জীবনের সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা সুপ্রতিষ্ঠিত হোক

প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

আর কে চৌধুরী

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আমি পুরান ঢাকার কে এল জুবলি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। তখন আমাদের ক্লাস শিক্ষক ছিলেন কামরুজ্জামান স্যার। তিনি পরবর্তী সময়ে যুক্তফ্রন্ট থেকে মনোনয়ন নিয়ে এমপি হয়েছিলেন। হয়েছিলেন কে এল জুবলি স্কুলের প্রিন্সিপাল। পরে স্কুলটি কলেজে রূপান্তরিত হলে তিনি কলেজেরও প্রিন্সিপাল হন। কামরুজ্জামান স্যার ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ায় স্যারের সঙ্গে আমার সখ্য ছিল ভালো। স্যারের নেতৃত্বে আমরা একাধিকবার মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতেও আমরা মিছিলসহকারে ভাষা আন্দোলনের জনসভায় যোগ দিয়েছিলাম।

যাহোক, আসল কথায় আসি। ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন, যা ছিল বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান গঠিত হয়; কিন্তু পাকিস্তানের দুটি অংশ পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা হিসেবেও পরিচিত) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে পার্থক্য ছিল প্রচুর। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা করেÑ উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, যা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ (যারা সংখ্যার বিচারে গোটা পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল) এ সিদ্ধান্তকে মোটেই মেনে নিতে চায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং রফিক, বরকত, জব্বারদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পেয়েছে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শহর-নগর-গ্রাম-বন্দর সর্বত্র একুশে উদ্যাপিত হয়। শিক্ষার মাধ্যমও এখন বাংলা (উচ্চশিক্ষার কতিপয় ক্ষেত্র বাদে)। সরকারি কর্মকান্ডের ভাষাও বাংলা। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, বাংলা ভাষা এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত মর্যাদা পায়নি। প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে এখন পর্যন্ত বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। উচ্চ আদালতেও পুরোপুরি বাংলার ব্যবহার হচ্ছে না। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষার পর্যায় পর্যন্ত শুদ্ধরূপে বাংলা ভাষা লেখা ও বলার ক্ষেত্রে বিরাজ করছে দুরবস্থা। এটি কেবল লজ্জাজনক নয়, ক্ষমার অযোগ্য অপরাধও বটে।

ইউরোপের প্রতিটি উন্নত জাতি, এশিয়ার চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যের আরবি ভাষাভাষী প্রতিটি জাতি যদি রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড, শিক্ষা-সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক জীবনে নিজ নিজ মাতৃভাষা ব্যবহার করে উন্নতির চরম শিখর স্পর্শ করতে পারে, তাহলে বাঙালি কেন সর্বক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার করবে না? এবারের একুশের প্রতিজ্ঞা হোক, আমরা সেই আলোক উজ্জ্বল পথে মাতৃভাষা বাংলাকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত করব। বাংলা ভাষার অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাব। পরিশেষে বলছি, বাংলা ও বাঙালির জয় হোক। জয় হোক সব জাতির মাতৃভাষার।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক; মুক্তিযুদ্ধে ২ ও ৩নং সেক্টরের রাজনৈতিক উপদেষ্টা

 

"