আহমেদ আমিনুল ইসলাম
দৃষ্টিপাত
ফেব্রুয়ারির প্রেরণায় ভাষাচর্চায় শুদ্ধতা আসুক

একুশের মহান প্রেরণা নিয়ে এসেছে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। এই প্রেরণা কেবল বাংলাই নয়, পৃথিবীর প্রত্যেক জাতি এমনকি প্রতিটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজে প্রচলিত মাতৃভাষারও মর্যাদা রক্ষার প্রেরণা। একদিকে সবারই নৈতিক দায়িত্ব তাদের স্ব-স্ব মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা; অন্যদিকে অপর জাতিগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সমাজে প্রচলিত ভাষাগুলোর প্রতিও সহানুভূতিশীল থাকা। কিন্তু আমরা কীভাবে আমাদের প্রত্যেকের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করব? কীভাবেই বা আমরা অন্যের মাতৃভাষার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখায় এবং সেসব ভাষা বিকাশে যত্নশীল হব? এমন প্রশ্নের আছে বহুবিধ উত্তর। নানাভাবেই আমরা আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে পারি- আমাদের পারতেই হবে। কারণ আমাদের মাতৃভাষা রক্ষার জন্য এদেশের অনেক তরুণকে বুকের রক্তে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের মসনদ রক্তাক্ত করতে হয়েছে, রক্তাক্ত করতে হয়েছে রাজপথ। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে কারাবরণ করতে হয়েছে অসংখ্য ছাত্র-জনতার। মোটকথা, অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই ভূগোল-বাংলায় আমরা পাকিস্তানি জান্তা শাসকের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে আমাদের মাতৃভাষাকে প্রতিষ্ঠা করেছি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে পেরেছি। মনে রাখতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারির প্রেরণা রাষ্ট্রভাষা বাংলার আত্মপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারকে ছাপিয়ে তামাম দুনিয়ার সব জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষা ও সেসব ভাষার বিকাশ ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকারেও পরিণত।
এখন আসা যাক মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার গল্পকথায়। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার আত্মপ্রতিষ্ঠা নিয়ে বিগত সত্তরোর্ধ্ব বছরে আমরা কতটুকু আত্মতুষ্টি অর্জন করতে পেরেছি সংশয়াতীত তো নয়ই বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশ্নসাপেক্ষও বটে। আচার-আচরণ, ব্যবহার-বিধি, দৈনন্দিন জীবন-যাপন এমনকি নীতি-নৈতিকতায়ও পরাশ্রয়ী মনোভাব থেকে আমরা আজও মুক্ত হতে পারিনি। অর্থাৎ উপনিবেশের সব প্রভাব ও চিহ্ন বিলোপের মধ্য দিয়ে বাংলাকে এখনো রাষ্ট্রের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ না হলেও সাফল্যের স্বর্ণস্বাক্ষর যে রাখতে পারিনি তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হবে- আমরা নিরন্তর কেবল সেই প্রত্যাশাই করে যাই। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের জীবনে আসে সেই অন্তহীন প্রত্যাশাকে উসকে দিতে, আমাদের পূর্বপুরুষদের রক্তে রোপিত স্বপ্নকে মনে করিয়ে দিতে। এবারো এসেছে ফেব্রুয়ারি- একুশে ফেব্রুয়ারির দৃপ্ত চেতনার মাস।
নানামাত্রিক প্রেরণায় ফেব্রুয়ারি মাস কর্মমুখর আর আবেগঘন অনুভূতি সঞ্চারের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে বাঙালির চেতনায় তুমুল তরঙ্গ বিস্তারের মাধ্যমে আমাদের উদ্দীপিত করে। এ হলো মুদ্রার এক পিঠ। কিন্তু একই মুদ্রার অপর পিঠে আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র। আমাদের দেশে অনেক শিক্ষিত লোক আছেন যারা তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বরং বলতে ভালোবাসেন, ‘তিনি বাংলাটা ঠিক ভালোভাবে লিখতে জানেন না!’ অনেকে আবার কম্পিউটারে স্বচ্ছন্দে ইংরেজি টাইপ করতে পারলেও বাংলাটা তাদের ভাষায় ঠিক পেরে ওঠেন না! আর নির্বিশেষে প্রায় সবারই বক্তব্য বাংলা বানান বড়ই জটিল। দেখা যাবে বাংলা বানানে যাদের সমস্যা আছে, ইংরেজি বানানেও যে তারা পটু সে সম্ভাবনা খুব কম। ভাগ্যিস কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইংরেজি ভুল বানানগুলো লাল রঙে দেখিয়ে দেয়! বাংলা একাডেমি বানানরীতি প্রমিত করার উদ্দেশ্যে একটি অভিধান প্রকাশ করেছে তাও অনেক বছর হয়ে গেছে। কিন্তু সেই অভিধানের ব্যবহারিক প্রয়োগ স্কুল, কলেজ বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আমরা সচরাচর দেখতে পাই না। উচ্চশিক্ষার মাধ্যম বাংলা হলেও শুদ্ধ বানানরীতির প্রতি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদাসীনতাও বেশ লম্বা-চওড়া! প্রমিত বানানরীতির অভিধানটি যেন বেঁচেও মরেই আছে! বাংলা ভাষায় প্রচলিত বিভিন্ন শব্দের পরিবর্তিত এবং আধুনিক বানান ও বানানরীতি দেখানো আছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন উৎস থেকে বাংলা ভাষায় আগত শব্দের বানানবিষয়ক কিছু নিয়মণ্ডনীতিও আছে। এসব নিয়মের প্রতি একটু যত্নবান হলেই অনেক শব্দের বানান বিভ্রান্তি দূর করা সম্ভব। বানান বিভ্রান্তি বিদূরিত হলে যে কোনো বাংলা রচনা প্রথমত দেখতে ভালো লাগে আর বিধিসম্মত বাক্য গঠনের মাধ্যমে আমরা আমাদের ব্যবহারিক জীবনে শুদ্ধ ও প্রমিত বাংলা ভাষার প্রয়োগকে আরো সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে পারি। মাতৃভাষার শুদ্ধচর্চার মধ্য দিয়েই ভাষাশহীদদের প্রতি আমরা আমাদের ঋণও খানিকটা শোধ করতে পারি।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের বলা সম্ভব যে, বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য এত এত মানুষ যদি প্রাণ দিতে পারেন, অসংখ্য মানুষ যদি কারাবরণ করতে পারেন তবে আমরা কেন ভাষার শুদ্ধ ব্যবহারের জন্য খানিকটা সচেতন হতে পারব না? ভুল বানান আর অশুদ্ধ বাক্য গঠনের ভারে কেন আমরা আমাদের মাতৃভাষাটিকে দিন দিন দরিদ্র, নিঃস্ব ও শ্রীহীনতায় ভারাক্রান্ত করে তুলব? অসতর্ক, অমনোযোগ ও যথেচ্ছ ব্যবহারে আমাদের মাতৃভাষা ক্রমেই শ্রীহীন ও সমৃদ্ধিহীনই হবে না, কালপ্রবাহে একদিন তা একটি ব্যর্থ ভাষায়ও পরিণত হয়ে যেতে পারে। এ কথা ছাত্রছাত্রীদেরই বলা সহজ। কিন্তু রাষ্ট্রের অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে যারা সর্বত্র সবার চোখের সম্মুখে উজ্জ্বল নিয়ন আলোয় ভুল বানানের সাইনবোর্ড বিলবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে যত্রতত্র। তাদের কে বলবে? কে সচেতন করাবে? সে দায়িত্বই বা নেবে কে? জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি নিজে এরূপ একটি দায়িত্ব নিলে তা খুব ‘বাড়াবাড়ি’ হবে বলে আমরা মনে করি না। অন্তত ফেব্রুয়ারি মাসটিতে তারা ভাষাশুদ্ধির প্রচারমূলক একটি কর্মসূচি গ্রহণ করতেই পারে। সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে বাংলা একাডেমি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমিত বানানরীতি প্রচলনের বিষয়ে উদ্যোগীও হতে পারে। একটি নমুনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও ‘সরকারি’ এই শব্দটি লিখে থাকে ‘সরকারী’ হিসেবে যা বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানরীতির পরিপন্থি। প্রমিত বানানরীতির নিয়মে সোনালী, রূপালী, পূবালী প্রভৃতি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নামের বানানগুলোও ঠিক করার সময় এসেছে। এ কাজটি বাংলা একাডেমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চিঠি দিয়েও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথমত আবেদন করতে পারে। অথবা এ সংক্রান্ত মহামান্য উচ্চ আদালত কর্তৃক বাংলা একাডেমিকে দেওয়া ২০১৫ সালের রায়ের কপির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে প্রমিত বানানরীতি