মেহেদী হাসান
খোঁড়াখুঁড়ি হচ্ছে ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা
ফের ভোগান্তিতে পড়ছেন ঢাকাবাসী

ঢাকার রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি চলে বারো মাস। একদিক থেকে রাস্তা ভালো হলে ফের অন্যদিকে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। পিচঢালা রাস্তায় চলাচল বেশি দিন ভাগ্যে জোটে না। দীর্ঘ ৮ বছর খোঁড়াখুঁড়ি করে ঢাকা ওয়াসা পানি সরবরাহের লাইন সংস্কার করে। এবার নতুন করে পয়োনিষ্কাশন লাইন করতে ঢাকার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করবে ঢাকা ওয়াসা। এতে ভোগান্তিতে পড়তে যাচ্ছেন ঢাকাবাসী।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুসারে, ঢাকা ওয়াসা ‘ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পের’ আওতায় পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের জন্য এই খোঁড়াখুঁড়ি করবে। কাজ হবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। এজন্য ব্যয় হবে ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। এরই মধ্যে চলতি বছরের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্প চলবে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এই প্রকল্পের অর্থ দিচ্ছে। প্রকল্পের কাজে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪৫৩ কিলোমিটার এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৬ কিলোমিটার সড়ক কাটা হবে। এরই মধ্যে নিউমার্কেট, আজিমপুর, কমলাপুর, মগবাজার, খিলগাঁও ও মতিঝিলের কিছু এলাকায় খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে।
নগর-পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একই সড়ক একবার পানির লাইনের জন্য, আরেকবার পয়োবর্জ্য লাইনের জন্য কাটা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার ফলাফল। মাটির নিচের অবকাঠামোর কাজ একসঙ্গে পরিকল্পনা করে করা উচিত। সেটি না হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নাগরিকদের বারবার একই দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে।
ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। অনেক এলাকায় নোংরা পানি খাল, নালা ও নদীতে গিয়ে পড়ে। এ অবস্থায় ঢাকায় পরিকল্পিত, কার্যকর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি আছে। নতুন প্রকল্পটির আওতায় ৫০ হাজার নতুন গৃহসংযোগ, পাগলা পয়োশোধনাগারের সক্ষমতা বাড়ানো ও প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার বর্জ্য পানি শোধনের লক্ষ্য রয়েছে। তবে নগর–পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সমস্যা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়, সমস্যা হলো কাজের ধরন ও নাগরিক ভোগান্তি সামলানোর ব্যবস্থা নিয়ে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, বর্ষার সময় ঢাকায় রাস্তা কাটার অভিজ্ঞতা নগরবাসীর জন্য মোটেই সুখকর নয়। কারণ, খনন করা অংশে পানি জমে যায়। কাদা তৈরি হয়। যান চলাচল ব্যাহত হয়। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবা আটকে যায়। মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। ভালো সড়ক কেটে ঠিকমতো পুনর্নির্মাণ না করলে তার স্থায়িত্বও কমে যায়।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম বলেন, একই রাস্তা যাতে বারবার কাটতে না হয়, সেই বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষকদের সঙ্গে বসে এমনভাবে পরিকল্পনা তৈরির চেষ্টা করবেন, যাতে সড়ক বারবার কাটতে না হয়। এতে মানুষের ভোগান্তি কম হয়।
প্রকল্পটির পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম মিঞা বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাসের মতো প্রশাসনিক জটিলতা, প্রকল্পভেদে সময়সীমার ভিন্নতা, নির্দিষ্ট বরাদ্দ, বিপুল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজনীয়তা, উন্নয়ন সহযোগীদের ভিন্নতা, উন্নয়ন সহযোগীদের পৃথক শর্তের মতো বিষয় সমন্বিত কাজে বাধা সৃষ্টি করে।
অবশ্য ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক মো. ওয়াজ উদ্দিন বলেন, সমন্বয় করে রাস্তা কেটে একসঙ্গে দুটি কাজ করা কঠিন। কারণ, একেকটি কাজে বিদেশি একেক সংস্থা অর্থায়ন করে। আর তাদের নীতিমালা, শর্তও থাকে আলাদা।
নগর-পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অদক্ষতা, পরিকল্পনাহীনতা ও সমন্বয়হীনতার ফলাফল। মাটির নিচের অবকাঠামোর কাজ একসঙ্গে পরিকল্পনা করে করা উচিত। সেটি না হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নাগরিকদের বারবার একই দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে। এতে শুধু মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে না, সরকারি অর্থের অপচয়ও হচ্ছে। ভালো সড়কের স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে সংস্থাগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
"









































