সাকিব সাকিব হোসেন, সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি

  ১১ অক্টোবর, ২০২১

হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্য মাটির বাড়ি

`বারে আগে মাটির বাড়িত মেলা শান্তি আচলো'

প্রাচীন এই মাটির দোতলা ঘর গ্রাম-বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, ছবি- প্রতিদিনের সংবাদ
মাটির প্রলেপে নানাবিধ আল্পনা! বাঁশ ও তালের কাঠের কোঠা! উপরে টিন বা ছনের ছাউনী। দক্ষিণ দুয়ারী ঘরে বনবন করে বাতাস প্রবেশ করে, যেন প্রাণটা শীতল করে দেয়। আর শীতকালে গরমের আভা আবার গ্রীষ্মকালের প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্তি দূর করার জন্য এক অপার শান্তির ছাঁয়া।

বলছিলাম, ‘এসি’খ্যাত মাটির বাড়ির কথা। গ্রামীণ জনপদে বসবাস করার জন্য মাটির বাড়ি ছিল তুলনাহীন।  কিন্তু বর্তমানে ইট-পাথরের দুনিয়ায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগায় হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাচীন ঐতিহ্য মাটির বাড়ি। অনেকে বসবাস করার জন্য মাটির ঘর ভেঙে ইট-পাথর ও টাইলসের সমন্বয়ে গড়ছেন বাড়ি।

ইসলামপুর গ্রামের বৃদ্ধ ইসাহাক আক্ষেপের স্বরে  প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বারে আগে মাটির বাড়িত মেলা শান্তি আচলো। পরে বেটারা ইটার বাড়ি বানাচে, কিন্তু আগের মতন সুক-শান্তি নাই’।

সত্যিই তাই, নওগাঁর সাপাহারে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে এখনও মাটির বাড়ি চোখে পড়লেও দিনের পর দিন হারিয়ে যেতে বসেছে এই প্রাচীন ঐতিহ্য।

বহুবছর আগে থেকে গ্রাম-গঞ্জে এমনকি শহরে বসবাসকারীরা মাটি-বাঁশ ও তালের কাঠের সমন্বয়ে গড়ে তুলতেন মাটির বাসস্থান। এঁটেল ও বেলে মাটির মিশ্রণে তৈরী হতো মাটির বাড়ি। একটি মাটির বাড়ি তৈরী করতে সময় লাগত ছয় মাসেরও বেশি। সামর্থ্য অনুযায়ী মাটির বাড়িকে কেউবা বানাত দ্বিতল পর্যন্ত। বাড়ি তৈরী শেষে খড়ের চালা ও টিন দেওয়া হত ছাদে। বিভিন্ন নকশা ও মনোমুগ্ধকর কারুকার্য দিয়ে দর্শনীয় করে তুলত সেসব বাড়ি। বাড়ির দেয়াল তৈরী ও চালা দেবার পরে পথচারীদের দৃষ্টি আর্ষণ করার জন্য বাইরের দেয়ালে ছাপানো হত নানা রকম নকশা।

এছাড়াও বাড়ির প্রাচীরটাও দেওয়া হতো মাটি দিয়ে। বাড়ির আঙ্গিনায় ও চারপাশে লাগানো থাকতো নানা ধরনের বনজ-ফলদ ওষুধি গাছ। বাড়ি পাশে লাগানো হত ইউক্যালিপটাস, মেহগনী ,নিমগাছসহ নানা ধরনের বৃক্ষ। যার সুশীতল ছায়ায় বাড়ি থাকতো ঠিক এসির মতো ঠান্ডা। 

আগের যুগের জমিদাররা মাটির বৈঠকখানায় বসে চালাতেন আমোদ-প্রমোদসহ বিচারিক কার্যক্রম। 

বর্তমান সময়ে প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে দালান বাড়ি বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। যেন পুরনো ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে নতুন আঙ্গিকে গড়তে চায় নিজেদের।

ইসলামপুর গ্রামের বৃদ্ধ ইসাহাক আক্ষেপের স্বরে  প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বারে আগে মাটির বাড়িত মেলা শান্তি আচলো। পরে বেটারা ইটার বাড়ি বানাচে, কিন্তু আগের মতন সুক-শান্তি নাই’।

তিনি আরও বলেন, এসব বাড়ির ভিতরে চৈত্র মাসের প্রখর দাবদাহেও থাকত শীতল হাওয়া। আবার প্রচন্ড শীতের মাঝেও উষ্ণতা অনুভব করতাম আমরা। হামাগের কাছে ‘এসি’ নামে পরিচিত মাটি দ্বারা তৈরী বাড়ি। কিন্তু বর্তমান সময়ে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগার ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে সেইসব মাটির বাড়ি।

এছাড়াও বয়োবৃদ্ধদের সাথে কথা হলে তারা আক্ষেপ করে জানান, বর্তমানে কলিযুগ আসায়ই এ ধরনের অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাদের। শুধু মাত্র মাটির বাড়ি নয়, বিভিন্ন ধরনের পুরনো ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্ত। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাটির বাড়ি সম্পর্কে হয়তো বা জানবেও না এমন ধারণা করছেন বয়োবৃদ্ধরা।

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মাটির বাড়ি,প্রাচীন ঐতিহ্য,বিলুপ্ত
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close