগরিকপঞ্জিও অনেক বাংলাদেশির মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ওই তালিকায় বাদ পড়াদের জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে। তবে ভারত সরকার বলছে, এটা তাদের ‘অভ্যন্তরীণ’ সমস্যা এবং বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়বে না। সম্প্রতি নিউইয়র্ক সফরেও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে তারা এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) ও অমীমাংসিত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়গুলো তুলবেন। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আমরা আলোচনা করব।
উভয়পক্ষের সীমান্তরক্ষীদের সহযোগিতায় চোরাচালান বন্ধের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হবে। এ ছাড়া দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে ভারতের ভেতরে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস দমন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতি, সার্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে চুক্তি, বাংলাদেশি রফতানি পণ্যের ওপর এন্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহার নিয়েও আলোচনা হবে। ভারতের মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার নিয়ে চুক্তির ওপর স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সই নিয়েও আলোচনা হবে বলে আশা করছেন তারা। বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে যোগাযোগ তৈরিতে বিবিআইএন মোটর ভেহিকেল চুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন এবং আগামী বছর যৌথ উদ্যোগে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উদ্যাপন নিয়েও আলোচনা হবে। আব্দুল মোমেন বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও ভারতের সমর্থন চাইবে বাংলাদেশ।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর দুই প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি, নৌপথে পণ্য পরিবহন, অর্থনৈতিক, সমুদ্র গবেষণা, মান নির্ধারক সংস্থা, বাণিজ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা নিয়ে চুক্তি সই হবে।
সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি বিরোধীদলীয় নেতা সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গেও দেখা হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে এই রাষ্ট্রীয় সফর করছেন শেখ হাসিনা এবং ৩-৪ অক্টোবর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে ‘প্রধান অতিথি’ থাকবেন তিনি।
তবে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে বড় কোনো অগ্রগতির আভাস মিলছে না। তবে তিস্তার বাইরে সাতটি নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের বিষয়টি দুই দেশ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই করার কথা থাকলেও দৃশ্যত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়। তখন থেকেই তিস্তা চুক্তির বিষয়টি ঝুলে আছে। ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, কেবল তার সরকার ও শেখ হাসিনার সরকারই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি করতে পারে। অঙ্গীকার সত্ত্বেও মোদি সরকার গত কয়েক বছরে চুক্তি সই করতে পারেনি। তবে অঙ্গীকার থেকে ভারত সরেও যায়নি।
নয়াদিল্লির সূত্রগুলো জানায়, এবারের শীর্ষ বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী থাকছেন না। পূজার কারণে তিনি এ সময়টা সাধারণত পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যান না। কয়েক দিন আগেই তিনি নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করে কলকাতা ফিরেছেন।
এদিকে নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও তিস্তার পানিবণ্টন বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি আটটি চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যোগাযোগ, সংস্কৃতি, কারিগরি সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে।
"






































