নদীর বালু নদীতে ফেলে ঢাকা-বরিশাল নৌপথ ড্রেজিং

থেকে যাচ্ছে নব্যতা সংকট

প্রকাশ : ২০ অক্টোবর ২০২০, ১৭:১৪

মাসুদ রানা, বরিশাল

নদীর বালু নদীতে ফেলে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে ঢাকা-বরিশাল নৌ-পথে। এতে করে নব্যতা সংকটের স্থায়ী কোন সমাধান হচ্ছে না। থেকে সেই সমস্যা। আর সরকারও একই কাজে প্রতিবছর গচ্ছা দিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান কি? তা এখনো বের করতে পারেনি সংশ্লিষ্ঠ দপ্তর।

পরিবেশবিদরা বলছেন, নদীর গভীরতা ও স্রোত প্রবাহ সবসময় সঠিক মাত্রায় না থাকলে নদী নির্ভর বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চললের যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ব্যবসা বাণিজ্য, জীব বৈচিত্র, নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহ, মাছের চাহিদা সব কিছুতেই বিপর্যয় নেমে আসবে।

অসময়ে নদীর দুই তীর প্লাবিত হবে। অনেক দিন পানি আটকে থাকবে। নস্ট হবে ফসলী জমি। যদিও নদীর ড্রেজিং’র বালু সাধারণ মানুষ তীরে রাখতে দেয় না বলেই নদীতে ফেলতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ড্রেজিং বিভাগ কর্তৃপক্ষ।

নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, প্রতিবছর শীত মৌসুম আসলেই বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলসহ ঢাকা বরিশাল নৌ-পথে নব্যতা সংকট দেখা দেয়। নদীতে কোন কোন স্থানে পানির উপরের স্তর থেকে তলদেশ পর্যন্ত গভীরতা থাকে মাত্র ৫ থেকে ৭ ফুট। অথচ প্রথম শ্রেণির লঞ্চ ও মালবাহী কার্গো চলাচলে নদীতে গভীরতা থাকা লাগে কমপক্ষে ১৪ থেকে ২০ ফুট। এ কারণে জোয়ারের পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয় । নদীর চ্যানেল গুলো সচল রাখতে এ বছরও ঢাকা বরিশাল নৌপথসহ বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌ পথ খনন কার্যক্রম শুরু করেছে ড্রেজিং বিভাগ।

ঢাকা থেকে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালী রুটের যে এলাকা গুলোতে লঞ্চ চলাচল করে এবং বরিশাল নদীবন্দর থেকে শুরু করে সাহেবেরহাট চ্যানেলের কড়ইতলা নদী, বাকেরগঞ্জের লোহালিয়া ও কারখানা নদী, মেহেন্দিগঞ্জের মাসকাটা নদী, ভোলা লঞ্চঘাট সংলগ্ন নদী, লালমোহন লঞ্চঘাট সংলগ্ন নদী, মজুচৌধুরীর হাট রুটের মতিরহাট চ্যানেল, বরগুনা লঞ্চঘাট সংলগ্ন বিষখালী নদীসহ অন্তত ৩০টি পয়েন্টে খনন শুরু হয়েছে এ সপ্তাহে।

এতে মোট পলি অপসারণ করা হবে ১৪ লাখ ঘনমিটার। আর এজন্য এবার বাজেট ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। দ্রুত এসব নৌপথ খনন করা না হলে ঢাকা-বরিশাল-পটুয়াখালী রুটসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই আসন্ন শীত মৌসুমে নাব্য সংকট প্রকট হয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল যাতে বিঘ্নিত হতে না পারে সেজন্য বিআইডব্লিউটিএ নিজস্ব জরিপের মাধ্যমে পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে খননের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জটিলতার বিষয় হচ্ছে, নদী খননের সময় নদীর বালু নদীতেই ফেলা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের যুক্তি হচ্ছে, পানির স্রোতে বালু ভেসে যায়। কিন্তু লঞ্চ মালিক-চালক ও স্থানীয়রা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সেতু নির্মান হওয়ায় শীত মৌসুমে পানির স্রোত কম থাকে। ফলে ড্রেজিং’র ফেলানো বালু কাছাকাছি জায়গায় জমা হয়ে চড় পড়ে। এতে সে সমস্যা সেই সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

বরিশাল ড্রেজিং বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ভুইয়া বলেন, নদী খননে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় খনন করা পলি কোথায় ফেলানোর জায়গা নিয়ে। নদী তীরবর্তী জনপদের বাসিন্দারা তীরে পলি ফেলতে দেন না। যে কারণে খনন করা পলি তাদের নদীতে ফেলতে বাধ্য হন। তবে কমপক্ষে ৪০ ফুট গভীর নদীতে পলি ফেলায় ওই পলি স্রোতের টানে ভেসে যায় বলে দাবি এ প্রকৌশলীর।

লঞ্চ মালিক সমিতির প্রতিনিধি স্বপন চৌধুরী অভিযোগ করেন, নদী খনন কার্যক্রমে নৌযান মালিক ও মাস্টার-ড্রাইভারদের সম্পৃক্ত করা হয় না। যে কারণে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই হয় না । কোনো স্থানে কতফুট গভীর খনন করা প্রয়োজন।

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বরিশাল বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু বলেন, প্রতিবার খনন শেষে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গভীরতা মেপে দেখানো হয়।

বিআইডব্লিটিএ’র নদী খননের এমন উদ্যোগ প্রসঙ্গে বরিশাল নদী খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, খননের নামে বিআইডব্লিউটিএ প্রতি বছর অর্থের অপচয় করে তা বন্ধ করতে হলে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ইমামুল হক বলেন, নদীগুলোর পানি প্রবাহ ও গভীরতা স্থায়ীভাবে সঠিক না থাকলে  নদী তীরবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্বাহ, মাছের চাহিদা সব কিছুতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। নাব্যতা উদ্ধার না হলে অসময়ে নদীর দুই তীর প্লাবিত হবে। জমি নস্ট হবে ফসলি জমি।

কেন নদীর পলি মাটি নদীতে ফেলে নদী খনন কার্যক্রম চালানো হয় বা সমাধান কি জানতে চাইলে নদী বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের সংবাদকে জানান, খনন কাজের সময় যে সরু পাইপ দিয়ে বালু ফেলানো হয় তাতে ৭০ভাগ বালু ও ৩০ ভাগ পানি থাকে।

এই ওয়েষ্ট আউট গুলো যখন নদীর যে পয়েন্টে ফেলানো হবে তখন সে  স্থানে ৭০ থেকে ৮০ফিট পানি  থাকতে হবে। পাশাপাশি স্রোতও থাকা লাগবে। তা না হলে ড্রেজিং’র শতভাগ ফলাফল অনিশ্চিত থাকে বলে তার কথার মাঝে আভাস পাওয়া যায়। নদীর তীরের মানুষরা তাদের জমিতে পলি ফেলতে দেন না বলেই সমস্যা হচ্ছে।

পিডিএসও/এসএম শামীম