নিজস্ব প্রতিবেদক
মিরপুরে ফের নিঃসঙ্গ আরেক এক মায়ের লাশ উদ্ধার

নিঃসঙ্গ মা নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর আলোচনা শেষ হতে না হতেই মিলল আরেক মায়ের লাশ। নূরজাহান বেগমের বাসা মিরপুর-৬ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ১৩ নম্বর সড়কে। আর ১০ নম্বর সড়কে নিজের বাসায় মিলল সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে আরেক মায়ের লাশ।
গত মঙ্গলবার সেলিনাকে বারবার ডেকেও সাড়া পায়নি স্বজন। অন্য সময় হলে এটাকে স্বাভাবিকভাবে নিতেন তারা। কিন্তু দুদিন আগে একই এলাকায় নূরজাহানের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি তাদের উৎকণ্ঠায় ফেলে। শেষে রাতে পুলিশ ডাকা হয়। দরজা ভেঙে পাওয়া যায় সেলিনার অর্ধগলিত লাশ। পুলিশ ও সেলিনার স্বজন সূত্রে জানা যায়, চারতলা পৈতৃক বাড়ির তৃতীয় তলায় একা থাকতেন সেলিনা। তার স্বামী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে কানাডায় থাকেন। সেলিনা আফরোজ প্রায় ১০ বছর আগে কানাডা থেকে ফিরে আসেন। স্বামী-সন্তানের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। কারো সঙ্গে সেভাবে মিশতেন না। খোঁজ নিতে গেলেও বিরক্ত হতেন বলে দাবি স্বজনের। তাই কয়েকদিন আগে মৃত্যু হলেও কেউ বুঝতে পারেননি।
প্রতিবেশী এবং ওই বাড়ির সাবেক ভাড়াটিয়া গাড়ি ব্যবসায়ী মো. দুলাল বলেন, ‘উনি (সেলিনা) পর্দানশীন ছিলেন। লোকজনের সঙ্গে তেমন মিশতেন না। মাঝেমধ্যে শুধু বাজার করার জন্য বের হতেন। সাধারণত সুপারশপ থেকেই সব কিনতেন। যাওয়া-আসার পথে কখনো কখনো টুকটাক কথা হতো। স্বামী ও সন্তানরা ওনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না। এটা নিয়ে উনি মনোকষ্টে ছিলেন বলে মনে হতো।’ সেলিনার ভাগনি জামাই বলেন, আমরা প্রতিদিনই তার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতাম। কিন্তু দরজায় ধাক্কা দিলেও বেশিরভাগ সময় খুলতেন না। ফোন কল রিসিভ করতেন না। বাজার করা বা ডাক্তার দেখানোসহ কোনো কাজে সহায়তা করতে গেলেও ফিরিয়ে দিতেন। তিনি নিজের মতো করে থাকতেন। কোনো গৃহকর্মী রাখতেও রাজি হননি। মাঝেমধ্যে সন্ধ্যার পর বের হয়ে নিজের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সারতেন। দিনে বের হতেন না।
সেলিনার ভাগনি জামাই বলেন, বছরের পর বছর এমন দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। এ কারণে ডাকাডাকিতে তিনি সাড়া না দিলেও প্রথমে আমরা অন্যকিছু ভাবিনি। তবে এ এলাকারই এক বাসা থেকে একজন বৃদ্ধার গলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনার পর আমরা তার খবর নিই। গত বছর কোরবানি দিলেও এবার তিনি (সেলিনা) দেননি। এমনকি ঈদের দিনও তিনি কারো ডাকে সাড়া দেননি। তার সঙ্গে শেষ কথা হয় ঈদের আগে গত ২৬ মে। মঙ্গলবার রাতেও পরিবারের সদস্যরা তাকে ডেকে সাড়া না পাওয়ায় বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। রাত ১২টার পর পুলিশ সদস্যরা ঘরে ঢুকে দেখেন ডাইনিং স্পেসে তার লাশ পড়ে আছে। শরীর ফুলে গিয়েছিল। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। ফ্ল্যাটের ভেতর অগোছালো ও ময়লা জমে ছিল।
তিনি জানান, বাড়িটির চতুর্থ তলায় সেলিনার বড় বোন তাজকেরা রহমান থাকেন। তিনি নিজে অসুস্থ হলেও বোনের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করতেন। তৃতীয় তলায় থাকতেন সেলিনা। দোতলায় তাদের এক ভাই থাকতেন। এখন তিনি পাশে নিজেদের জমিতে তৈরি ১০ তলা ভবনে থাকেন। ওই ভবনে পরিবারটির বাকি সদস্যরাও থাকেন। আর পুরোনো চারতলা বাড়ির নিচতলায় একসময় একটি স্কুল ছিল। করোনা মহামারির সময় সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে দোতলা ও একতলা ফাঁকা পড়ে আছে। স্বজন সূত্রে জানা যায়, সেলিনার লাশ বুধবার মিরপুর ১০ নম্বরের কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তিনি দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে ছোট ছিলেন। তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের মাধ্যমে স্বামী-সন্তানের কাছে মৃত্যুর খবর পাঠানো হয়েছে। তবে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে কেউ মৃতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।
পল্লবী থানার ওসি হাসান বাসির বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে কল পেয়ে মঙ্গলবার রাতে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ডেকে নিয়ে দরজা খুলে তার লাশ পাওয়া যায়। আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সকালে লাশ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় মৃতের ভাতিজা আশফাকুর রহমান বাদী হয়ে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা করেছেন। এর আগে রবিবার রাতে মিরপুরের একই এলাকা থেকে নূরজাহান বেগমের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তার চার ছেলেমেয়ের মধ্যে একজন যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং একজন কানাডাপ্রবাসী। আর স্কুলশিক্ষক মেয়ের বাসায় থাকতেন মা। যদিও মা কবে মারা গেছেন, তা জানাতে পারেননি মেয়ে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল?্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমাদের জন্ম, বেড়ে ওঠা, বার্ধক্য থেকে মৃত্যু সবই হবে পরিবারে, এমনটাই আমাদের চাওয়া। কিন্তু কয়েকশ’ বছর পরপর সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। আমরা এখন তেমনই একটি ক্রান্তিকালে রয়েছি। আমরা পরিবারকেন্দ্রিক চিন্তা এখনো ছাড়তে পারিনি অথচ জীবনের প্রয়োজনে সম্পর্কের সমীকরণগুলো বদলে গেছে। পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকায় অনেক মা-বাবা একা থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ থাকছে না।’ তৌহিদুল হক বলেন, ‘উন্নত দেশে নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য কল্যাণমুখী ব্যবস্থা আছে। আমাদের সরকার এমন উদ্যোগ নিতে পারে। কোনো একটা প্রকল্পের অধীনে চাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে, যারা এ ধরনের মানুষের খোঁজখবর রাখবে।’
"








































