টেকসই বাঁধ নির্মাণে আসছে মেগা প্রকল্প

সংস্কারের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় বেড়িবাঁধ

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০৯:১৬

গাজী শাহনেওয়াজ
ফাইল ছবি

‘জোড়াতালি দিয়ে দায়সারাভাবে এতদিন সংস্কার হয়ে আসছে উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো। কারণ সরকারি বরাদ্দের সিংহভাগই লুটপাট হয়ে যায়’ এ অভিযোগ স্থানীয় ভুক্তভোগীদের। তাদের দাবি কিছু জনপ্রতিনিধি এই সুযোগে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে যান। যুগের পর যুগ এভাবেই চলে আসায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো এখন অতি-ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানকার বাসিন্দাদের জীবন কাটে রাত জেগে এবং তাদের সময় কাটে সম্পদ ও জীবনহানির শঙ্কায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ষাটের দশকে উপকূলীয় বেড়িবাঁধগুলো নির্মিত হয়েছিল। বছর বছর ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁধগুলো। সর্বশেষ সুপার সাইক্লোন আম্পানের তান্ডবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়িবাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে চরম ঝুঁকিতে আছে উপকূলীয় ২৫ জেলার প্রায় ৫ কোটি মানুষ। সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন মেগা প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাঁধকে টেকসই করতে নকশা পরিবর্তন করা হচ্ছে। আর বাঁধ নির্মাণের পর তা রক্ষণাবেক্ষণে নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হবে। নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী বেড়িবাঁধ দেখভালের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলে রয়েছে ৫ হাজার ৭৫৭ কিলোমিটার বাঁধ। যার পুরোটাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। ষাটের দশকে ফসলি জমি বাড়াতে নির্মিত ওই বাঁধ সংস্কারে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প নেওয়া হলেও তা কাজে আসেনি। বরং সিডর, আইলা ও আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এরপর জোড়াতালি দিয়ে পানি আটকানো হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি। ফলে সাতক্ষীরা-খুলনা-বরিশাল হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলার পরে গত ডিসেম্বর ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুল’-এর আঘাত নিঃসন্দেহে বড় ছিল। কিন্তু গত ২০ মে আম্পান সবচেয়ে প্রবল শক্তিতে আঘাত হেনেছে উপকূূলে। উপকূলীয় জেলার খুলনার কয়রা-পাইকগাছা ও দাকোপ, সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি এবং বাগেরহাটের মোংলাসহ অন্যান্য উপজেলা লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। দুমড়ে-মুচড়ে গেছে কাঁচাঘর, দোকানপাট ও আধপাকা দালান। প্রায় ১৫০ কিলমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যে কারণে এখনো উপকূলের বহু মানুষ আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে শ্যামনগরের কৈখালী ইউনিয়নের পুরো এলাকার বেড়িবাঁধ, গাবুরা, নওয়াবেকী, কাশিমারীর ঝাপালী, পদ্মপুকুর এবং আশাশুনির প্রতাপনগরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল। এসব এলাকায় সংস্কার হয়েছে নামমাত্র।

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি সরেজমিন দেখতে উপকূলীয় এলাকাগুলো সফর করেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুক, পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ও সচিব কবির বিন আনোয়ারসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। পরিদর্শনকালে তারা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন এবং মোতায়েনকৃত সেনাপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেন। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনে বাঁধ ভেঙে যাওয়ার জন্য পানি নিষ্কাশন অব্যবস্থাপনা ও পুরাতন বাঁধকে দায়ী করে নতুন স্থায়ী বাঁধ তৈরির প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মেগা প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে উপকূূলীয় এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৮ হাজার কোটি টাকার চারটি প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনার ১৪নং পোল্ডারে ৯৫৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ও ৩১নং পোল্ডারে ১ হাজার ২০১ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং সাতক্ষীরার ৫নং পোল্ডারে ৩ হাজার ৬৭৪ কোটি ৩ লাখ ও ১৫নং পোল্ডারে ৯৯৭ কোটি ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ওইসব প্রকল্পের কাজ শুরু হবে, যা আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে সমাপ্ত হবে।

উপমন্ত্রী শামীম জানান, ওই চারটি প্রকল্পের বাইরে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণে আরো কয়েকটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। এছাড়া বাঁধের সুরক্ষায় কক্সবাজার থেকে সাতক্ষীরা পর্যন্ত সুপার ড্রাইভওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। শুধু বেড়িবাঁধ নয়, পুরো উপকূূলের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে হাওর উন্নয়ন বোর্ডের মতো উপকূূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অতীতে বেড়িবাঁধ সংস্কার, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুতেই স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে প্রতি বছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও টেকসই বেড়িবাঁধ হয়নি। অথচ উপকূূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে বেড়িবাঁধের ওপর। বাঁধের ক্ষতি হলে সবকিছু ভেসে যায়। বাড়িঘর নষ্ট ও ফসলের ক্ষতি হয়। তাই ওই অঞ্চলের মানুষের প্রধান দাবি, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ। এক্ষেত্রে বেশকিছু সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।

নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র জানান, এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে তুলে ধরা সুপারিশে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগকে মাথায় রেখে উপকূলে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। যে বাঁধের নিচে ১০০ ফুট, ওপরে ৩০ ফুট এবং উচ্চতা হবে ৩০ ফুট। তিনি বলেন, বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জরুরি তহবিল গঠন ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করতে হবে। ওয়াপদা বাঁধের ১০০ মিটারের মধ্যে চিংড়ি বা কাঁকড়ার ঘের তৈরিতে সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা দ্রুত কার্যকর করতে হবে। নিয়মিত ড্রেজিং-এর মাধ্যমে উপকূূলের নদ-নদীর পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্থানীয় জনগণের সুপারিশকে আমলে নিয়ে বেড়িবাঁধ তৈরির ডিজাইনেও (নকশা) পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগে বাঁধের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট। এখন সেই বাঁধের উচ্চতা হবে ১৩ ফুট এবং চওড়া হবে ১২ ফুট। বাঁধের সুরক্ষায় বাঁধের ১০০ মিটারের মধ্যে চিংড়ি ও কাঁকড়াসহ মাছ চাষে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে। বাঁধের দুই পাশে বনায়নের পাশাপাশি নদীর গতিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তারা আরো জানান, গত ১০ থেকে ১২ বছরে উপকূলে বড় বড় ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতকে বিবেচনায় রেখে বেশ কয়েকটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা চারটি প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের শেষ নাগাদ শুরু হতে পারে। ওই প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হতে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

পিডিএসও/হেলাল