সালাহ উদ্দিন বাবর
বেপরোয়া অটোরিকশা

রাজধানীতে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। পাড়া-মহল্লার অলিগলি থেকে শুরু করে সড়ক-মহাসড়ক সব স্থানেই দেখা যাচ্ছে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল। ঢাকার রাস্তায় বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ যানবাহনের কারণে একদিকে বেড়েছে যানজট; অন্যদিকে দুর্ঘটনাও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। প্রচলিত রিকশার চেয়ে দ্রুতগতিতে চলা ব্যাটারিচালিত এ রিকশা এখন নগরবাসীর আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে গিয়ে বাড়তি চাপ পড়ছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়। এমন পরিস্থিতি সত্ত্বেও অনেকটা অদৃশ্য কারণে প্রশাসন যেন নীরব ভূমিকায়।
অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এ যানবাহন ঘিরে তৈরি হয়েছে বহুমুখী সংকট। একদিকে যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি; অন্যদিকে প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। মহানগর থেকে এ বাহন সরিয়ে নিতে সরকারের নতুন পরিকল্পনার পাশাপাশি দেখা দিয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক মতভেদ। রিকশা চালানো একসময় হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কাজ হলেও সময়ের পালাবদলে পায়ের ওপর পা তুলেই সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এর চালকরা। সড়কে অনেকটা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব কাঠামোগত ত্রুটিযুক্ত বাহন। নেই নিয়মনীতির তোয়াক্কা।
সুযোগ পেলেই ছুটছে উল্টোপথে। ব্রেক ও সাসপেনশন সিস্টেম ভালো না হওয়ায় সহসা ঘটছে দুর্ঘটনা। যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। অর্থনীতির হিসাবে যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বিশাল তির অন্যতম কারণ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যানুযায়ী, দেশের সড়কে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ অটোরিকশা চলাচল করছে। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০ লাখ রাজধানীর সড়ক দখল করে আছে। যানজটের পাশাপাশি এসব ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন এসব যানবাহন চালাতে ৭৫০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যা জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৫ শতাংশ। টাকার হিসাবে যার পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, নিয়ন্ত্রণহীন এ অটোরিকশার যান্ত্রিক সমতা ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যানুযায়ী, মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশের পেছনে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দায়ী। যাত্রী ও পথচারীরা বলছেন, এ রিকশাগুলোয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। আগে অলিগলিতে চলাচল করলেও এখন প্রধান সড়কগুলোয়ও এগুলোর দাপট দেখা যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অটোরিকশা চলাচল অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গড়ে ওঠা অটোরিকশা ও চার্জিং পয়েন্টকেন্দ্রিক অবৈধ ব্যবসা। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা করছে বর্তমান সরকার। অধিকাংশ অটোরিকশাই ট্রাফিক আইন মানে না। এছাড়া অটোরিকশাগুলো রাস্তার যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামার চেষ্টা করে, যা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট বাড়ে এবং মানুষের মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কারণে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট। নগরের পাড়া-মহল্লায় যেসব গলিপথ যানজটমুক্ত ছিল, সেগুলোয়ও এখন প্রধান সড়কের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির। উল্টোপথে চলা, প্রধান সড়কে বেপরোয়া গতিতে চলা, অন্য যান্ত্রিক বাহনকে তোয়াক্কা না করা, কখনো উড়াল সড়কেও উঠে যাচ্ছে এসব রিকশা। আর দুর্ঘটনা তো নিয়মিত ঘটনা।
‘আরবান মবিলিটি স্টাডি : রিকশা ইন ট্রানজিশন’ নামে একটি গবেষণার তথ্য বলছে, ঢাকায় চলাচল করা বেশিরভাগ রিকশার নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭.৪ শতাংশ আর প্যাডেল রিকশার ৮৫.৯৪ শতাংশের কোনো নিবন্ধন নেই। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৭৫ শতাংশেরই আগে রিকশা চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এ পেশায় যারা আসছেন, তারা তুলনামূলক কিশোর-তরুণ।
গবেষণায় দেখা যায়, ৮২ শতাংশ যাত্রী যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বেছে নেন। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যাত্রীদের কাছে প্যাডেল রিকশার তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশা দ্রুততর, কম ভাড়া ও সহজলভ্য মনে হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছেন ৩০ শতাংশ যাত্রী। প্যাডেল রিকশায় এ ঝুঁকির কথা বলেন ১৮ শতাংশ যাত্রী। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬২ শতাংশ মনে করেন, ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে শহরে যানজট বেশি হচ্ছে। ৩৪ শতাংশ যানজটের জন্য প্যাডেল রিকশাকে দায়ী করছেন। আর ৪ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, সব রিকশাই যানজটের জন্য দায়ী।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অটোরিকশার চলাচল নিয়ে এরই মধ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচল, উল্টো পথে প্রবেশ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাই ট্রাফিক বিভাগ মনে করছে, রাজধানীতে বর্তমানে যে পরিমাণ অটোরিকশা চলাচল করছে তা নিয়ন্ত্রণে না আনলে ঢাকার সড়কে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। অটোরিকশার কারণে শুধু ট্রাফিক ব্যবস্থাই নয় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।
