মোঃ রফিকুল ইসলাম, মোহনগঞ্জ (নেত্রকোনা)
নেত্রকোনায় মাদকের ভয়াবহ ছোবলে যুব সমাজ

মাদকাসক্তি এক ভয়াবহ মরণব্যাধি। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যে সকল সমস্যা বিদ্যমান তার একটি অন্যতম সমস্যা হচ্ছে মাদকের ভয়াল থাবা। দিন দিন মাদকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। বর্তমানে দেশের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে মাদকের কেনাবেচা হয় না। শহর থেকে শুরু করে গ্রামেও এটি সহজলভ্য।
আমাদের দেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, গাজা, ফেনসিডিল, মদ, আফিম, হেরোইন, কোকেন, প্যাথেডিন, বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ, এমনকি জুতার আঠাও রয়েছে। এসব ভয়ানক নেশা জাতীয় দ্রব্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে। এসব মাদকের বেশির ভাগই আসে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমার হতে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদকের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নেত্রকোনায় মাদকের ভয়াবহতা বেড়ে যাওয়ায় ঘটছে নানা অপরাধ। এমনকি হত্যাকাণ্ডও ঘটছে। পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান চললেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ব্যবসায়ীসহ মদদদাতারা। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন। আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। সুশীল সমাজের দাবি, বিচারহীনতা অভাবেই এসব ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তৎপর থাকলেও সামাজিক সচেতনতা নেই।
নেত্রকোনায় মাত্র ৫ দিনে চার খুন। গত (১ জুন থেকে ৫ জুন) পর্যন্ত জেলায় ঘটে গেছে চারটি খুনের ঘটনা। নেত্রকোনা সদরে নারীসহ দুইজন এবং জেলার কেন্দুয়ায় দুইজন।
নেত্রকোনা শহরের কাটলি এলাকায় গত (১ জুন) রাতে শুধু নারীকে খুনই করেনি। নারীর স্বামী ও ছেলেকেও কুপিয়ে জখম করেছে। এ ঘটনায় আব্দুর রশীদ নামের অভিযুক্তকে স্থানীয়রা আটক করে পুলিশেও দিয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, নেশায় আসক্তির কারণকেই এ ঘটনাটি ঘটেছে। এমনকি ছেলেটা রিকশা চালাতো। মাঝে মধ্যেই ওই পরিবারটি তাকে সহযোগিতা করতো। কিন্তু বিদ্যুতবিহীন রাতে এ ঘটনাটি ঘটাল, এলাকাবাসী যদি একটু বুঝতো তাহলে ওকে ছাড়তো না। এদিকে তুচ্ছ ঘটনাসহ একই সপ্তাহে আরও তিনটি খুন হয় দুই উপজেলায়। এছাড়াও মঙ্গলবার (৯ জুন) দুপুরে জেলার সদর উপজেলার চল্লিশা ইউনিয়নের চল্লিশা গ্রামে মাদকসেবী ছেলে শ্যামলকে ভাত দিতে দেরি হওয়ায় শাবলের আঘাতে মিনতি নামের ষাটোর্ধ্ব মাকে হত্যা করে। পুলিশ তাকেও আটক করে।
এর আগে গত ২ মে দুর্গাপুরেও মাদক সেবনে নিষেধ করায় কেলিশ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মার্চ, এপ্রিল, মে তিন মাসে শিশুসহ আরও তিনটি খুন হয়েছে জেলার কলমাকান্দাসহ বিভিন্ন উপজেলায়। আসামিরাও ধরা পড়েছে। এসব ঘটনায় নেত্রকোনা জেলাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। হানাহানি মারামারির ঘটনা তো ঘটছেই। সাধারণ মানুষ মনে করছেন মাদকের সহজলভ্যতা এবং বিচার না হওয়া এসবের প্রধান কারণ।
বাংলাদেশে মাদক মামলা অত্যন্ত গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। দেশের প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, মাদক উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রি, ক্রয়, সংরক্ষণ ও সেবনের কারণে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। গত ৫ মাসে মোহনগঞ্জ থানায় মাদকদ্রব্য মামলা ৪২টি, ৫ লক্ষ ৭৭ হাজার ৮০০ মূল্যে মাদকদ্রব্য উদ্ধার, হেরোইন ৩০ গ্রাম ও ১০ পুরিয়া, ইয়াবা ট্যাবলেট ২৭০ পিচ,গাঁজা ৬ কেজি ৭৮০ গ্রাম ও ১৩টি গাছ,১ লিটার-১২৫ মিলি ও ১২ বোতল মদ,রেক্টিফাইড স্পিরিট ১৬০টি বোতল।
