আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

  ২১ জানুয়ারি, ২০২২

দৃষ্টিপাত

পরোপকার মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার

মানুষ এ পৃথিবীতে কিছুদিনের অতিথি মাত্র। নির্দিষ্ট সময় শেষে তাকে পাড়ি জমাতে হয় অনন্ত জীবনে। ক্ষণিকের এই আসা-যাওয়ার মাঝে মানুষ যে সামান্য সময়টুকু পায়, তাতেই একে অপরের আপন হয়ে ওঠে। তাদের মাঝে সৃষ্টি হয় হৃদ্যতার সম্পর্ক। একজনের বিপদে অন্যজন এগিয়ে আসে। নিজের জীবন তুচ্ছ করে অপরের জীবন বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সমুদ্রের গভীরেও। আসলে মহান আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন এমন প্রবৃত্তিতে। তিনি মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি, নৈতিকতা এবং অপরের প্রতি সহানুভূতির মতো মহামূল্যবান সম্পদ। সেজন্য মানুষ সামাজিক জীব, একইভাবে পরোপকারীও। আর পরোপকার হচ্ছে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্বের অলংকার।

পরোপকার স্থিতিশীল সমাজের নিয়ামক। পরোপকার না থাকলে সমাজের স্থিতিশীলতা থাকে না। সমাজে একের পর এক অন্যায়, অত্যাচার, খুনখারাবির মতো মন্দ কাজগুলো বৃদ্ধি পেতেই থাকবে। এর ফলে যেমনিভাবে সামাজিক বিশৃঙ্খলা মারাত্মক আকার ধারণ করবে, তেমনি বৃদ্ধি পেতে থাকবে প্রাকৃতিক দুর্যোগও। তাই তো রসুল (সা) বলেছেন, ‘তোমরা জগদ্বাসীর প্রতি সদয় হও, তাহলে আসমানের মালিক তোমাদের প্রতি সদয় হবেন।’ (তিরমিজি শরিফ : ১৮৪৭)

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে- man connot live alone অর্থাৎ মানুষ সমাজ ছাড়া চলতে পারে না। আর সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে সামাজিক হতেই হয়। মানুষকে সামাজিক হতে হলে পরোপকারের বিকল্প নেই। একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা, পাশে দাঁড়ানো, সহমর্মিতা প্রকাশ করা, নিজের সুখের জন্য ব্যস্ত না হয়ে অপরের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করাই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক।

কবির ভাষায়- ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি/এ জীবন মন সকলি দাও/তার মতো সুখ কোথাও কি আছে?/আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’

আল্লাহ না করুন, সমাজ থেকে যদি পরোপকার উঠে যায়, তাহলে মানুষ মাঠে-ঘাটে পথ-প্রান্তরে মরে পড়ে থাকবে, কেউ ফিরেও তাকাবে না। অবশ্য এমন দৃশ্য আমরা এই কিছুদিন আগেও করোনার প্রথম দিকে দেখেছি। বাবা-মা করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় সন্তান তাদের রাস্তায় ফেলে গেছে কিংবা বাবা-মাকে হাসপাতালে রেখে সন্তান উধাও হয়ে গেছে। এমন বহু সংবাদ আমরা শুনেছি ও দেখেছি। বিপরীতে আবার অনেকেই নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিয়েছেন। মৃতদের কাফন-দাফন করেছেন। অনেক বাড়িওয়ালা তাদের ভাড়াটিয়াদের ভাড়া মওকুফ করেছেন। সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরবন্দি মানুষদের সাহায্য, সহযোগিতা করেছেন। যারা করেছেন, তারাই রসুল সা.-এর হাদিসের অনুসরণ করেছেন। নবীজি বলেছেন, ‘অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত করো।’ (বোখারি, হাদিস : ৫৬৪৯)

যারা এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, তারাই নিজেদের পরকাল সুখময় করতে পেরেছেন। পরোপকার শুধু পরের জন্যই নয়, বরং এই পরোপকারের মাধ্যমে নিজেরও অনেক কল্যাণ সাধিত হয়। যেমন হাদিসে এসেছে- ‘অবশ্যই একজন মুসলমানের সদকা তার হায়াত বৃদ্ধি করে। অপমৃত্যু থেকে বাঁচায়। তার থেকে অহংকার ও অহমিকা দূর করে দেয়।’ (মুজামুল কাবির, হাদিস : ১৩৫০৮)

পরোপকারী হতে হলে অনেক ধন-সম্পদের মালিক হতে হবে- এমন ধারণা সঠিক নয়। ইচ্ছাটাই বড় সম্পদ। পথ চলতে গিয়ে কোথাও কষ্টদায়ক বস্তু নজরে এলে তা সরিয়ে ফেলাও পরোপকার। আসলে প্রত্যেক মানুষই তার নিজ নিজ অবস্থানে থেকে পরোপকারী হতে পারেন। এই উপকার হতে পারে ধর্মীয়, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়। হতে পারে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিকও। আমাদের চারপাশে কত রকম মানুষ বসবাস করেন। তাদের জীবনে রয়েছে নানা দুঃখ, সমস্যা। তাদের সেই দুঃখ লাঘবে, সমস্যা নিরসনে দুটো ভালো কথা বলা, পরামর্শ দেওয়া কিংবা একটু সঙ্গ দেওয়াও পরোপকার।

