মাহমুদুল হক আনসারী
দৃষ্টিপাত
দশ মহররমের শিক্ষা ও তাৎপর্য

মহররম হিজরি বছরের প্রথম মাস হওয়ায় এ মাসে আল্লাহতায়ালার কাছে প্রতিটি মুসলমানের একমাত্র চাওয়া-পাওয়া হলো তিনি যেন মুসলিম উম্মাহকে বছরজুড়ে রহমত, বরকত ও কল্যাণ দ্বারা ঢেকে দেন। যদিও ইসলামের অনেক আগে থেকেই এ মাসের ১০ তারিখ অতি সম্মানিত এবং ফজিলতপূর্ণ। কেননা এই দিনে আল্লাহতায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেন আর এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এই দিনে আল্লাহতায়ালা হজরত আদমের (আ.) দোয়া কবুল করেন। হজরত নুহের (আ.) জাতির লোকরা আল্লাহর গজব মহাপ্লাবনে নিপতিত হওয়ার পর ১০ মহররম তিনি নৌকা থেকে ইমানদারদের নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ৪০ দিন পর ১০ মহররম সেখান থেকে মুক্তি লাভ করেন। হজরত আইয়ুব (আ.) ১৮ বছর কঠিন রোগ ভোগ করার পর মহররমের এই দিনে আল্লাহর রহমতে সুস্থতা লাভ করেন। এ ধরনের অনেক ফজিলতপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে মহররম মাস জড়িত। ইসলামে মহররম মাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলেই এ মাসে রোজা রাখা মহানবীর (সা.) সুমহান আদর্শ।
মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চক্রান্তকারী ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে পবিত্র এই মহররম মাসের ১০ তারিখে নির্মমভাবে কারবালার প্রান্তরে শাহাদতবরণ করেন। সেদিন প্রকৃত ইসলাম ও সত্যের জন্য হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ইয়াজিদ বাহিনীর কাছে মাথা নত না করে যুদ্ধ করে শাহাদতবরণ করেছিলেন। হজরত ইমাম হোসেনের (রা.) শাহাদতের ঘটনার জন্য প্রত্যেক মুসলমানই সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করে থাকে। কারবালায় হজরত ইমাম হোসেন (রা.), তার পরিবারের সদস্যরা এবং কয়েকজন সাথি-সঙ্গীকে বড় নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে এ ঘটনা হজরত উসমানের (রা.) শাহাদতের ঘটনারই একটি ধারাবাহিকতা।
হজরত ইমাম হাসান ও হোসেন সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, জান্নাতের যুবকদের সরদার তারা। তাদের উভয়ের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) আল্লাহতায়ালার কাছে এই দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! আমি তাদের ভালোবাসি, তুমিও তাদের ভালোবাস। অতএব, যারা রাসুলুল্লাহর দোয়ার কল্যাণ এতটা লাভ করেছেন আর একই সঙ্গে যারা শাহাদতের পদমর্যাদাও লাভ করেন এমন মানুষ অবশ্যই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অনুসারে জান্নাতে মহান জীবিকা লাভ করবেন এবং তাদের হত্যাকারী অবশ্যই আল্লাহপাকের গজব এবং ক্রোধের শিকার হবে।
হজরত ইমাম হোসেন (রা.) এজিদের প্রতিনিধিদের এ কথাও বলেছিলেন, আমি যুদ্ধ চাই না, আমাকে যেতে দাও, আমি গিয়ে এক আল্লাহর ইবাদত করতে চাই বা কোনো সীমান্তে আমাকে পাঠিয়ে দাও যেন ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে করতে আমি শাহাদতবরণ করতে পারি বা আমাকে এজিদের কাছে নিয়ে যাও। যাতে আমি তাকে বোঝাতে পারি, আসল ব্যাপার কী। কিন্তু তার প্রতিনিধিরা কোনো কথা শোনে নাই। অবশেষে যুদ্ধ যখন চাপানো হয় তখন বীর পুরুষের মতো মোকাবিলা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না। এই স্বল্পসংখ্যক মুসলমান যাদের সংখ্যা ৭০-৭২ হবে তাদের মোকাবিলায় ছিল এক বিশাল সৈন্যবাহিনী। এদের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। আল্লাহতায়ালার প্রতিশোধ নেওয়ার নিজস্ব রীতি আছে যেভাবে হজরত ইমাম হোসেন (রা.) নিজেই বলেছিলেন, আল্লাহতায়ালা আমার হত্যার প্রতিশোধ নেবেন আর আল্লাহতায়ালা প্রতিশোধ নিয়েছেনও। এজিদ বাহ্যত সাময়িক সফলতা লাভ করেছে। প্রশ্ন হলো এজিদের নেকির কারণে কী আজকে কেউ তাকে স্মরণ করে? যদি তার সুখ্যাতি থাকত তাহলে মুসলমান নিজেদের নাম এজিদই রাখত কিন্তু কোনো ব্যক্তি নিজের সন্তানের নাম আজ এজিদ আর রাখে না। হজরত ইমাম হোসেন (রা.) কখনো রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জনের লোভ রাখতেন না। তিনি সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তিনি ন্যায়ের জন্য দণ্ডায়মান হয়েছিলেন। ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠায় তার ত্যাগ, কোরবানি আমাদের জন্য অনেক শিক্ষা রেখে গেছে। নিজের অধিকার নিজের জীবন বাজি রেখে পৃথিবীতে সত্যের প্রসার করেছেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আমাদের উচিত হবে এ মাসে অধিকহারে নফল ইবাদতে রত হওয়া। কেননা এ মাসের নফল রোজা ও অন্যান্য ইবাদত রমজান মাস ছাড়া অন্য যেকোনো মাস অপেক্ষা অধিক উত্তম। (মুসলিম ও আবু দাউদ)। আশুরার রোজার বরকতে আল্লাহতায়ালা বান্দার এক বছরের গোনাহ মাফ করে দেন। অন্য হাদিসে এ সুখবর প্রদান করেছেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.)। তিনি বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, আশুরার রোজার ফলে আগের এক বছরের গোনাহ কাফফারা হয়ে যাবে (মুসলিম)। মুসলিম শরিফের অন্য এক বর্ণনায় জানা যায়, মহানবীর (সা.) ইন্তেকালের আগের বছর তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি তবে ৯ তারিখেও রোজা রাখব। এজন্যই আশুরার রোজার সঙ্গে সঙ্গে এর আগের দিন রোজা রাখাকে মুস্তাহাব বলেছেন ওলামায়ে কেরাম। এখন আমাদের বুঝতে হবে যে, ১০ মহররমকে কেন্দ্র করে আমরা যেন অতিরঞ্জিত কিছু করে না বসি; বরং হজরত ইমাম হোসেন (রা.) সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় যে আদর্শ রেখে গেছেন তা সব সময় আমাদের আঁকড়ে ধরে রাখতে হবে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
"




































