বিশ্বজিত রায়

  ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

উৎসব

দুর্গতিনাশিনীর আগমন

দুর্গাপূজা হিন্দুদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। মহা ধুমধাম আর আনন্দের ফল্গুধারা নিয়ে হাজির হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভক্তি আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে এই উৎসবটি পালন করে থাকে। স্বর্গের দেবতারা যেমন দেবী দুর্গার আরাধনা করে অসুরদের কাছ থেকে স্বর্গরাজ্য ফিরে পেয়েছিল, তেমনি পৃথিবীর পুরো প্রাণিকুলের ওপর যেন বর্ষিত হয় জগজ্জননীর আশীর্বাদ। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে দেবী দুর্গাকে বিল্ববৃক্ষকে আরাধনা ও মন্ত্রপাঠ করে পূজা দিয়ে বোধনের অনুষ্ঠান করা হয়। দুর্গাদেবীকে আহ্বান জানানো হয়-তুমি এসো হে দুর্গাদেবী, আমাদের পূজা গ্রহণ কর। শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী-এই তিন দিন সাড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে দেবী দুর্গার পূজার্চনা করা হয়। সব শেষে দশমী পূজা। আর একে বলা হয় বিজয়া দশমী। বিজয়া দশমীকে নিয়ে নানা বিশ্লেষণ রয়েছে। এর মধ্যে রাবণের সঙ্গে যুদ্ধে রামের বিজয় ও বিজয়োৎসব। মহিষাসুরকে দেবী দুর্গা বধ করেন এবং দেবতারা ফিরে পান তাদের হারানো স্বর্গরাজ্য। তার জন্যও বিজয়োৎসব পালন করা হয়।

সনাতন ধর্মে মূর্তিপূজা নিয়ে বিভিন্ন জনের ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, হিন্দুদের কোনো ধর্মগ্রন্থেই মূর্তিপূজার কোনো বিধান নেই। শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু [৬] পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দেবী দুর্গার মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা করেন। এই সময় তিনি ‘বাগ্ভব’ বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে এক শ বছর ধরে কঠোর তপস্যামগ্ন হন। এর ফলে মনু শীর্ণ হয়ে পড়লেও কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তখন দেবী দুর্গা বর দিতে আসেন। মনু তখন দুর্গার কাছে দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা তখন মনুর সেই প্রার্থনা পূরণ করেন। সেই সঙ্গে দেবী দুর্গা তার রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন [৭]।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে এই দুর্গাপূজার একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরাকালে রম্ভাসুর নামে এক অসুর ছিল। অসুরদের রাজা ছিল তার পুত্র মহিষাসুর। মহিষাসুর ছিল ব্রহ্মার ভক্ত। মহিষাসুর অমরত্ব লাভের আশায় কঠোর তপস্যায় মগ্ন থাকতেন। তপস্যাকালীন এক দিন ব্রহ্মা এসে হাজির হলেন মহিষাসুরের কাছে। তখন ব্রহ্মা মহিষাসুরকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কী চাও? মহিষাসুর ব্রহ্মার কাছে অমরত্ব লাভ করার বর চাইলেন। ব্রহ্মা মহিষাসুরকে বললেন, এই বর অসুরদের জন্য নয়, এই বর শুধু দেবতাদের জন্য। এভাবে অনেক তপস্যা করেও অমরত্বের বর লাভ করতে পারেননি মহিষাসুর। দিনের পর দিন মহিষাসুর তপস্যা করতে লাগলেন। ব্রহ্মা তার তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে আবার হাজির হলেন মহিষাসুরের কাছে। ব্রহ্মা মহিষাসুরকে বললেন, বলো তুমি কী বর চাও? তখন মহিষাসুর বললেন, হে প্রভু ব্রহ্মা, আপনি আমাকে এমন বর দান করুন যেন আমি ত্রিভুবন জয় করতে পারি। ব্রহ্মা বললেন, তথাস্তু! তুমি সর্বত্র অপরাজেয় থাকবে শুধু নারী ছাড়া। মহিষাসুর ব্রহ্মার বর শুনে বললেন, প্রভু নারীর প্রতি ভীতু নই আমি। তপস্যায় যা অর্জন করেছি আমি, আমার জীবনে তা আশীর্বাদ হয়ে থাকবে।

