মো. দুলাল মিয়া, নাঙ্গলকোট (কুমিল্লা)

  ৩০ আগস্ট, ২০২১

মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেনের মানবতার জীবনযাপন

১৯৭১ সাল। বয়স তখন ১৮ বছর। টগবগে নৌ যোয়ান। চারদিকে শুরু হলো যুদ্ধ। রাতে ঘুমাতে পারি না। থাকতে হয় আতঙ্কে। কখন যানি মিলিটারী বাহিনী বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঠিক সেই মুহূর্তে মনে আত্মশক্তি যুগিয়েছেন বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই দিন দেশ ও দেশের মানুষের কথা ভেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি। এখনও বঙ্গবন্ধুর সেই ডাক কানেতে বাজে।

এসব কথা বলে হাউ মাউ করে কাঁদলেন ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন। তিনি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকরা ইউপির বিষ্ণুপুর গ্রামের মৃত বাদশা মিয়ার ছেলে। 

তিনি আরো বলেন, মে মাসের শেষ দিকে পিতা-মাতার কাছ থেকে শেষ বিদায় নিয়ে পেরিয়া ইউপির কাকৈরতলা গ্রামের আব্দুল মন্নান, বাংগড্ডা ইউপির পরিকোট গ্রামের আব্দুল লতিফ, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা গুণবতী গ্রামের রমজানকে সঙ্গে নিয়ে ইন্ডিয়ার চোত্তা খোলা যাই। সেখানে মেজর আব্দুর রশিদের নেতৃত্ব ১০-১৫ দিনের মতন প্রশিক্ষণ নিয়ে সেখান থেকে ২৪ জনের একটি গ্রুপ মিলে চলে যাই মেঘালয়ের হরিণা এলাকায়। সেখানে ভারতীয় মেজর শর্মা নেতৃত্বে এক মাস প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ শেষে চোত্তা খোলা আসলে মেজর এনামের সঙ্গ কাজ করার জন্য বলা হয়। পরে তিনি মেজর এনামের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে ২ সেক্টর মেজর হায়দারের সঙ্গে দেখা করে বলেন। ভারতের সিমান্তে মেজর হায়দারের সঙ্গে দেখা করলে তিনি আমাকে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব দেন।

বিরিসিং দীঘি থেকে চৌদ্দগ্রাম জগন্নাথ দীঘি পর্যন্ত আমার দায়িত্ব। ইন্ডিয়া থেকে কোন মুক্তি বাহিনী আসলে বা যুদ্ধের জন্য কথাও গেলে আমি আগে গিয়ে রাস্তা বাতাতাম। এ রাস্তা দিয়ে গেলে শটকাট হবে। আর কোন বিপদে হবে। আমার সংকেত পেলেই মুক্তি বাহিনীরা রাস্তা পারাপার করতো। এভাবে দিনের পর দিন রাতের পর রাত। স্বাধীনের কয়েক দিন আগে আমাকে হাসনপুর রেল স্টেশন থেকে বর্তমান বটতলী ইউপিতে বটতলী গ্রামের মিলিটারী ক্যাম্প পাহারা দেই। স্বাধীনতা ঘোষণার আগের দিন রাতে বটতলী মিলিটারী ক্যাম্পে আক্রমণ করলে যুদ্ধে লিপ্ত হই। ওই খানে আমরা জয় লাভ করি। পরে সকাল ১১ টার দিকে দেশ স্বাধীন হয়েছে ঘোষণা আসে। দেশ স্বাধীন হলো বাড়িতে আসলাম।

তারপর থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে চার দিকে হাহাকার। অভাব আর অভাব। এর মধ্যে সংসার জীবন শুরু করলাম। আবার নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলো অভাবের বিরুদ্ধে। এ যুদ্ধ আর শেষ হওয়ার নয়। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত চলবে এ যুদ্ধ। সংসার জীবনে চার ছেলে ও দু'মেয়ে। প্রথম ছেলে মাবুবুল হক, দ্বিতীয় ছেলে এবায়দুল হক, তৃতীয় ছেলে ফজলুল হক ও চতুর্থ মজিবুল হক দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালায়। মেয়েদেরও বিবাহ হয়েছে। তারাও স্বামীর সংসার করছেন। 

সোমবার সরেজমিনে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন আগমের মতন কথা বলতে পারে না। কানেও তেমন শুনেন না। চার পাশে আদা টিন, তার ওগর ময়দার বেড়া গেরা ও ওপরে টিনের চাউনি একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করছেন। বৃষ্টির দিনে টিনের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। দিনের বেলায় সূর্যের আলো ডুকে। রাতের বেলায় চকিতে শুলে দেখা যায় আকাশের চাঁদ। ঘরের বিতর একটি পুরাতন একটি চকি আর কিছু আসবাবপত্র। এ নিয়ে তিনি মানবতার জীবনযাপন করছেন। দীর্ঘদিন অসুখে ভুকছেন। সরকারি ভাবে যা ভাতা পান তাতে কোন মতে সংসারে চলান তিনি। 

বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধা বান্ধব সরকার। এ বঙ্গ কন্যা শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ও গৃহায়ণসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে আসছেন। যা সুফল জুটেনি মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেনের কপালে। তিনি বর্তমানে মানবতার জীবনযাপন করছে।

পিডিএসও/এসএম শামীম 
 

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মুক্তিযোদ্ধা,জীবনযাপন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close