নিজস্ব প্রতিবেদক
সবজি ও মুরগির দামে স্বস্তি বেড়েছে মাছের দাম

নিত্যপণ্যের বাজারে বর্তমানে কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ বিরাজ করছে। বাজেট ঘোষণার পরও বাজারে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন পড়েনি। বিশেষ করে সবজি, ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামে কিছুটা কমতি দেখা গেছে। ফলে দৈনন্দিন কেনাকাটায় সাধারণ ক্রেতারা আগের তুলনায় কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন। তবে রাজধানীর মাছের বাজারে এখনো দেখা মিলছে না স্বস্তির। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসেও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চড়া দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে রুই, কাতল, চিংড়ি, পাবদা ও ইলিশের দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই। বাজারে তুলনামূলক কম দামের মাছ থাকলেও অধিকাংশ পরিবারের পছন্দের মাছ কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, শ্যামবাজার ও আশপাশের কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বাজারে প্রতি কেজি তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৬০ টাকা দরে। চাষের কই মাছের দাম ২২০ টাকা, চেওড়া ২৫০ টাকা এবং পাঙাশ ২৫০ থেকে ২৭০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। সিলভার কার্প ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং মিরর কার্প ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। মাঝারি আকারের পাবদা মাছের দাম ৪৫০ টাকা কেজি। পোয়া মাছ আকারভেদে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা এবং টেংরা মাছ ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। শিং মাছের দাম ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং মাগুর মাছ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে রয়েছে।
বাজারে রুই ও কাতল মাছের দামও বেশ চড়া। আকার ও মানভেদে এসব মাছ প্রতি কেজি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের কাতল মাছের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ৬৫০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে। চাষের চিংড়ি ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বড় আকারের গলদা চিংড়ির দাম ১ হাজার টাকা থেকে ১৫০০ টাকা। মাছের বাজারে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে ইলিশ। ছোট আকারের ইলিশ ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, মাঝারি আকারের ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং বড় আকারের ইলিশ ২ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা গেছে। যাত্রাবাড়ী আড়তে মাছ কিনতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সবজির বাজার কিছুটা সহনীয় হলেও মাছ কিনতে গেলে বাজেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আগে যে টাকায় দুই কেজি মাছ কেনা যেত, এখন সেই টাকায় এক কেজিও পাওয়া কঠিন।’
শনির আখড়ার গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, ‘বাচ্চাদের জন্য নিয়মিত মাছ কিনতে হয়। কিন্তু দাম এত বেশি যে এখন পরিমাণ কমিয়ে কিনছি। ইলিশ কেনার কথা তো চিন্তাই করতে পারি না। মাছ বিক্রেতা শাহীন মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টির মৌসুম শুরু হলেও সব ধরনের মাছের সরবরাহ এখনো স্বাভাবিক হয়নি। আড়ত থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, তাই খুচরা বাজারেও দাম বেশি। আরেক মাছ ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘কয়েক ধরনের মাছের সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। তবে সামনে নদী ও খামারের মাছ বেশি আসতে শুরু করলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিমের দামও কমে ডজনপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায় নেমে এসেছে, যা কিছুদিন আগেও প্রায় ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সবজি বাজারে মৌসুমি উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় সরবরাহ বেড়েছে, ফলে বেশিরভাগ সবজির দামও কমে এসেছে। বর্তমানে বাজারে অধিকাংশ সবজি ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, মৌসুমি উৎপাদন বাড়ায় বাজারে পটোল, কাঁকরোল, বরবটি, লতি, ধুন্দুলসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে। ফলে এসব সবজি ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে এবং বাজারে দামের স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে।
রায় সাহেব বাজারের মুরগি বিক্রেতা আলী আজম বলেন, কয়েকদিন ধরেই ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম স্থিতিশীল রয়েছে। প্রতি কেজি ১৬০ টাকায় ব্রয়লার এবং ৩২০ টাকায় সোনালি মুরগি বিক্রি করছি। বাজারে সরবরাহ ভালো থাকায় দামে তেমন ওঠানামা নেই। নারিন্দা বাজারের মাছ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের পর মাছের বাজার কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। প্রায় সব ধরনের মাছ আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। বাজারভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকা ওঠানামা করলেও বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। ক্রেতারাও এখন স্বাভাবিকভাবে মাছ কিনছেন।