ব্যবহারসহ বানান ভুলের স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বাংলা ভাষাকে মুক্ত রাখার আহ্বানও জানাতে পারে। কারণ মহামান্য উচ্চ আদালত রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা করে রায় দিতে গেলে তাদের অন্যান্য কাজে গতিশীলতা হ্রাস পাবে। বানান সংশোধনে মহামান্য উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা সব প্রতিষ্ঠান গ্রহণ ও গ্রাহ্য করলেই ভাষার ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতা অনেকটা লাঘব হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। মহামান্য উচ্চ আদালতের ওই একটি নির্দেশনা মেনে আমাদেরই উচিত ভুল বানানে রাখা নিজেদের মিতালী, গীতালী, চৈতালী প্রভৃতি নামগুলো সংশোধন করা। সাধারণের চলাচলের পথের ধারে এরূপ আরো কিছু বানান প্রমাদ আমাদের অহরহ চোখে পড়ে। কোনো গাড়ি যদি হয় বিদ্যুৎ বিভাগের বা বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের, তবে সেই গাড়িতে লেখা থাকবে ‘জরুরী বিদ্যুৎ সরবরাহ’, ঔষধ কোম্পানির গাড়ি হলেও অনুরূপ ভুল বানানে লেখা থাকবে ‘জরুরী ঔষধ সরবরাহ’, কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গাড়িতে ‘জরুরী রপ্তানী কাজে নিয়োজিত’ ইত্যাদি। ভাবখানা এমন যে, ‘ঈ-কার’ ব্যবহারপূর্বক সরকারী, জরুরী, কোম্পানী, রপ্তানী, ফার্মেসী, তৈরী, বেশী, কাশী, গরীব, চাকরী, পদবী, দাদী, নানী, চাচী, ইত্যাদি লিখলে তা শক্তিশালী ও শুদ্ধ হয়! এরূপ শক্তিশালী করতে গিয়ে আমরা যে আসলে ভুলের আবর্তে নিমজ্জিত হই তা কখনো ভাবতে চাই না, চিন্তাও করতে চাই না। চিন্তা করতে চাই না এটি বাংলা ভাষা বলে, আমাদের মাতৃভাষা বলে! যেমনটি মায়ের কাছে সব অপরাধ, সব অন্যায় আব্দার সহজেই করতে পারি আরকি! কিন্তু এরকম আচরণ মঙ্গলকর নয়। ইংরেজি ভাষার ক্ষেত্রে আমরা কখনো এমন উদাসীনতা দেখাই, না কখনো বিন্দুমাত্র দেখাতে পারি? ইংরেজি রাজ-ভাষা আর বাংলা গরিবের ভাষা! এই হীনমানসিকতা আসলে ঔপনিবেশিক চিন্তার ফসল। ঔপনিবেশিক চিন্তার কবল থেকে আমরা মুক্ত হতে না পারলে আমাদের অহংকারের মাতৃভাষারও মুক্তি ঘটবে না কোনো কালে। পৃথিবীর সব জাতি-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য।
বাংলা ভাষায় আত্তীকৃত ও প্রচলিত কিছু ইংরেজি বানানের ক্ষেত্রে ‘স, শ, ষ’ প্রভৃতির ন্যায় উচ্চারণের সময় কী-এক রহস্যজনক কারণে ‘ষ’ বর্ণটির ওপর অযাচিত চাপ লক্ষ করা যায়। এরূপ কয়েকটি শব্দ এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ জরুরি। যেমন- ষ্টেশন, ষ্টুডিও, পোষ্ট, গেষ্ট, রেষ্ট, রেষ্টুরেন্ট, রোষ্ট, হোষ্টেল, লাষ্ট, ফার্ষ্ট, ইত্যাদি। নিয়ম অনুসারে এগুলো যথাক্রমে স্টেশন, স্টুডিও, পোস্ট, গেস্ট, রেস্ট, রেস্টুরেন্ট, রোস্ট, হোস্টেল, লাস্ট, ফার্স্ট ইত্যাদি হওয়ার কথা। বাংলা ভাষার অন্যান্য দুটি স-বর্ণ (শ ও স) প্রায়-বর্জনের কী এমন কাণ্ড ঘটে গেল যে, কেবল ‘ষ’-কে নিয়ে কারবারিদের উদ্ভট যত কারবারের এই নজির!
এবারের ফেব্রুয়ারি আমাদের অন্তত এভাবে প্রাণিত করুক যে, আমরা সচেতনভাবে বাংলা বানান ও বাক্য গঠনের ব্যক্তিক আন্দোলনের তরঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করব। পৃথিবীর সব জাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরাও এই তরঙ্গে আন্দোলিত হয়ে উঠুক যে, তারাও শুদ্ধরূপে নিজ নিজ ভাষাচর্চার মাধ্যমে তাদের মাতৃভাষার শ্রীবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি সাধনে সচেতন হবেন। শুদ্ধ ভাষাচর্চা শুধু ফেব্রুয়ারির নির্দিষ্ট একটি মাসেই নয়- বারোটি মাসেরই নিরন্তর প্রেরণা হোক। তাহলেই ভাষার জন্য রফিক জব্বার সালাম বরকতের আত্মোৎসর্গ সার্থক হবে। সার্থক হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অঙ্গীকারও।
লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
"




































