নিজস্ব প্রতিবেদক

  ২৫ এপ্রিল, ২০২৫

দেশে নতুন করে দরিদ্র হবে ৩০ লাখ মানুষ

অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে বাংলাদেশে আরো ৩০ লাখ মানুষ অতি গরিব হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। অতি দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯.৩ শতাংশ হবে। এদিকে বিশ্বব্যাংকের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ কম হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গত বুধবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করেছে।

সেখানে বলা হয়, চলতি বছরে শ্রমবাজারের দুর্বল অবস্থা অব্যাহত থাকবে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শ্লথগতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা গরিব মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এতে বৈষম্য আরো বাড়বে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে কোনো মানুষের দৈনিক আয় ২.১৫ ডলারের কম হলে তাকে হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২২ সালে বাংলাদেশে এ হার ছিল ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে হতদরিদ্রের হার ৯.৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংক জাতীয়ভাবে হিসাব করা দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। চলতি বছর তা বেড়ে ২২.৯ শতাংশ হতে পারে। বিশ্বব্যাংক বলছে অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া শ্রমবাজার পরিস্থিতি চলতি বছর দুর্বল থাকতে পারে। এর আগে বিশ্বব্যাংকের দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদন ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট : ট্যাক্সিং টাইমস’-এর পূর্বাভাসে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের

(জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ হতে পারে। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে ৪.১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। নতুন পূর্বাভাসে সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী অর্থবছরের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৪.৯ শতাংশ হতে পারে।

রাজস্ব ঘাটতি অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় বাধা : বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ কম হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরকারের বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসারিত হচ্ছে না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় বাধার সৃষ্টি করেছে। ফলে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) হার প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। সরকারের লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হচ্ছে না। গত আগস্টে সরকারের পালাবদলের পর সৃষ্ট অস্থিরতায়ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে দেশটির প্রবৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে চলতি অর্থবছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশ হতে পারে। গত বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘সাউথ এশিয়া ডেভেলপমেন্ট আপডেট : ট্যাক্সিং টাইমস’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় বাধা হচ্ছে রাজস্ব আহরণ নিম্ন পর্যায়ে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় না হওয়ায় বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ঘাটতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কখনো কখনো এ ঘাটতি লক্ষ্যমাত্রার চার ভাগের এক ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এ ঘাটতির কারণে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় বাধার সৃষ্টি করেছে। রাজস্ব আয় কম হওয়ার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সরকারের বিনিয়োগ কম হচ্ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন হচ্ছে না। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ছে না। দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে না। অর্থসংস্থানের গতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দেশটিকে এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। অনেক দেশ বৈশ্বিক মন্দার প্রভাবে সৃষ্ট চড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বাংলাদেশ এখনো পারেনি। সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এ হার এখনো অনেক বেশি। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি মাত্রায় বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতির হার নিম্নমুখী হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং আগস্টে হঠাৎ সরকার পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার পূর্বাভাসের চেয়ে কম হচ্ছে। অর্থনীতি এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। যে কারণে গত অক্টোবরের তুলনায় এপ্রিলেও পূর্বাভাস কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করার এবং তার সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো আধুনিকীকরণের জন্য একটি কর্মসূচিতে প্রবেশ করেছে। এতে আগামীতে সুফল বয়ে আনতে পারে বলে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।

এতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের কর রাজস্বের বিপরীতে জিডিপি অনুপাত কার্যত স্থির হয়ে পড়েছে। জিডিপি বাড়লে কর রাজস্বের অনুপাত বাড়ছে না। এমন কি হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ কেবল দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে বড় বাধার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশে রাজস্ব বৃদ্ধি-কর ভিত্তির পরিবর্তনের জন্য কর রাজস্বের প্রতিক্রিয়া শিথিলনীতি প্রয়োগ করা হয়। যে কারণে রাজস্ব আয় বাড়ানো যাচ্ছে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ৪.২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে হতে পারে ৩.৩ শতাংশ। আগামী অর্থবছরে হতে পারে ৪.৯ শতাংশ। তবে গত অক্টোবরের তুলনায় এপ্রিলে প্রবৃদ্ধির হার ০.৭ শতাংশ কমানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য কমানো হয়েছে ০.৪ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।

বে টার্মিনাল নির্মাণসহ ২ প্রকল্পে ৮৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক : বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) মধ্যে দুটি অর্থায়ন চুক্তি সই হয়েছে। গত বুধবার ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী এবং বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত কান্ট্রি ডিরেক্টর গেইল এইচ মার্টিন চুক্তিপত্রে সই করেন। এদিন বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি) বাস্তবায়নে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার প্রকল্প (এসএসপিআইআরআইটি) বাস্তবায়নে ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়।

প্রকল্প দুটি যথাক্রমে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও অর্থ বিভাগ বাস্তবায়ন করবে। বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে চলতি মাস থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত এবং এসএসপিআইআরআইটি প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল এ বছরের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।

ঋণ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্তর্র্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয় সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের (এসএআর) ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজারসহ বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রামে বে টার্মিনাল নির্মাণে গত ২০ এপ্রিল একনেক সভায় ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (বিটিএমআইডিপি) অনুমোদন হয়। ওই দিন সভায় সুরক্ষা জোরদার প্রকল্পও (এসএসপিআইআরআইটি) অনুমোদন পায়। মোট অনুমোদন দেওয়া হয় ১৬টি প্রকল্প। যার মোট ব্যয় ধরা হয় ২৪ হাজার ২৪৭ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন তিন হাজার এক কোটি ৩৪ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ ১৬ হাজার ৭১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন চার হাজার ৪২৬ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয় হবে। অনুমোদিত ১৬টি প্রকল্পের মধ্যে ১৩টি নতুন এবং তিনটি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে।

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়