ক্রীড়া ডেস্ক

  ৬ ঘণ্টা আগে

‘যখন ভালো অবস্থায় থাকি নিজেকে উজাড় করে দিই’

বয়স হয়েছে? অলস হয়ে গেছেন? ২০২২ সালে স্বপ্নের চূড়ায় পৌঁছে এবার কি তবে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছেন? একদমই না, সেই সুযোগই নেই। কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়ামে আলজেরিয়ার বিপক্ষে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জাদুকরী হ্যাটট্রিক করে সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের ৩-০ গোলের দাপুটে জয়ের পর ৩৮ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড জানান নিজের আবেগের কথা। বিশ্বমঞ্চে টানা ষষ্ঠবারের মতো খেলতে নেমে প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখা পেলেন মেসি। বিশ্বকাপের ক্যাম্পে যোগ দেওয়ার আগে চোটে ছিলেন তিনি। যদিও সময়মতো ফিট হয়ে ওঠেন। তবে ম্যাচের মধ্যে আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনা অধিনায়ক বলেন, ‘দিনগুলো কঠিন ছিল এবং আবেগটা সে কারণেই ছিল। আমি আমার সতীর্থ, কোচিং স্টাফ এবং প্রতিনিধি দলকে ধন্যবাদ জানাই।’

কাতার বিশ্বকাপে শিরোপা জয়ের পর তার ক্যারিয়ারে আর কিছু পাওয়ার বাকি নেই বলেই মনে করেন অনেকে। তবে আলবিসেলেস্তেদের জার্সিতে বর্তমান সময়টা দারুণ উপভোগ করছেন তিনি। নিজের অর্জনের তৃপ্তি ও দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মেসি বলেন, ‘আমার জীবনে যা কিছু এসেছে, তার সবকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। এখন আমি যে সময়টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তা হলো সোনায় সোহাগা। আমি খুব খুশি এবং এই চমৎকার দলটির প্রতি কৃতজ্ঞ, আমি এটি খুব উপভোগ করি।’

আলজেরিয়ার বিপক্ষে দাপুটে জয় পেলেও এবারের আসরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে বেশ সতর্ক মেসি। প্রতিপক্ষ দলগুলোর প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচগুলো সবসময়ই কঠিন হয়, এবং আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কেউ কাউকে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। এটি একটি প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বকাপ যেখানে জাতীয় দলগুলো খুব ভালোভাবে প্রস্তুত।’

৩৮ বছর বয়সেও মাঠে তার এমন অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের পেছনের মূল রহস্য ফুটবলের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসা। নিজের ফিটনেস ও নিবেদন সম্পর্কে মেসি বলেন, ‘আমি ফুটবল খেলতে পছন্দ করি, ছোটবেলা থেকেই এটি আমার প্যাশন। যখন আমি ভালো অবস্থায় থাকি, আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দিই। যখন ভালো অবস্থায় থাকি নিজেকে উজাড় করে দিই’, বলছেন মেসি।

মেসির রেকর্ড ছোঁয়া ম্যাচে দুরন্ত জয়ে শুরু আর্জেন্টিনার : ক’দিন আগেই মিরোস্লাভ ক্লোসা বলেছিলেন, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড যদি কারোর কাছে হারাতেই হয় তবে সেটা তিনি লিওনেল মেসির কাছেই হারাতে চান। প্রথম ম্যাচেই সাবেক এই জার্মান স্ট্রাইকারের ‘ইচ্ছা পূরণ’ করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিকের ফলে ক্লোসার পাশাপাশি মেসি এখন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। মেসি নৈপুণ্যে বিশ্বকাপে শুভ সূচনা করেছে আর্জেন্টিনাও, আলজেরিয়াকে হারিয়েছে ৩-০ গোলে।

ফুটবলের রেকর্ডপুত্র মেসি এদিন মাঠে নামা মাত্রই এক রেকর্ডের মালিক হয়েছিলেন। প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে ৬টি বিশ্বকাপে মাঠে নামার কৃতিত্ব এখন পর্যন্ত শুধুই মেসির। তবে যে রেকর্ডের অপেক্ষায় ছিল গোটা ফুটবল বিশ্ব, সেটি পূরণ করতে এক ম্যাচের বেশি সময় নিলেন না মেসি। ১৩ গোল নিয়ে ম্যাচ শুরু করেছিলেন, শেষ করেছেন ক্লোসার সমান রেকর্ড ১৬ গোল নিয়ে।

