মো. আরাফাত রহমান জয়
দৃষ্টিপাত
বন ব্যবস্থাপনায় এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং

লাতিন শব্দ Foris থেকে ইংরেজি Forest শব্দটি এসেছে, যার বাংলা প্রতিশব্দ হলো বন। এর আভিধানিক অর্থ হলো বাইরে। লোকালয়ের বাইরে মিশ্র গাছপালা দিয়ে আচ্ছাদিত বিস্তৃত এলাকাকে বন বলে।
বিভিন্ন মাপকাঠির ভিত্তিতে বনের নানা ধরনের সংজ্ঞা আছে। ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে অরণ্য চার বিলিয়ন হেক্টর বা বিশ্বের জমির প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকাজুড়ে রয়েছে। এই বনাঞ্চল অনেক প্রাণীর লালনক্ষেত্র হিসেবেও যেমন কাজ করে তেমনি বিভিন্ন নদী-নালার পথ পরিবর্তন, মাটি সংরক্ষণ এর মতো কাজও করে থাকে। বন একটি দেশের নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক স¤পদ। বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ বন থেকে আসে। অর্থনৈতিক মূল্য ছাড়াও বনের পরিবেশ, সৌন্দর্যও আধ্যাত্মিক মূল্যমান আরো বেশি।
বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণাধীন ও ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর বনভূমি আছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু বনভূমি শূন্য দশমিক শূন্য ১৫ হেক্টরেরও কম, যেখানে বিশ্বে শূন্য দশমিক ৬০ হেক্টর। মোট বনভূমির মধ্যে ৮৪ শতাংশ প্রাকৃতিক বন এবং প্রায় ১৬ শতাংশ বৃক্ষরোপণ বন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের বন সাধারণত দুই প্রকার। (১) প্রাকৃতিক বন, যেমন- সুন্দরবন। (২) কৃত্রিম বন, যেমন- উপকূলীয় এলাকায় কেওড়াবন। আবার, অবস্থান ও বিস্তৃতির ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের বনাঞ্চলকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। (১) পাহাড়ি বন, (২) সমতল ভূমির বন, (৩) ম্যানগ্রোভ বন। পাহাড়ি বন এবং ম্যানগ্রোভ বন মোট বনভূমির ৬৮ শতাংশেরও বেশি জায়গাজুড়ে রয়েছে।
ব্রিটিশ শাসন শুরুরও আগে উপমহাদেশের কোথাও বন সংরক্ষণের বিজ্ঞানসম্মত কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। এমনকি ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকেও সাধারণের চাহিদা মিটানোর জন্য বনকে যথেচ্ছভাবে বিনষ্ট করা হয়েছে। ব্রান্ডিস ১৮৬২ সালে বার্মা থেকে দিল্লির যাওয়ার পথে বঙ্গদেশের বনের একাংশ পরিদর্শন শেষে এই অঞ্চলের বনের ভবিষ্যৎ স¤পর্কে একটা বক্তব্য প্রস্তুত করেছিলেন, আর এ থেকেই বাংলাদেশের বন ব্যবস্থাপনার সূত্রপাত।
যখন টেকসই বন পরিচালনার কথা উল্লেখ করা হয়, তখন বোঝা যায় যে বনগুলো টেকসই উন্নয়নের নীতিমালা অনুসারে পরিচালিত হয়। এই সংজ্ঞার ভিত্তিতে, টেকসই বন ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই এই তিনটি মৌলিক কারণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে; বাস্তুসংস্থান, অর্থনৈতিক এবং আর্থসামাজিক। টেকসই বন ব্যবস্থাপনা বিভিন্ন উপায়ে সুবিধা প্রদান করে। এই সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে, স্থানীয় জীবিকা রক্ষা করা, জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণ, গ্রামীন দারিদ্র্য হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা।
টেকসই বন ব্যবস্থাপনার একটি অন্যতম লক্ষ্য হলো- বন ও বনাঞ্চলকে এমনভাবে পরিচালনা করা যা তাদের জীববৈচিত্র্য, উৎপাদনশীলতা, পুনর্জন্মের ক্ষমতা, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের পরিবেশগত, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্রিয়াকলাপ স¤পাদনের সম্ভাব্যতা রক্ষা করে এবং জাতীয় ও বৈশ্বিক স্তরের অন্যান্য বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করে না। টেকসই বনায়ন পরিবেশ, বন্যপ্রাণী এবং বন সম্প্রদায়ের চাহিদার ভারসাম্য বজায় রাখে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও জন্য আমাদের বন সংরক্ষণ সমর্থন করে। বনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার লক্ষ্যে পর্যবেক্ষণ, সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বন বিভাগের নিজস্ব তেমন কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। টেকসই ব্যবস্থাপনা, তদারকি ও অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য এখনো স¤পদের সক্ষমতা এবং দক্ষ জনবলের অভাব আছে।
টেকসই বন (Forest) ব্যবস্থাপনার জন্য এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি আধুনিক প্রযুক্তিগত ব্যবহার হচ্ছে রিমোট সেন্সিং (RS) এবং জিআইএস (GIS)। রিমোট সেন্সিং এবং জিআইএস এমন একটি প্রযুক্তি যা ‘Birds Eye View’ ব্যবহার করে স¤পদের স্থানিক এবং অস্থায়ী গতিবিদ্যাকে কল্পনা করার ক্ষমতার জন্য প্রশংসিত, যা একটি বাস্তুতন্ত্র এবং ল্যান্ডস্কেপ স্তরের দৃষ্টিকোণকে সহজতর করে। বাস্তুতন্ত্রের আরএস (RS) এবং জিআইএস (GIS) পর্যবেক্ষণ আর্থসামাজিক তথ্যের সঙ্গে মিলে বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন শ্রেণির সম্ভাব্যতা বোঝার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে এবং ক্ষয়প্রাপ্ত বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধারকে সহজতর করে। সিন্থেটিক অ্যাপারচার রাডার (SAR) সেন্সর বোর্ডে বেশ কয়েকটি উপগ্রহ (RESR-1, JERS-SAR, Envisat, RADARSAT-1, 2) বন কার্বন স্টক পরিমাপ করতে ব্যবহার করা যেতে পারে। LiDAR রিমোট সেন্সিং সব ধরনের বনের জন্য গাছপালা স্বাস্থ্য এবং কার্বন স্টক অনুমান করতে রাডার এবং অপটিক্যাল সেন্সরগুলোর ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এগুলো সাশ্রয়ী এবং কার্যকর সরঞ্জাম যা টেকসই বন ব্যবস্থাপনা অনুশীলনে আরো বেশি ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ ছাড়া স্থানীয় জনসাধারণের সম্পৃক্ততা, বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন, জাতীয় বাজেটে বনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ, জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ নীতিমালা, আইনি কাঠামোর প্রয়োগ, টেকসই জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বন বিভাগের গঠনমূলক উদ্যোগ এসব কিছুর মাধ্যমে আমাদের বনের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি।
লেখক : শিক্ষার্থী
এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
"




