এই যে আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটা বিরাট অংশ নেশার জগতে ডুবে রয়েছে, তলিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের অতলগহ্বরে! তাদের সেই অন্ধকারের গলিপথ থেকে বের করে আলোর পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনাও তো পরোপকার। বরং এ কাজের জন্যই আমরা শ্রেষ্ঠ জাতিতে ভূষিত হয়েছি। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের নির্দেশ দান করবে এবং মন্দ কাজে বাধা প্রদান করবে।’ (সুরা আল ইমরান, আয়াত : ১১০)

অথচ আমাদের মাঝে এমন অনেকেই আছেন, যারা সোনার চামচ মুখে দিয়ে না জন্মালেও সোনার পালঙ্কে ঠিকই ঘুমান। আর তাদেরই বাসার সামনে কিংবা পথের পাশে কেউ কেউ একটি কম্বলের অভাবে নির্ঘুম রাত কাটান। বলতে দ্বিধা নেই, সেই ব্যক্তিদেরই আবার কোনো এক সামাজিক অনুষ্ঠানে মানবতা নিয়ে বড় বড় কথা বলতে দেখা যাবে। এই-ই হলো আমাদের সমাজের বাস্তবতা। ইসলামে এর কোনো স্থান নেই। কেউ পাবে কেউ পাবে না, ইসলামে তা হবে না। তাইতো যাদের নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তাদের ওপর জাকাত ফরজ করা হয়েছে। একইভাবে ঈদুল ফিতরেও ফিতরাকে ওয়াজিব করা হয়েছে। এই বিধান এজন্যই করা হয়েছে, যেন ধনীদের পাশাপাশি গরিব-দুঃখীরাও খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে। ঈদের দিনে তাদের মুখেও হাসি ফোটে। জাকাত ফিতরার পাশাপাশি ইসলামে কর্যে হাসানাহর ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমাদের চারপাশে অনেকেই আছেন, যারা তিন দিন উপোস থাকলেও কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতবেন না। তাদের কর্যে হাসানাহ বা উত্তম ঋণ দিয়ে সাহায্য করা মানে স্বয়ং আল্লাহকেই সাহায্য করা। ইরশাদ হয়েছে, ‘এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ১১)

পরোপকার মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব মনীষী স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছেন, তারা প্রত্যেকেই ছিলেন পরোপকারী। আমাদের প্রিয় নবীজি হজরত মুহম্মদ সা. ছিলেন পরোপকারীর মূর্তপ্রতীক। মানুষের উপকার করে তিনি আনন্দিত হতেন। অন্যের বেদনায় বৃথিত হতেন। কারো চোখে পানি দেখলে নিজের চোখকে ধরে রাখতে পারতেন না। রসুল (সা.) যেদিন সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হোন, সেদিন তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে খাদিজাতুল কুবরা রা. কে বললেন, ‘আমাকে কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দাও।’ তখন উম্মুল মুমিনিন খাদিজাতুল কুবরা রা. নবীজীকে বলেছিলেন, ‘আল্লাহ আপনাকে কখনোই বে-ইজ্জত করবেন না। কারণ আপনি আল্লাহর সৃষ্টির সেবা করেন। গরিব-দুঃখীদের জন্য কাজ করেন। অসহায়-এতিমের বোঝা লাঘব করেন। তাদের কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।’ (বোখারি শরিফ, হাদিস : ৪৫৭)

এখন আমাদের ভেবে দেখা উচিত যে, আমরা যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করি, তারা রসুল সা.-এর এই সুমহান আদর্শকে কতটুকু অনুসরণ করছি? নবীজির সুমহান আদর্শ পরোপকার থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই সমাজ নৈরাজ্যের আঘাতে জর্জরিত। মৃত্যু হচ্ছে আমাদের মানবিকতার। আমরা ভুলে গেছি আমরা মানুষ। মনুষ্যত্ব আমাদের বৈশিষ্ট্য। ভুলে গেছি বলেই সমাজ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এর থেকে উত্তরণের পথ একটাই। আর তা হচ্ছে ইসলামে পরিপূর্ণভাবে প্রবেশ করা। মানুষের উপকারে আত্মনিয়োগ করা। ইসলামের মূল মেনিংই হচ্ছে এই, তোমার কাছে দুটো জামা আছে অথচ তোমার অপর ভাইয়ের কাছে একটিও নেই। তাহলে তুমি তোমার একটি জামা সেই ভাইটিকে দিয়ে দাও। তুমি দুটি ঘরের মালিক। একটিতে তুমি থাকো অন্যটি অব্যবহৃত। অথচ তোমার আরেক ভাইয়ের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। ইসলাম বলে তোমার অব্যবহৃত

ঘরটি সেই ভাইটিকে দিয়ে দাও। এটাও ইবাদত। এমন ইবাদতেই আল্লাহ বেশি খুশি হন। তাই নবীজিও এমন ইবাদতে

বেশি বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। অথচ আমরা মনে করি, শুধু, নামাজ-রোজা, জিকির-অজিফাই বুঝি ইবাদত। একজন অনাথ শিশুর মুখে হাসি ফোটানোও যে বড় ইবাদত, তা আমরা কজন বিশ্বাস করি?

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

খতিব, কসবা মসজিদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়