এ কারণে ট্রাফিক বিভাগ ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরানোর বিষয়ে দ্রুত পদপে নিতে চায়। এ সংক্রান্ত একটি পরিকল্পনা এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মন্ত্রণালয়ও প্রাথমিকভাবে ঢাকার প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল বন্ধের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের মতো পর্যাপ্ত জনবল তাদের নেই। প্রতিদিন এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে আইনের আওতায় আনতে গেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ এসব অটোরিকশার মালিক ও গ্যারেজ মালিকদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরানো সম্ভব হবে। বিষয়গুলো আসন্ন উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তুলে ধরবে ট্রাফিক বিভাগ।
এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমাদের একটি বৈঠক হয়েছে। অটোরিকশার বিষয় উঠলেও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা থাকায় বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হয়নি। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে এ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। সেই অনুযায়ী জুলাই মাসের ১৫ তারিখের দিকে সম্ভাব্য বৈঠক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই বৈঠকে অটোরিকশার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সিদ্ধান্ত হলে ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল আগেও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তবে জনবল সংকট ও ডাম্পিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যাত্রী চাহিদার তুলনায় গণপরিবহন কম থাকার সুযোগে ঢাকাসহ সারা দেশে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার রিকশা-অটোরিকশা। এসব যানের অধিকাংশের নকশা ও কারিগরি মান যথাযথ নয়। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সংখ্যা বাড়তে থাকায় এগুলো কার্যকরভাবে তদারকি কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে সড়ক নিরাপত্তায়। বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি।
অটোরিকশা সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গরিবের যানবাহন হিসেবে খ্যাত অটোরিকশায় প্রত্য ও পরোভাবে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। এটাকে নিয়ন্ত্রণে আনলে এর সঙ্গে জড়িতরা বেকার হয়ে পড়বে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার অটোরিকশা সংক্রান্ত বিষয়ে নতুন কিছু নির্দেশনা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী কাজ চলছে।
অবাধ অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, রিকশা চালকদের জীবিকা ও রুটি-রুজির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তরের সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে পরবর্তী পদেপ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, ঢাকা শহরের বাইরে নিবন্ধিত রিকশা রাজধানীতে চলাচল করতে পারবে না। ঢাকায় যেসব রিকশা রয়েছে, শুধু তারাই রাজধানীতে চলবে। সেই অনুযায়ী লাইসেন্স নির্ধারণ করা হবে। এমনকি উত্তরের রিকশাও দেিণ চলাচল করতে পারবে না।
এ বিষয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ সাইফুল নেওয়াজ বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারের সুস্পষ্ট নীতির ঘাটতি রয়েছে। যেসব ওয়ার্কশপে এসব রিকশা তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিয়ে পুরো পরিবহন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দেড় কোটি মানুষের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সরকার কতটা ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দিতে পারে- এখন সেটিই দেখার বিষয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তিন চাকার মোটরচালিত রিকশাগুলো পুরোপুরি নিরাপদ করা প্রযুক্তিগতভাবে অসম্ভব। তবে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, মহানগরের বাইরে এগুলো স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ব্যাটারির সঠিক রিসাইকেলিং এবং কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমেই শুধু এ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
একদিকে সড়ক নিরাপত্তা ও যানজটের দীর্ঘদিনের সমস্যা; অন্যদিকে লাখো মানুষের জীবিকা সবকিছু মিলিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য নতুন রুট পারমিট কতটা কার্যকর হবে- সেটিই এখন দেখার বিষয়। অটোরিকশা খাতের সঙ্গে প্রত্য ও পরোভাবে প্রায় দেড় কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে এ বিপুল জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
"








