রিকশাচালক বরকত আলী বলেন, আগের তুলনায় সবজির দাম কমেছে। আজ ৫০ টাকায় এক কেজি ধুন্দুল কিনেছি। করলা, বরবটি, মুলাসহ বেশিরভাগ সবজি ৫০ থেকে ৭০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। শুধু গাজরের দাম এখনো একটু বেশি। সব মিলিয়ে এখন বাজারে কিছুটা স্বস্তি আছে। নারিন্দা বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নাসির উদ্দিন বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন বাজার অনেকটা সহনীয় মনে হচ্ছে। বিশেষ করে ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও বেশিরভাগ সবজির দাম কম থাকায় সংসারের খরচ কিছুটা সামাল দেওয়া যাচ্ছে। আশা করি, বাজারের সব পণ্যের দাম এমন থাকবে বা আরো কমবে।
রাজধানীতে বাজারভেদে দরদাম কিছুটা কমবেশি হলেও সবজির দাম গত সপ্তাহের মতোই স্থিতিশীল রয়েছে। মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজার ও আশপাশের কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। গত সপ্তাহে কাঁচামরিচের দাম কেজি প্রতি ১২০ টাকা ছিল। এ সপ্তাহেও বাজারগুলোয় ১২০ টাকা ধরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে মানভেদে গোল বেগুন কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। আর শান্তিবাগ কাঁচাবাজারে ৮০ থেকে ১০০ টাকা বিক্রি করা হচ্ছে। এ পণ্যটির দাম গত সপ্তাহেও একই রকম ছিল বলে ক্রেতা-বিক্রেতারা জানিয়েছেন।
লম্বা বেগুন গত সপ্তাহে ৭০ টাকা বিক্রি হলেও ১০ টাকা কমে কেজি প্রতি এখন ৬০ করে বিক্রি করছেন বলে জানান মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা শহিদুল ইসলাম। তবে শান্তিবাগ বাজারে ৮০ টাকা দরে লম্বা বেগুন বিক্রি করছেন বাজারের ব্যবসায়ী আবুল কালাম। যদিও কালামের পাশের দোকানে ৭০ টাকা করে বিক্রি করছেন কবীর। আবুল কালাম বলেন, লম্বা বেগুনগুলো ভালো হবে। এ কারণে কিছুটা দাম বেশি। তিনি বলেন, ‘দামে একটু কম বেশি পাবেন। তবে বাজারে সবজির দাম কমেনি, বাড়েনি। আসলে সবজির মানের কারণে দাম কমবেশ হচ্ছে।’
তবে বাজারভেদে পণ্য দামের কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে কেজি প্রতি শসা বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা। আর শান্তিবাগ বাজারে পণ্যটির দাম ৭০-৮০ টাকা। যদি বিক্রেতারা বলছেন, গত সপ্তাহে শসার দাম কিছু বাড়তি ছিল। এদিকে মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে টমেটো কেজি প্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা টাকা করে বিক্রি হতে দেখা গেছে। আশপাশে অন্যান্য বাজারেও একই দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে কোনো কোনো দোকানে বেশি দামেও বিক্রি হতে দেখা গেছে। শান্তিবাগ ‘মগা’ কাঁচাবাজারে একটি দোকানে টমেটো ১৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এ দোকানে আসা দিদারুল ইসলাম বলেন, ঈদের পর থেকে ১০০-১২০ টাকার মধ্যেই টমেটো কিনছি। এখানে ১৬০ টাকা চাচ্ছে। তাই কিনিনি। অন্য জায়গায় আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে সেখান থেকে নেব।
একই বাজারে আসা খায়রুল আকন্দ বলেন, এ বাজারে দাম একটু বেশি। একটু বেশি হলেও বাসার পাশে তাই এখানেই বাজার করি। তবে রেলগেট বাজারে গেলে সব পণ্যের দামই কিছুটা কম আছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মালিবাগ বাজারে পটোলের দাম কেজি প্রতি ৫০ টাকা ও শান্তিবাগ বাজারে ৬০ টাকা। তবে দুই বাজারেই ঝিঙার দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। বরবটি কেজি প্রতি মালিবাগে ৬০ টাকা ও শান্তিবাগে ৮০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। আর চিচিঙ্গা ও ধন্দুল কেজি প্রতি মালিবাগে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা ও শান্তিবাগে ৬০ টাকা। তবে ঢ্যাঁড়শের দাম বাজার দুটিতে ২০ টাকা পার্থক্য দেখা গেছে। মালিবাগে ঢ্যাঁড়শ বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৪০ টাকা করে। আর শান্তিবাগে একই পণ্য বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা।
যদিও পেঁপে দুই বাজারেই কেজি প্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচকলার দামও বাজার দুটিতে একই রকম। হালি প্রতি কাঁচকলার দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এসব পণ্যের দাম গত সপ্তাহেও একই রকম ছিল বলেও জানা গেছে। মালিবাগে একেকটি লাউ ৫০ থেকে ৬০ টাকা করে হলেও শান্তিবাগে ৬০ থেকে ৭০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। একেকটি জালি মালিবাগে ৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে, শান্তিবাগে ৬০ টাকা করে। আর মিষ্টিকুমড়া কেজি প্রতি মালিবাগে ৪০ টাকা হলেও শান্তিবাগে ৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
"









































