নিজস্ব প্রতিবেদক

  ৮ ঘণ্টা আগে

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

সবার জন্য সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তেই ভিন্নধর্মী বাজেট

* মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব * কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোর * সামাজিক সুরক্ষা খাতে অগ্রাধিকার * নতুন পে-স্কেলে দুর্নীতি কমার আশা * অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য

আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি দৃশ্যমানভাবে ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুর্নীতি কমিয়ে আনারও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য সরকার বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। দেশের শ্রমবাজারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেই কম মজুরি পান। কারণ তাদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সরকার কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন জনশক্তি তৈরি করা, যারা দেশে কিংবা বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন এবং বেশি আয় করতে সক্ষম হবেন। একইসঙ্গে সৃজনশীল অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে সরকার কোনো নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নেয়নি। বরং সামাজিক উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, জলবায়ু অভিযোজন এবং দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতির সর্বস্তরের মানুষ যাতে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে, সে লক্ষ্যেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও সরকার একটি ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি করতে চায়। ধারাবাহিকভাবে সংস্কার ও বিনিয়োগ কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া গেলে আগামী ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি দৃশ্যমানভাবে ঘুরে দাঁড়াবে।

দুর্নীতি কমাতে নতুন পে-স্কেল বা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু। তিনি বলেন, অভাবে থাকলে মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়। বেতন বাড়ালে সরকারি চাকরিজীবীদের চাহিদা পূরণ হবে। এতে দুর্নীতি কমে আসবে। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিসহ দীর্ঘ ১১ বছর তাদের কোনো ইনক্রিমেন্ট (পে-স্কেল) হয় না। এদিকে সবকিছু দাম বেড়েছে। এটার তো সমন্বয় করতে হয়। সরকারি কর্মচারী বলে তাদের কষ্ট পেতে হবে, এটা হয় না। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করছি, তাদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দুর্নীতি কমে আসবে। তাদের আয় বাড়বে এবং জীবনযাত্রা উন্নত হবে। এতে এমনিতেই দুর্নীতি কমে আসবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে দেশের অর্থনীতি কিছু গোষ্ঠী ও পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত মানুষের স্বার্থকেন্দ্রিক ছিল। এবার সেই ধারা থেকে বেরিয়ে অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে উন্নয়নের মূল স্রোতে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। আমীর খসরু বলেন, সরকার প্রতিটি মানুষকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। সে কারণেই সবার জন্য বাংলাদেশ স্লোগান সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের ধারণাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি বাজেট তৈরি করা হয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে থাকা মানুষকেও অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতে দেশের অর্থনীতি মূলত পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ছিল। কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা সংগঠিত স্বার্থান্বেষী মহল অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও অনেক মানুষ উন্নয়নের মূলধারার বাইরে রয়ে গিয়েছিল। এবারের বাজেটে সেই বৈষম্য কমিয়ে সব শ্রেণির মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সীমিত সম্পদ ও বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বাজেটে সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের জন্য কমবেশি বরাদ্দ, কর্মসূচি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রোডম্যাপও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণেই এবারের বাজেটের প্রেক্ষাপট, দর্শন ও পরিকল্পনা অন্য সময়ের তুলনায় ভিন্ন।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, গত দেড় দশকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতি নিয়মভিত্তিক কাঠামোর ওপর পরিচালিত হলেও বর্তমানে অনেক দেশ সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ঝুঁকেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন ধরনের অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘যুদ্ধ-বিগ্রহ এখন বিশ্ব বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। এতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ আরো বাড়ছে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক অবস্থা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে বর্তমান সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই সরকার অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সবার জন্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার লক্ষ্যে কাজ করছে। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে প্রতিটি প্রকল্প ও ব্যয় চারটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে। এগুলো হলো ভ্যালু ফর মানি, রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক বিবেচনা। এ চারটি বিষয় সামনে রেখেই আগামী দিনের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। সে কারণেই সরকার বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনগণ ও গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আরো জানান, বাজেটের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ভাষায় একটি নাগরিক বাজেট প্রকাশ করা হয়েছে- যাতে একজন নাগরিক একনজরে পুরো বাজেটের মূল বিষয়গুলো বুঝতে পারেন। এ বিষয়ে জনগণের কোনো প্রশ্ন থাকলে সরকার তার ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বাজেটের ওপর দীর্ঘ বক্তব্য না দিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বকে বেশি গুরুত্ব দেন এবং বাজেট সম্পর্কে গণমাধ্যমের মতামত ও পর্যবেক্ষণকে স্বাগত জানান।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়