এমন গৌরবময় রেকর্ড বোধহয় মেসি নিজেও যেনতেনভাবে করতে চাননি। ম্যাচটা তাই মেসি আরো রঙিন করেছেন বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক করে। এর আগে ২০১৪ সালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ও গত বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল করলেও এবারই প্রথম ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে হ্যাট্রিকের দেখা পেলেন এই ফুটবল জাদুকর।

আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে নিজের ২০০তম ম্যাচের মাত্র পঞ্চম মিনিটেই সমর্থকদের একবার গোলের উল্লাসে মাতিয়েছিলেন মেসি। তবে অফসাইডে থাকায় সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। মাত্র তিন মিনিট পর আচমকা এক গোলে আর্জেন্টিনাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন ফারেস চাইবি। তবে আলজেরিয়ার এই গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।

অবশ্য ‘মেসি-ম্যাজিক’ দেখতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি আর্জেন্টিনা সমর্থকদের। ম্যাচের ১৭ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে ট্রেডমার্ক জোরালো শটে ১-০ গোলের লিড এনে দেন মেসি। এরপর পুরো প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা বল পায়ে রেখে খেললেও খুব একটা আক্রমণ করতে পারেনি। আলজেরিয়াও কঠিন কোনো পরীক্ষা নিতে পারেনি এমিলিয়ানো মার্টিনেজের।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে ৫১ মিনিটের মাথায় সুবিধাজনক জায়গায় বল পেয়েছিলেন মেসি। কিন্তু শট গোলপোস্টে রাখতে পারেননি। এর নয় মিনিট পরেই দ্বিতীয় গোলের দেখা পান তিনি। বক্সের অনেকটা বাইরে থেকে নেওয়া অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট ঠেকিয়ে দিলেও সেটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। রিবাউন্ড হয়ে আসা বল আলতো টোকায় জালে পাঠিয়ে বিশ্বকাপে গোলের তালিকায় ব্রাজিল কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে স্পর্শ করেন মেসি।

বিশ্বকাপে কখনো হ্যাটট্রিক পাননি মেসি, আর্জেন্টাইন সমর্থকদের নিশ্চয়ই একটা আক্ষেপ ছিল এটি নিয়ে। রেকর্ডের রাতে ভক্তদের সেই আক্ষেপও আর রাখতে চাইলেন না আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ৭৭ মিনিটে করলেন ম্যাচের সবচেয়ে সুন্দর গোলটি। আবারও বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের বাঁকানো শটে নিখুঁতভাবে খুঁজে নিলেন জাল, যে দৃশ্য বছরের পর বছর ধরে অগুনতিবার দেখেছেন কোটি ফুটবলপ্রেমী। আর এতেই ক্লোসার পাশাপাশি বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৬ গোলের মালিক এখন মেসি। সঙ্গে রয়েছে ৮টি অ্যাসিস্টও। ছোট রেকর্ড হয়েছে আরেকটি। আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সি ও সবচেয়ে বেশি বয়সি গোলদাতা- দুই জায়গাতেই এখন একটাই নাম। লিওনেল মেসি!

মেসিকে নিয়ে বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না সতীর্থরা : জাদুকরী, মায়াবী, মনোমুগ্ধকর- লিওনেল মেসি যে তিন গোল করেছেন, তা বর্ণনা করার জন্য এই শব্দগুলোও যেন কম হয়ে যায়। যেভাবে আলজেরিয়ার রক্ষণদুর্গ ভেদ করে হ্যাটট্রিক করেছেন, তা চোখে লেগে থাকার মতো। বিশ্বকাপজয়ী ফরোয়ার্ডকে নিয়ে বলার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন তার সতীর্থরা। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৫ মিনিটে অফসাইডে গোল বাতিল হওয়াটাই যেন মেসিকে অনেক বেশি তাতিয়ে দিয়েছিল। ১৭, ৬০ ও ৭৬ মিনিটে গোল করে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক তুলে নিয়েছেন। যার মধ্যে দুটি গোলই বক্সের বাইরে থেকে করেছেন তিনি। ওলটপালট করে দিয়েছেন রেকর্ড বইয়ের পাতা।

ম্যাচ শেষে আর্জেন্টাইন তারকাকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কী বলবেন, সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলেন না আলেক্সিস ম্যাক আলিস্তার, রদ্রিগো দি পল, ফাকুন্দো মেদিনারা। ম্যাক আলিস্তার বলেন, ‘তাকে (মেসি) বর্ণনা করার মতো কোনো শব্দ আর বাকি নেই। আজ এটা স্পষ্ট যে লিও (মেসি) সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়