নাজমুন নাহার জেমি

  ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১

মতামত

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের গতি-প্রকৃতি

একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবীতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সন্ত্রাসবাদ। সন্ত্রাসবাদ বলতে সব বিধ্বংসী কার্যকলাপ, যা জনমনে ভীতির উদ্বেগ ঘটায়, ধর্মীয়, রাজনৈতিক অথবা নীতিগত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কৃত রুচিবিরুদ্ধ কাজ করে। বৈশ্বিক ‘সন্ত্রাসবাদ’। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, টেররিজম শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ফ্রেঞ্চ দার্শনিক ফ্রাঙ্কোস নোয়েল বাবেউফ, ১৭৯৪ সালে। এখন ‘সন্ত্রাসবাদ’কে সাধারণত সরকার বা প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু গোড়ায় ব্যাপারটি এমন ছিল না।

আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও বর্তমান রাজনীতি পরিপূরক দুটি বিষয়। বর্তমান বিশ্বরাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে এই সন্ত্রাসবাদকে কেন্দ্র করে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে দু-তিন দশক ধরে ইসলামপন্থি জঙ্গিগোষ্ঠী যে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমানে তার শাখা-প্রশাখা বিশ্বের সবখানে যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনি পূর্বোক্ত অঞ্চলগুলোতে তাদের সার্বিক কর্মকা- বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ারে হামলার ঘটনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আল-কায়েদা বিশ্ববাসীর নজরে আসে। ওই হামলার প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদার সমর্থক তালেবান রাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা করে তালেবানদের পতন ঘটালেও তাদের কোনোক্রমেই নির্মূল করা যায়নি। তাদের শক্তির কিছুটা হ্রাস হলেও দুই দশকের ব্যবধানে এ তালেবানরাই দেশটির অর্ধেকাংশের ডি-ফ্যাক্টো তালেবানি শাসন কায়েম করছে।

বিগত বছরগুলোতে আল-কায়েদা ও তালেবানের কিছুটা নিষ্ক্রিয়তার এ সময়টায় মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক ও সিরিয়াজুড়ে বাগদাদির নেতৃত্বে যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয় তা প্রথমে আল-কায়েদার অংশ থাকলেও পরে তারা আলাদা হয়ে ২০১৪ সালে সিরিয়ার রাকাকে কেন্দ্র করে ইসলামি স্টেট বা আইএস প্রতিষ্ঠা করে। তবে ২০১৯ সালে বাগদাদির মৃত্যু এবং আইএসের পতন হলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আইএস, তালিবান ও আল-কায়েদার বাইরে অবশ্যই আরও সন্ত্রাসী সংগঠন আছে, যেমন সোমালিয়ায় আল শাবাব, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, ফিলিপাইনের আবু সায়াফ, পাকিস্তানের হরকাতুল মুজাহিদীন, যারা ইসলামপন্থি উগ্রবাদে বিশ্বাসী; ২০১০ সালের পর এদের কোনো কোনো সংগঠন, যথাক্রমে আল-কায়েদা বা আইএসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় রাষ্ট্রবহির্ভূত বা নন-স্টেট সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে প্রধান সংগঠন হচ্ছে আইএস ও আল-কায়েদা।

আল-কায়েদা নিশ্চুপ থাকার অর্থ এই নয় যে, তারা দুর্বল বা পরাস্ত হয়েছে। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান এবং ক্ষমতা থেকে তালেবানের অপসারণের পর আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় কমা- ও প্রধান নেতারা হয় মারা যায় বা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অব্যাহত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে সংগঠনের দুর্বলতা প্রকাশিত হলেও সাংগঠনিকভাবে আল-কায়েদা সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয়নি। বরং

সংগঠনটি সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার কৌশল গ্রহণ করে।

নাইন-ইলেভেন থেকে ২০১১ সালে লাদেনের হত্যা পর্যন্ত আল-কায়েদা অনেকটা কোণঠাসা থাকার পর জাওয়াহিরির নেতৃত্বে আল-কায়েদা ইন আরব, আল-কায়েদা ইন আ্যারাবিয়ান পেনিনসুলা ও আল-কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্ট এ তিনটি শাখা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়াসহ মোট সাতটি শাখার মাধ্যমে তারা বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আল-কায়েদা পুনর্গঠনে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ এবং পরবর্তী নৈরাজ্যকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ইরাক আক্রমণ আল-কায়েদাকে নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।

তালেবানদের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগাযোগ কেবল ২০০১ সালের ঘটনা নয়। আল-কায়েদার প্রধান জাওয়াহিরি সব সময়ই আফগানিস্তানের তালেবান প্রধানকে ‘আমিরুল মোমেনিন’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছেন এবং তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা হ্রাস, হামিদ কারজাই এবং ক্ষমতাসীন আশরাফ গনি সরকারের অপশাসন ও দুর্নীতি এবং পরিস্থিতির রাজনৈতিক সমাধানের অনুপস্থিতির কারণে গত কয়েক বছরে তালেবান ক্রমাগতভাবে শক্তি সঞ্চয় করে আসছে। সম্প্রতি ১৯-২০ সাল জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের দর-কষাকষি, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তালেবানদের চুক্তি করা এবং ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ সালের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সব মার্কিন ও ন্যাটো সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া শুরু করা থেকে তাদের বর্তমান শক্তিমত্তা অনুধাবন করা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন যখন ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমস্ত আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানান, তখন থেকে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর ঘুম হারাম করে দিয়েছে তালেবান। গত দুই মাস ঝড়ের গতিতে দেশের অর্ধেকেরও বেশি জেলা দখলের পর এখন তালেবানরা রাজধানী কাবুলেও নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে।

পশ্চিমা মিডিয়ার একপেশে মনোভাবের কারণে অপরাপর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপগুলো যদিও সেভাবে আলোচিত হয় না, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে হিন্দুবাদী আরএসএসের

নেতৃত্বে মুসলিম নিধনযজ্ঞ, ইরানের সামরিক স্থাপনায় ইসরায়েলের নিয়মিত

বিরতিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের ভূমি দখলের নিরন্তর

প্রচেষ্টা এক-একটি সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী ৭০টির অধিক দেশে ৮০০টি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তা শুধু সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নয়, সন্ত্রাসবাদকে উদ্বুদ্ধ করে বা টিকিয়ে

রেখে নিজের স্বার্থ হাসিলের যে এক অবিরাম প্রচেষ্টা তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র যদি এ মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে না পারে তাহলে কোনো দিনই তথাকথিত বিশ্ব সন্ত্রাসবাদের অবলুপ্তি আশা করা যায় না। তখন, সন্ত্রাসবাদবিরোধীদের নতুন পথের সন্ধান করতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়
close