ব্রহ্মার বর পেয়ে অসুররাজা মহিষাসুর স্বর্গকে তার হাতের মুঠোয় নিয়ে ভীষণ অত্যাচারী হয়ে উঠলেন। স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন মহিষাসুর। দীর্ঘ সময় ধরে চলা যুদ্ধে মহিষাসুর জয়ী হলেন। আর দেবতারা হেরে গেলেন মহিষাসুরের কাছে। অসুর বাহিনী দেবতাদের স্বর্গ থেকে উচ্ছেদ করে স্বর্গরাজ্যে তাদের আধিপত্য বিস্তার ঘটাল। স্বর্গহারা দেবতাগণ একত্রিত হয়ে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহাদেবের শরণাপন্ন হলেন। দেবতাদের কাছ থেকে অসুরদের অত্যাচারের বর্ণনা শুনে মহাদেব ও বিষ্ণু ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। দেবতাদের সঙ্গে ব্রহ্মা নিজেও ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহাদেবসহ সকল দেবতাদের শরীর থেকে আগুনের মতো তেজরশ্মি বের হতে লাগল। সব তেজরশ্মি একত্রিত হয়ে একটি বিশাল আলোকরশ্মিতে পরিণত হলো। সেই আলোকরশ্মি থেকে আবির্ভূত হলেন এক নারী মূর্তি, দেবী দুর্গা। পরে শিব তার ত্রিশূল, বিষ্ণু তার অমোঘচক্র, বরুণ তার ভীমর্নাদ শঙ্খ, অগ্নি তার শক্তি, বায়ু তার ত্রিদিক বিজয়ী ধনু এবং বাণপূর্ণ দুটি অক্ষয় তুণীর, ইন্দ্র তার দুর্নিবার বজ্র, বিশ্বকর্মা তার খরশান কুঠার ও অভেদ্য বর্ম এবং হিমালয় বাহন স্বরূপ তার কালানল সুদৃশ্য সিংহ দিলেন। অন্যান্য দেবরাও তাদের অমোঘ অস্ত্রাদি দান করলেন দেবীর উদ্দেশ্যে। সমগ্র অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দেবী দুর্গা অট্টহাসিতে প্রকম্পিত করলেন সর্বদিক। মহিষাসুরকে বধ করার জন্য দেবী দুর্গা সুসজ্জিত দশ হাতে দশ অস্ত্রে। তার দশ হাত প্রতীক দশ দিক রক্ষার। দেবীর পায়ের নিচে রয়েছে উদ্ধত সিংহ আর উদ্ধত অসুর। সিংহ রাজসিক আর অসুর তামসিক শক্তির প্রতীক। পশুরাজ সিংহ বহন করে দেবীকে। দেবী কাঠামোতে শোভা পায় দেব সেনাপতি কার্তিক, যিনি শক্তির প্রতীক। সিদ্ধিদাতা গণপতি গণেশ, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী ও ঐশ্বর্যময়ী শ্রীদেবী লক্ষ্মী। সবার উপরে উপবিষ্ট রয়েছেন মঙ্গলের বার্তাবাহী মহাদেব। সবাই শোভা পান দেবীর এক এক শক্তির প্রতীক হিসেবে।

মহামায়া দেবী দুর্গার রূপ দেখে দেবতাগণ আনন্দে আত্মহারা হয়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। আর মুণিগণ ভক্তি ভরে দেবীর স্তব করতে লাগলেন-

‘যা দেবী সর্বভুতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা

নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥’

এদিকে দেবী দুর্গার অট্টহাসি আর জয়ধ্বনির কথা জানতে পেরে অসুররাজ মহিষাসুর রাগে উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। অসুর সেনাপতি চিক্ষুর ও চামরকে আদেশ দিলেন, যাও অসুরদের নিয়ে ওই রমণীকে আমার কাছে নিয়ে এসো। ওই রমণী নাকি আমার প্রাণনাশ করে স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করবে। অসুর সেনাপতি চিক্ষুর ও চামর দেবী দুর্গাকে প্রাণনাশের জন্য ছুটে গেলেন। অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত অট্টহাস্যময়ী অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত রমণীর মূর্তি দেখে চিক্ষুর ও চামর জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওরে সুন্দরী রমণী তুমি কে?’ দেবী দুর্গা অট্টহাসি দিয়ে বললেন, ‘আমি দুর্গতিনাশিনী। তোদের মৃত্যুর দূত। এখানেই তোদের মৃত্যুর ঘন্টা বাজবে। আর সে জন্যই আমার আগমন।’ তারপর অসুর সেনাপতি চিক্ষুর ও চামর ধনুকের বাণ ছুড়লেন দেবীর দিকে। দেবী দুর্গা নিমিষেই বাণ প্রতিহত করে তীর ধনুকের ছিলা দিলেন কেটে। চিক্ষুর ঢাল-তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে এলেন দেবীর দিকে। দেবীর শূলাঘাতে নিহত হলেন অসুর সেনাপতি। চিক্ষুর ও চামরের নিহত হওয়ার খবর শুনে অসুর রাজ মহিষাসুর নিজেই যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। সব সৈন্যকে আদেশ দিলেন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। কিন্তু বাদ সাধলেন তার স্ত্রী। কাঁদতে কাঁদতে বললেন ওগো স্বামী, ‘তুমি এই যুদ্ধ বন্ধ কর। কেন যেন আমার মনে হচ্ছে এই যুদ্ধে অঘটন ঘটবে।’ মহিষাসুর কোনো কথা না শুনে তার স্ত্রীকে পায়ে ঠেলে দিয়ে বললেন, ‘তুমি সরে যাও আমার কাছ থেকে। আমার রাজ্যে অন্য কারো বাড়াবাড়ি আমি কিছুতেই সহ্য করব না। এরপর শুরু হলো দেবী দুর্গার সঙ্গে মহিষাসুরের যুদ্ধ। মহিষাসুর একের পর এক বিভিন্ন রূপ ধারণ করে দেবীর দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন। এক পর্যায়ে ভীষণ আকৃতির মহিষ রূপ ধারণ করলেন মহিষাসুর। দেবী দুর্গার খড়গের এক প্রচন্ড আঘাতে মহিষাসুররূপী অসুরের মস্তক তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। বিচ্ছিন্ন হওয়া মহিষের দেহ থেকে মহিষাসুরকে বের করলেন। তারপর দেবী দুর্গা শূলবিদ্ধ করে বধ করলেন মহিষাসুরকে। দেবতাগণ তখন আনন্দে মেতে উঠলেন। অসুরমুক্ত হলো স্বর্গরাজ্য। দেবতারা ফিরে পেলেন তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বর্গ। দেবী দুর্গার জয়গানে চারদিক মুখরিত হতে লাগল। মহামায়া দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার আগমনে পৃথিবী থেকে নাশ হোক সকল অমঙ্গল, অপশক্তি ও অপছায়া। পৃথিবীজুড়ে সমগ্র মানুষের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist
Error!: SQLSTATE[42S02]: Base table or view not found: 1146 Table 'protidin_sangbad.news_hits_counter_2020_04_07' doesn't exist