নিজস্ব প্রতিবেদক
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের সুযোগ রয়েছে : সিপিডি

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে নতুন সরকারের জন্য একটি বড় সুযোগ এবং একইসঙ্গে কঠিন পরীক্ষা হিসেবে দেখছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, দীর্ঘ ৪ বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশার মতো বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে ঘোষিত এ বাজেটটি বাস্তবায়নের ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির ফেলো অ্যাধাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদসহ প্রতিষ্ঠানটির আরো কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রস্তাবিত এ বাজেট সরকারের প্রথম বাজেট। এ বাজেটটি এমন সময়ে দেওয়া হয়েছে যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এবং গত প্রায় ৪ বছর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। তার পাশাপাশি দেখছি আমাদের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুর্বল ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোটামুটি অবস্থায় রয়েছে, প্রেসারে ছিল কিন্তু মোটামুটি ভালো হয়েছে, তবে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এখন একটা ক্রিটিক্যাল সময়- আমাদের জ্বালানি সংকট। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটকে মানবিক, গণতান্ত্রিক মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বাজেট বলা হয়েছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক আরো বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিপিডির মতে, বাজেটের এ দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলোয় মিল রয়েছে। বাজেটের সাফল্য আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের মানের ওপর নির্ভর করবে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না।
সিপিডি বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বলছে, বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান ফল পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ বাজেট নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের প্রথম বড় সুযোগ। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরো টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় সংসদে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার ফলে সামগ্রিক বাজেটে নিট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের এ বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা (যার মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা) এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কালো টাকা সাদা করা প্রসঙ্গে সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে এটা যুক্তিসংগত নয়, এটা নৈতিকভাবেও কাম্য নয়। কারণ যারা সঠিকভাবে দিচ্ছেন, তাদের জন্য এটা একটা অনুৎসাহ সৃষ্টি করে। রাজনৈতিকভাবেও এটা ইতিবাচক নয়। কারণ সাধারণ মানুষ মনে করেন, যারা দুর্নীতি করেছে, কর ঠিকমতো দেয়নি, সরকার তাদের সুবিধা দিয়েছে আর আমাদের (সাধারণ মানুষ) ওপরে কর দেওয়া হচ্ছে। এদিকে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার যে সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ও প্রাক্কলন নির্ধারণ করেছে, তার মূল ভিত্তি নিয়েই বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন সিপিডির ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হিসাব যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেই ভিত্তিটাই আসলে ঠিক নেই।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ওপরে ভিত্তি করে একটা প্রাক্কলন করেছে। সেটা সম্পদ আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে ঋণ, রপ্তানি, আমদানি, জিডিপির প্রবৃদ্ধি- সবকিছুর জন্য গত অর্থবছরের আলোকে যে ভিত্তিটা করা হয়েছে, আমাদের বিবেচনায় সে ভিত্তিটাই কিন্তু ঠিক না। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতাকে আড়াল করে বা অতিমূল্যায়ন করে এ ভিত্তি বছরটি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এর ফলে সম্পদ আহরণ, বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ, আমদানি-রপ্তানি কিংবা সার্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, তা শুরুতেই এক ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতার মুখে পড়েছে। তাতে বাজেটের শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বাজেটের সামষ্টিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হবে। বাস্তবসম্মত ভিত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে প্রাক্কলনগুলো করা হলে বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও এর বাস্তবায়নযোগ্যতা অনেক বেশি সুদৃঢ় হতো। অথচ সরকারের সামনে সুযোগ ছিল প্রকৃত বাস্তবতা স্বীকার করে ভিত্তি ঠিক করা। কারণ অর্থনীতিতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
"








































