হালিমা আক্তার হানী
দৃষ্টিপাত
নারীত্ব হারিয়ে নারী স্বাধীনতার যৌক্তিকতা কি

নারী স্বাধীনতার ধারণা একবিংশ শতাব্দীতে এসে একটি বহুমাত্রিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারী এখন আর শুধু গৃহের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং শিক্ষা, কর্মসংস্থান, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি এবং গবেষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তার পদচারণা দৃশ্যমান। কিন্তু এই অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রশ্নও উঠে আসছে- নারী স্বাধীনতা কি নারীত্ব হারানোর শর্তে অর্জিত হবে? একজন নারী কি শুধু পুরুষের সমকক্ষ হলেই স্বাধীন হবেন, নাকি তার নিজস্ব সত্তাকে বজায় রেখেও তিনি স্বাধীন হতে পারেন? বাস্তবতা হলো স্বাধীনতা মানে যদি নিজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিসর্জন দিয়ে অন্য কিছুর অনুকরণ করা হয় তবে সেটি প্রকৃত স্বাধীনতা নয়, বরং নতুন একধরনের বাধ্যবাধকতা।
নারী স্বাধীনতার আলোচনায় একটি বড় ভুল হলো পুরুষকে প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উপস্থাপন করা। আজকের অনেক আন্দোলন ও মতবাদ নারীর স্বাধীনতাকে এমনভাবে চিত্রিত করছে, যেন এটি পুরুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। ফলে সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যে একটি অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর। বাস্তবতা হলো নারী ও পুরুষ কেউই একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরিপূরক। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। নারী ও পুরুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক গঠনে কিছু স্বতন্ত্রতা রয়েছে, যা তাদের বিশেষত্ব দেয়। এই স্বতন্ত্রতাকে মুছে ফেলে কেবল প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে চললে প্রকৃত স্বাধীনতার চেতনাই হারিয়ে যাবে।
নারীবাদ একসময় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু চরমপন্থি নারীবাদী গোষ্ঠী নারীবাদকে পুরুষবিরোধী আন্দোলন হিসেবে গড়ে তুলেছে। তারা মনে করে, নারীর স্বাধীনতা মানে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা, তাদের অবদমন করা বা কোনোভাবেই পুরুষের সঙ্গে আপস না করা। অথচ প্রকৃত নারীবাদ হলো সাম্যের ভিত্তিতে নারী ও পুরুষের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো নয়। নারীবাদ যদি ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিশোধপরায়ণতার মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তবে সেটি মূল লক্ষ্য থেকে সরে যাবে এবং সমাজে অস্থিরতা বাড়াবে।
অনেক সময় নারী স্বাধীনতার প্রসঙ্গে ধর্মীয় বিধি-বিধানকে একটি প্রধান বাধা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। এটি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। প্রায় সব ধর্মেই নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম, হিন্দুধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম- প্রত্যেকটি ধর্মে নারীদের সম্মানের সঙ্গে দেখার নির্দেশনা রয়েছে। সমস্যা তখনই হয়, যখন ধর্মীয় অনুশাসনকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হয়, যা নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন ধর্মের প্রকৃত ব্যাখ্যা ও সঠিক প্রয়োগ। ধর্মকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না করে বরং ধর্মীয় অনুশাসনের অন্তর্নিহিত দিকগুলো বিশ্লেষণ করা উচিত, যা নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারে।
নারী স্বাধীনতার পথে সংস্কৃতিকে একমাত্র বাধা হিসেবে দেখা আরেকটি বড় ভুল। সংস্কৃতি আসলে একটি পরিবর্তনশীল প্রক্রিয়া। সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী সংস্কৃতি সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়। সত্য কিছু সংস্কার ও কুসংস্কার নারীকে পিছিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এর জন্য পুরো সংস্কৃতিকেই দোষারোপ করা যৌক্তিক নয়। সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করে এবং নেতিবাচক দিকগুলো সংশোধন করেই একটি উন্নত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। অনেক সময় দেখা যায়, পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণকেই নারী স্বাধীনতার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে প্রচার করা হয়, যা বিভ্রান্তিকর। প্রতিটি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে এবং তার মধ্যেই স্বাধীনতার পথ খোঁজা উচিত।
নারী স্বাধীনতার আরেকটি বড় ভুল ধারণা হলো পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনকে স্বাধীনতার মাপকাঠি বানানো। আজকের অনেক প্রচার মাধ্যম ও সামাজিক আন্দোলন এমন একটি বার্তা দিচ্ছে যে, একজন নারী যদি ইচ্ছামতো পোশাক পরতে পারেন, তবে তিনিই স্বাধীন। কিন্তু স্বাধীনতা মানে শুধু বাহ্যিক কিছু নয়; বরং এটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, মানসিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকেও আসা উচিত। একজন নারী যদি উচ্চশিক্ষিত হন, কর্মক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরি করতে পারেন, স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারেন, তবে সেটিই প্রকৃত স্বাধীনতা। পোশাক বা ব্যক্তিগত জীবনকে স্বাধীনতার একমাত্র মাপকাঠি বানালে বৃহত্তর স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে যায়।