সরেজমিনে ঘুরে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েরা মোহনগঞ্জ শিয়ালজানি লেকে এসে অবাধে মেলামেশায় লিপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে শিক্ষার্থীরা জোড়ায় জোড়ায় লেকের ব্রিজ ও ফেন্সিংগুলোতে বসে আড্ডায় লিপ্ত হয়। দিন-রাত সমানতালে প্রকাশ্যে মাদকদ্রব্য বিক্রি, মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে চিন্তাইসহ এসএস পাইপ দিয়ে বানানো ফেন্সিং বা রেলিংগুলি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
বিচার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মাদকের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের জামিন না দেওয়ার বিষয়ে আইনি ও সামাজিক পর্যায়ে জোর দাবি রয়েছে।
তবে পুলিশ এবং মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতিনিয়ত মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। এদিকে যারা ধরা পড়ছে তারাও ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। ফলে বের হয়ে আবারও তারা মাদক সেবন এবং ব্যবসা অব্যাহত রাখছেন। এতে সমাজ এক ভয়াল থাবায় পড়ে গেছে। এর থেকে বের হতে হলে মাদক নির্মূলে কার্যকরি পদক্ষেপ নিতে হবে। খুন-ধর্ষণের মতো অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
জানা গেছে, জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৫ মাসে গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইন, ভারতীয় মদ, ইনজেকশনসহ মোট ৩ কোটি ৮২ লাখ ১১ হাজার ৫৭০ টাকার মাদক জব্দ করেছে। জেলা পুলিশের অভিযানে গত ৫ মাসে ২৯২ টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে ৪৩০ জন।
জনবল সংকট নিয়ে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গত ৫ মাসে মাদক উদ্ধার করেছে ৮৮ লাখ ৪৯ হাজার ৮৫০ টাকার। জেলা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ৬৬০ টি অভিযানে ১২১ টি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ১৩৬ জন।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুলতান মাহমুদ জানান, স্কুল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে মাদক। মাদকের সহজলভ্যতা এর প্রধান কারণ। মানুষ সব সময় এক ধরনের আতঙ্কে থাকে কখন কী হয়। শহরের মাঝখানে নারীকে এক মাদকসেবী কুপিয়ে হত্যা করলো। তবে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন থাকলে এবং মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে না থাকলে এই মাদক এত বিস্তার করতে পারতো না। যারা আটক হয় তারা বেরিয়ে যায়। বিচার হয় না। এ জন্য এর ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে।’ এদিকে জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জিয়া উদ্দিন জিয়া বলেন, ‘যারা অপরাধী তারা সাজা পেলেও অনেকে অপরাধ না করে আটক থাকবে এটা কাম্য নয়। একটা বিচার হতে নানা ধাপ পার করতে হয়।’ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহাকারী পরিচালক মো. নাজমুল হক বলেন, ‘আমরা যে মাদক কারবারিদের আটক করছি, তারা বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে এসে পুনরায় মাদক ব্যবসায় নিজেদের যুক্ত করছে। বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। আইন প্রয়োগ করেও মাদক কারবারিদের নিভৃত করা যাচ্ছে না। এর ফলেও মাদকের প্রবণতা সমাজে বহমান রয়েছে।’ এটি একটি সামজিক সমস্যা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সমাজের সকলকে সম্মিলিতভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যার যে দায়িত্ব সেগুলোকে সমন্বিতভাবে পালন করলে এই ব্যাধি নির্মূল হবে।’
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে মাদকের সূত্রপাত হচ্ছে। সকল পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। আর সেজন্য রাষ্ট্রের সব অর্গান চেষ্টা চালাচ্ছি। শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করেই নয় আমরা সামাজিক ক্যাম্পেইন চালাচ্ছি। এর জন্য সবাইকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সচেতনতা বাড়াতে হবে।’
সমাজের ভেতরেই সহিষ্ণুতা বাড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজের সহিষ্ণুতা এবং আইন প্রয়োগকারী ব্যবস্থা সমন্বয় হলেই সমাজে অপরাধ কমবে।
পিডিএস/এমএইউ









































