খাইরুল আনাম, নবীনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
মাটি লুটের মহোৎসব
বুড়ি নদীর পাড় গিলে খাচ্ছে ইটভাটা, বিপন্ন নবীনগরের ফসলি জমি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় বুড়ি নদীর পাড় ও তীরবর্তী তিন ফসলি জমির মাটি অবৈধভাবে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে কেটে লুটে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। দীর্ঘদিন ধরে অবাধে এই মাটি কাটার মহোৎসব চললেও রহস্যজনক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন। এতে নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার আবাদি জমি ও নদীপাড় তীব্র ভাঙন ঝুঁকিতে পড়েছে।
দিন-রাত চলছে টপ সয়েল লুট, অসহায় কৃষক
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দক্ষিণ কাইতলা ইউনিয়নের গোয়ালী গ্রামের পশ্চিমে এবং বিটঘর ইউনিয়নের ভদ্রগাছা গ্রামের পশ্চিমে বুড়ি নদীর পাড় সংলগ্ন ফসলি জমি থেকে দিন-রাত নির্বিচারে মাটি কাটা হচ্ছে। শক্তিশালী ভেকু মেশিন ব্যবহার করে কৃষকের আবাদি জমির উপরিভাগের উর্বর মাটি (টপ সয়েল) কেটে বড় বড় ট্রলারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কুড়িঘর গ্রামের কামাল মিয়া নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাঁর সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। স্থানীয় কৃষকেরা বাধা দিতে গেলে তাঁদের নানামুখী ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে চোখের সামনে নিজের জমি ধ্বংস হতে দেখেও অসহায় হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা।
‘প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই কাজ করছি’
প্রকাশ্য দিবালোকে এভাবে নদীর পাড় সাবাড় করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের কোনো তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সব দেখেও প্রশাসন কেন চুপ?
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কামাল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে বলেন, “আমি প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই আমার কাজ করে যাচ্ছি। এখানে বাধা দেওয়ার কেউ নেই।”
অবশ্য নবীনগর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) খালিদ বিন মনসুর দাবি করেছেন, “বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
নদীর পাড় ও আবাদি জমির উপরিভাগের মাটি কাটার এই ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
মৃত্তিকা ও পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, “যেকোনো জমির ওপরের মাত্র ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি মাটি বা ‘টপ সয়েল’ হলো ওই জমির প্রাণ। উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান ও জৈব পদার্থ এই অংশেই থাকে, যা তৈরি হতে শত শত বছর সময় লাগে। ইটভাটার জন্য এই মাটি কেটে নেওয়ার অর্থ হলো জমিটিকে চিরতরে বন্ধ্যা ও মরুভূমিকরণ প্রক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেওয়া। আগামী কয়েক বছর এই জমিতে কোনো ফসলই ফলানো সম্ভব হবে না।”
নদী ও পরিবেশ গবেষকদের মতে, “নদীর পাড় বা তীরবর্তী অংশ কেটে নিলে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ব্যাহত হয়। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বাড়লে ওই কাটা অংশ দিয়ে তীব্র ভাঙন শুরু হবে। এর ফলে শুধু কৃষকের জমিই নদীগর্ভে বিলীন হবে না, বরং আশপাশের বিস্তীর্ণ গ্রাম ও সরকারি অবকাঠামো ধসে পড়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হবে। ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০’ অনুযায়ী এটি সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ।”
জনস্বার্থে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন
নদীর পাড় ও ফসলি জমি এভাবে কেটে ফেলায় আগামী বর্ষায় পুরো এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অবিলম্বে এই অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ করতে এবং বুড়ি নদীসহ নবীনগরের কৃষি বাঁচাতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের জরুরি এবং কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। সেই সঙ্গে মূল হোতা কামাল মিয়াসহ জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
পিডিএস/এমএইউ








