নারী স্বাধীনতা মানে নারীত্ব বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং নারীর মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে তুলতে হলে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। কেবল প্রতিযোগিতার মনোভাব, পুরুষবিদ্বেষ বা ধর্ম ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রকৃত স্বাধীনতার পথ নয়। বরং প্রয়োজন একটি যৌক্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং পরিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, যা নারীকে তার প্রকৃত মর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
নারী স্বাধীনতা একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত বিষয়। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নারীর অবস্থান ও অধিকার নিয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো স্বাধীনতার নামে অনেক সময় নারীরা নিজেদের প্রকৃত পরিচয়, সৌন্দর্য ও মর্যাদা হারাচ্ছে। নারী স্বাধীনতা মানে যদি শুধু ছেলেদের অনুকরণ করা হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত স্বাধীনতা নয়; বরং এটি নারী সত্তার অপব্যাখ্যা। একজন নারী তার স্বকীয়তা বজায় রেখেই স্বাধীন হতে পারেন, পুরুষের প্রতিযোগী বা তাদের প্রতিরূপ হওয়ার প্রয়োজন নেই।
বর্তমানে দেখা যাচ্ছে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের মতো পোশাক পরিধান করছে, যেখানে-সেখানে ধূমপান করছে এবং এমনসব অভ্যাস রপ্ত করছে, যা কখনোই নারীত্বের প্রতীক নয়। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় নিজস্বতা বজায় রেখে আত্মমর্যাদা অর্জন করা, তাহলে এই প্রবণতাকে স্বাধীনতা বলা চলে না। বরং এটি একধরনের অনুকরণপ্রবণতা, যেখানে নারীরা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। একটি নারী যখন তার নারীত্বের সৌন্দর্য বজায় রেখে ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলে, তখনই সে প্রকৃত সম্মানের দাবিদার হয়। কিন্তু যখন সে নিজেকে পরিবর্তন করতে গিয়ে নিজের শালীনতা ও ভদ্রতা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজও তাকে সম্মান দিতে সংকোচবোধ করে।
বেদনাদায়ক বিষয় হলো আজকের অনেক নারী বলছেন, ‘আমরা ছেলেদের থেকে কম নই’, অথচ এই প্রমাণ দেওয়ার জন্য তারা কেবল বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তন করছেন, নিজেদের উন্নত চরিত্র বা মেধার বিকাশ ঘটানোর পরিবর্তে। নারীরা সবসময়ই সম্মানের অধিকারী, কিন্তু যখন তারা নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়ে পুরুষদের মতো আচরণ করতে শুরু করে, তখন নিজেদের সম্মান নিজেরাই খর্ব করে। নারীর প্রকৃত শক্তি তার সৌন্দর্য, বিনয়, মেধা, সহনশীলতা ও মাতৃত্বের মতো গুণাবলীতে নিহিত। কিন্তু এখন অনেক নারী এসব উপাদানকে দূরে সরিয়ে দিয়ে শুধু বাহ্যিক স্বাধীনতার নামে এমন কিছু করছে, যা তাদের প্রকৃত অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
আরো দুঃখজনক বিষয় হলো দেশে যখন ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানির মতো ভয়াবহ অপরাধ বাড়ছে, তখন এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার বদলে নারীর স্বাধীনতার নামে অপ্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। নারীর সুরক্ষা, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা রক্ষার পরিবর্তে এমন কিছু আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, যা নারীর প্রকৃত সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নারীদের জন্য আসল লড়াই হওয়া উচিত নিজেদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে এমন কিছু আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, যা মূল সমস্যার সমাধান তো করছেই না, বরং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দিচ্ছে।
একটি সভ্য সমাজে নারীর স্বাধীনতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেটি হতে হবে সুসংগঠিত, সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল। স্বাধীনতার অর্থ যদি হয় নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ছেলেদের মতো পোশাক পরা, যেখানে-সেখানে ধূমপান করা বা নিজেদের স্বাভাবিক শালীনতা ও ভদ্রতা ভুলে যাওয়া, তাহলে সেটিকে স্বাধীনতা নয়, বরং আত্মসম্মান হারানোর একটি প্রক্রিয়া বলা যায়। নারীর মর্যাদা তার শালীনতা, জ্ঞান, চরিত্র ও আত্মনির্ভরশীলতায়; ছেলেদের মতো আচরণ করাতে নয়। প্রকৃত স্বাধীনতা তখনই আসবে, যখন নারী তার নারীত্ব বজায় রেখেই শিক্ষিত হবে, সচেতন হবে এবং সমাজের কল্যাণে ভূমিকা রাখবে। নারীত্ব হারিয়ে পাওয়া স্বাধীনতা কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা হতে পারে না, বরং এটি নারীর জন্য এক নতুন ধরনের অবক্ষয়।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাজশাহী কলেজ ও সহযোগী সদস্য রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি।
"






































