সংসদ প্রতিবেদক

  ১৯ জানুয়ারি, ২০২১

সংসদে রাষ্ট্রপতি

মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হোন

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলে দল-মতের পার্থক্য ভুলে আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও সুশাসন সুসংহতকরণ, গণতন্ত্র চর্চা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে সর্বস্তরের জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে এ কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।

এর আগে বিকাল সাড়ে ৪টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। অধিবেশন শুরুর পর শোক প্রস্তাব করা গ্রহণ হয়। এরপর সভাপতিম-লী মনোনয়ন হয়। প্রতিবার বছরের শুরু অধিবেশনের প্রথম দিন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সংসদে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার তা হয়নি। বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে সংসদের ‘উত্তর প্লাজা’ দিয়ে সংসদ ভবনে ঢোকেন রাষ্ট্রপতি। স্পিকার রাষ্ট্রপতির আগমনের ঘোষণা দিলে সশস্ত্র বাহিনীর একটি বাদক দল বিউগলে ‘ফ্যানফেয়ার’ বাজিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্ভাষণ জানায়। সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি ঢোকার পর নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। স্পিকারের ডান পাশে রাখা লাল রঙের গদিওয়ালা চেয়ারে তিনি আসন নেন।

------
স্পিকারের অনুরোধের পর রাষ্ট্রপতি তার লিখিত ভাষণের সংক্ষিপ্তসার পড়া শুরু করেন। এ সময় তার মূল বক্তব্য ‘পঠিত’ বলে গণ্য করার জন্য স্পিকার শিরীন শারমিনকে অনুরোধ জানান আবদুল হামিদ। স্পিকারের আসনের বাম পাশে রাখা ‘রোস্ট্রামে’ দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন তিনি।

ভাষণে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেন, “বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে দেশ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে আমাদের আরো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আসুন, দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করি।”

জাতীয় সংসদকে দেশের জনগণের ‘আশা-আকাক্সক্ষার কেন্দ্রবিন্দু’ বর্ণনা করে আবদুল হামিদ বলেন, ‘স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পরমতসহিষ্ণুতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসন সংহতকরণ এবং জাতির অগ্রযাত্রায় সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। গণতন্ত্রায়ন, সুশাসন ও নিরবচ্ছিন্ন আর্থসামাজিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দল, শ্রেণি ও পেশা নির্বিশেষে ঐকমত্য গড়ে তোলার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য আমি উদাত্ত আহ্বান জানাই।’

১৪৭ পৃষ্ঠার মূল ভাষণের সংক্ষিপ্তসারে রাষ্ট্রপতি অর্থনীতি, বাণিজ্য-বিনিয়োগ, খাদ্য-কৃষি, পরিবেশ-জলবায়ু, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের কার্যক্রম ও সাফল্য তুলে ধরেন। এ ছাড়া দেশে আইনের শাসন সুসংহত ও সমুন্নত রাখা এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে সব ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করেছে। সম্প্রতি সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাফল্যের সঙ্গে কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরিভিত্তিতে ২ হাজার চিকিৎসক ও ৫ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ, কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে ১০ হাজার ৫২৫টি সাধারণ বেড, ৬৬৬টি আইসিইউ এবং ৭৩টি ডায়ালাইসিস বেড, ৫৫৪টি ভেন্টিলেটর, ১৩ হাজার ৫১৬টি অক্সিজেন সিলিন্ডার, ৬৭৮ হাইফ্লো নেইজল ক্যানুলা এবং ৬৩৯টি অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের ব্যবস্থা রাখার কথা বলেন রাষ্ট্রপতি। তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে বলেন, ‘আমি আশা করছি, সরকার শিগগিরই দেশের জনগণকে কোভিড-১৯-এর টিকা প্রদান করতে পারবে।’

আর্থিক খাত ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রশংসা করে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিক অর্জন বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস মহামারিতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ২-৪ শতাংশে। তবে একই সময়ে মাথাপিছু জাতীয় আয় ৮ দশমিক ১-২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬৪ ডলারে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘শান্তি, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির যে পথে আমরা হাঁটছি, সে পথেই আমাদের আরো এগিয়ে যেতে হবে। এ বছর মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। তবে আমাদের লক্ষ্য ২০৪১ সালে বিশ্বসভায় একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত হওয়া। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা একটি কল্যাণমূলক, উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সক্ষম হব।’

প্রতিবারের মতো এবারও মন্ত্রিসভার ঠিক করে দেওয়া ভাষণের সংক্ষিপ্তসার অধিবেশনে পড়েন রাষ্ট্রপতি। কোনো সংসদের প্রথম এবং নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব আনা হয়। পুরো অধিবেশনজুড়ে ওই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করেন সংসদ সদস্যরা। আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সংসদে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

এই অধিবেশনে সাবেক ডেপুটি স্পিকার, সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, নয়জন সংসদ সদস্যের নামে শোক প্রস্তাব আনা হয়েছে। এ ছাড়া দশম অধিবেশনের পর মারা যাওয়া দেশের গণ্যমান্য বিভিন্ন ব্যক্তির নামে শোক প্রস্তাব আনা হয়। শোক প্রস্তাব আনার পর মরহুমদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়।

শোক প্রস্তাবে যাদের নাম রয়েছে তারা হলেন সাবেক ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, পটুয়াখালী-৩ আসনের এমপি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইন, সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী খালেদুর রহমান টিটো, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সাবেক এমপি শাহ-ই-জাহান চৌধুরী, কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আলী, রাজশাহী-৩ আসনের সাবেক এমপি মোহাম্মদ আবু হেনা, নোয়াখালী-২ আসনের সাবেক এমপি এম এ হাসেম, পটুয়াখালী-৩ আসনের সাবেক এমপি আনোয়ার হোসেন, নরসিংদী-২ আসনের সাবেক এমপি দেলোয়ার হোসেন খান, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি সামসুদ্দীন আহমেদ, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক এমপি নুরজাহান ইয়াসমিন, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট খালেদা পান্না।

এ ছাড়া সংসদ সচিবালয়ের কামরা পরিচালক মো. কোরবান আলী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট ভাই শহীদ শেখ আবু নাসেরের সহধর্মিণী শেখ রাজিয়া নাসের, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বড় জা রওশন আরা ওয়াহেদ রানী, ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের স্ত্রী গুলশান আরা, মহিলা পরিষদের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আয়শা খানম, স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন, সমাজসেবক ও ভাষাসৈনিক মো. জাহিদ হোসেন মুসা মিয়া, সাবেক সচিব, বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক কবি ও গবেষক মনজুরে মওলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান, একুশে পদকপ্রাপ্ত অভিনেতা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, নাট্যব্যক্তিত্ব আলী যাকের, প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ শাহাদাৎ হোসেন খান, বীরউত্তম ক্যাপ্টেন আকরাম, অভিনেতা আবদুল কাদের, সাংবাদিক সম্পাদক মিজানুর রহমান খান এবং বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করা হয়।

আরো শোক প্রকাশ করা হয় করোনায় মৃত্যুবরণকারী রাজনীতিক, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, ব্যবসায়ী ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীদের।

 

 

"

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close