কে এম ছালেহ আহমদ বিন জাহেরী
ধর্ম
মসজিদে গমনের আদব ও শিষ্টাচার

আল্লাহতায়ালার কাছে সর্বাধিক প্রিয় স্থান হলো মসজিদ (মুসলিম শরিফ ১৫৬০)। যেখানে কেবল তারই ইবাদত করতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এবং নিশ্চয়ই মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য। সুতরাং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে ডাকিও না’ (সুরা জিন ১৮)। মসজিদ মুসলমানদের ইবাদতের স্থান। ইবাদতের লক্ষ্যে মসজিদে প্রবেশের বিশেষ কিছু আদব ও শিষ্টাচার রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো।
১. ওজু করে মসজিদ অভিমুখে গমন করা : উত্তম স্বভাব হলো সুন্দরভাবে ওজু করে মসজিদে গমন করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বাড়ি থেকে পাক-পবিত্র হয়ে অর্থাৎ ওজু করে কোনো ফরজ সালাত আদায় করার জন্য হেঁটে আল্লাহর ঘরে অর্থাৎ মসজিদে যায় তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি পাপ ঝরে পড়ে এবং একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়’ (মুসলিম শরিফ ৬৬৬)।
২. মসজিদে গমনের পথে দোয়া পড়া : মসজিদে গমনের পথে রাসুল (সা.) দোয়া পড়তেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘অতঃপর রাসুল (সা.) সালাতের জন্য বের হলেন এবং তিনি এ দোয়াগুলো পড়লেন, হে আল্লাহ। আমার হৃদয়ে আলো (নুর) সৃষ্টি করে দাও, আমার দৃষ্টিশক্তিতে আলো সৃষ্টি করে দাও, আমার পেছন দিকে আলো সৃষ্টি করে দাও, আমার সামনের দিকে আলো সৃষ্টি করে দাও, আমার ওপর দিক থেকে আলো সৃষ্টি করে দাও এবং আমার নিচের দিক থেকেও আলো সৃষ্টি করে দাও। হে আল্লাহ। আমাকে নূর বা আলো দান করো’ (মুসলিম শরিফ ৭৬৩)।
৩. মসজিদে গমনকালে ধীর-স্থিরভাবে চলা : সালাতের জন্য মসজিদে গমনকালে তাড়াহুড়া না করে ধীর-স্থিরভাবে যাওয়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন তোমরা একামত শুনতে পাবে, তখন সালাতের দিকে চলে আসবে, তোমাদের উচিত স্থিরতা ও গাম্ভীর্য অবলম্বন করা। তাড়াহুড়া করবে না। ইমামের সঙ্গে যতটুকু পাও তা আদায় করবে, আর যা ছুটে যায় তা পূর্ণ করবে’- (বোখারি শরিফ ৬৩৬, মুসলিম ৬০৪)।
৪. রসুন-পেঁয়াজ বা অনুরূপ দুর্গন্ধযুক্ত কোনো কিছু খেয়ে মসজিদে না যাওয়া : কাঁচা পেঁয়াজ-রসুন বা এ জাতীয় দুর্গন্ধযুক্ত কোনো জিনিস খেয়ে মসজিদে যাওয়া নিষেধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পেঁয়াজ, রসুন বা পেঁয়াজ জাতীয় সবজি খাবে
সে যেন আমার মসজিদের কাছেও না আসে। কেননা মানুষ যেসব জিনিস দ্বারা
কষ্ট পায় ফেরেশতারাও সেসব জিনিস দ্বারা কষ্ট পায়’ (বোখারি শরিফ ৮৫৪, মুসলিম শরিফ ৫৬১)।
৫. মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দোয়া পাঠ করা : মসজিদে প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় দোয়া পড়া সুন্নাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমাদের কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করে, সে যেন এই দোয়া পড়ে ‘আল্লাহুম্মাফতাহলি আবওয়াবা রহমাতিক অর্থ- হে আল্লাহ। তুমি আমার ওপর তোমার রহমতের দরজাগুলো খুলে দাও’। আর যখন বের হয় তখন বলবে, আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা মিন ফাদলিকা অর্থ- ‘হে আল্লাহ। আমি তোমার কাছে তোমার অনুগ্রহ কামনা করছি” (মুসলিম শরিফ ৭১৩)।
৬। পোশাক ও সাজসজ্জা : মসজিদে সাধ্যমতো সুন্দর ও ভালো পোশাক পরিধান করে গমন করবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে আদম সন্তান। প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা সাজসজ্জা গ্রহণ করো। আর খাও, পান করো কিন্তু অপচয় করো না, নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ ৩১)।
৭। তাহিইয়াতুল মসজিদ সালাত আদায় করা : মসজিদে প্রবেশ করে বসার আগে দুই রাকয়াত সালাত আদায় করা সুন্নাত, যাকে তাহিইয়াতুল মসজিদ বলা হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে দুই রাকাত সালাত আদায় করার আগে বসবে না’- (বোখারি শরিফ ১১৬৩)।
৮। আজানের পরে মসজিদ থেকে বের না হওয়া : বিনা ওজরে আজানের পরে মসজিদ থেকে বের হওয়া ঠিক নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন মুয়াজ্জিন আজান দেয়, তখন কেউ যেন সালাত আদায় না করে মসজিদ থেকে বের না হয়’ (মিশকাত ১০৭৪)।
৯। মুসল্লির সামনে দিয়ে অতিক্রম না করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যদি মুসল্লির সামনে দিয়ে গমনকারী ব্যক্তির জানা থাকত যে, তার ওপর কী পাপের বোঝা চেপেছে, তবে ৪০ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকাকেও সে প্রাধান্য দিত। আবু নাছর বলেন, আমি জানি না তিনি ৪০ দিন, মাস নাকি বছর বলেছেন’ (বোখারি শরিফ ৫১০)।
অন্যত্র রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ সালাত আদায় করতে চাইলে যেন সুৎরা সামনে রেখে সালাত আদায় করে এবং এর নিকটবর্তী হয়। সে যেন তার সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে না দেয়। অতএব যদি কেউ সামনে দিয়ে অতিক্রম
করে, তাহলে সে যেন তার সঙ্গে লড়াই করে। কারণ সে একটা শয়তান’ (আবু দাউদ শরিফ ৬৯৪, ৬৯৫)।
১০। মসজিদে কণ্ঠস্বর উচ্চ না করা বা শোরগোল না করা : মসজিদ ইবাদতের স্থান। সেখানে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা ঠিক নয়, যাতে অন্যের ইবাদতে বিঘ্ন ঘটে। আবু সাইদ খুদরি (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে ইতিকাফকালে সাহাবিদের
উচ্চৈঃস্বরে কিরাত পড়তে শুনে পর্দা সরিয়ে বললেন, ‘জেনে রেখো। তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় রবের সঙ্গে গোপনে মুনাজাতে রত আছো। কাজেই তোমরা পরস্পরকে কষ্ট দিও না এবং পরস্পরের সামনে কিরাতে অথবা সালাতে আওয়াজ উঁচু করো না’ (আবু দাউদ শরিফ ১৩৩২)।
অতএব মসজিদে গমনের জন্য উপরোক্ত আদবগুলো পালন করা মুমিনের জন্য আবশ্যক। এর মাধ্যমে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি হাসিল হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে ওই কাজগুলো পালন করার তওফিক দান করুক। আমিন।
লেখক : শিক্ষার্থী, মৌকারা দারুচ্ছুন্নাত নেছারিয়া
কামিল মাদ্রাসা। নাঙ্গলকোট, কুমিল্লা
"




































