ফারহান ইশরাক

  ১২ জানুয়ারি, ২০২১

স্মরণ

বাংলার সূর্য সূর্যসেন

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে হাজারো নদীর পলিমাটিতে গড়ে ওঠা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। বাংলার প্রকৃতির মতোই এ দেশের মানুষ স্নিগ্ধ, সরল মনের অধিকারী। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই দেশটি বারবার বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে; শান্তিকামী বাংলার জনগণকে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন জাতি, শাসকগোষ্ঠীর করতলে পরাধীন থাকতে হয়েছে। কিন্তু বাঙালি এক স্বাধীনচেতা জাতির নাম। তারা কখনো ভিনদেশি শাসকের হাতে বন্দি হয়ে থাকতে চায়নি। তাই যখনই শাসনের নামে বাংলাকে কেউ শোষণ করতে চেয়েছে, তখনই সমবেত স্বরে তার প্রতিবাদ করেছে বাংলার আপামর জনগণ। বাংলা নামের এই অঞ্চলের স্বাধীনতা আদায়ের জন্য আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে বহু বছরের পথ। তবু লড়াকু এই জাতি কখনো পিছপা হয়নি; বাঙালি জাতির সূর্যসন্তানরা ইতিহাসের পাতায় লিখে গেছেন তাদের অমর বীরত্বগাথা।

পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পতনের পর প্রায় ২০০ বছর ধরে ব্রিটিশরা বাংলাদেশ ও সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন এবং শাসনের তুলনায় অধিক হারে শোষণ করেছে। ইংরেজদের এই দুঃশাসন উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করছিল, যার ফলে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠে। আন্দোলনে বাঙালিদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়বার মতো। ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই লড়াকু বাঙালি জাতি অন্যায়, দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় একসময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে চলে আসেন অকুতোভয় এক বাঙালি। তিনি হলেন মাস্টারদা সূর্যসেন; ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তি। তার পুরো নাম সূর্য কুমার সেন। পেশায় শিক্ষক, তাই সবাই তাকে মাস্টারদা নামেই বেশি ডাকতেন।

চট্টগ্রামের রাউজানের নোয়াপাড়া গ্রামে জন্ম সূর্যসেনের। ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ তিনি জন্মগ্রহণ করেন। খুব অল্প বয়সেই তিনি পিতা-মাতাকে হারান। মাস্টারদা সূর্যসেন বড় হন তার চাচা গৌরমনি সেনের কাছে। গ্রামের স্কুলেই তিনি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। এরপর ভর্তি হন ন্যাশনাল হাইস্কুলে। ১৯১২ সালে তিনি অ্যান্ট্রাস পাস করেন। এরপর এফএ পাস করেন চট্টগ্রাম কলেজ থেকে। তিনি একই কলেজে বিএ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলাকালীন তার সঙ্গে বই পাওয়ায় তাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ কারণে পরবর্তীতে তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯১৮ সালে এই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন।

১৯১৬ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সূর্যসেন সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত হন। ১৯১৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি চট্টগ্রামে এসে গোপনে বিপ্লবী দলে যোগ দেন। তৎকালীন বাংলাদেশ অঞ্চলে সক্রিয় দুটি বিপ্লবী দলের একটি ছিল যুগান্তর ও অপরটি অনুশীলন। বিপ্লবীদের আদর্শ তাকে উজ্জীবিত করত। কিন্তু সূর্যসেন কিছুটা স্বাতন্ত্র্য আনতে চেয়েছিলেন তার দলে। তাই যুগান্তরের অনুসারী হলেও তিনি দল চালাতেন নিজের মতো করে। তিনি যুগান্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় মাস্টারদা সূর্যসেন বেশ কিছু আন্দোলন ও বিপ্লবে নেতৃত্ব দেন।

বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সেসময় তিনি বিপ্লবীদের অনুরোধ করেছিলেন কিছুদিনের জন্য তাদের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে। এর ফলে সূর্যসেন ও তার বাহিনীর অন্যদের কাজের পরিমাণ কমে যায়। তবে তাদের আদর্শিক প্রচার ও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল অটুট। ১৯২২ সালে মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে বিপ্লবীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেন। ১৯২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম টাইগার পাস মোড়ে রেল কর্মচারীদের বেতন ছিনতাইকালে পুলিশের সঙ্গে সূর্যসেনের বিপ্লবী বাহিনীর খন্ডযুদ্ধ সংঘটিত হয়। একে ‘নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ’ নামে অভিহিত করা হয়। এ ঘটনা মাস্টারদা সূর্যসেনকে সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত করে। বিপ্লবে অংশ নেওয়ায় সূর্যসেন ও তার সহযোদ্ধাদের গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ১৯২৮ সালে সূর্যসেন কারাগার থেকে মুক্তি পান।

কারামুক্তির পর সূর্যসেন পুনরায় বিপ্লবীদের সংগঠিত করা শুরু করেন। এ সময়ে বেশ কয়েকজন নারী বিপ্লবীও তাদের সঙ্গে যোগ দেন, যাদের মধ্যে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার অন্যতম। এ সময় তারা বড় ধরনের বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এর অংশ হিসেবে একদিকে চলছিল দল গঠন এবং অপরদিকে চলছিল অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরির কাজ। ব্যাপক প্রস্তুতির পর ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে বিপ্লবের সূচনা হয়। সে রাতেই বিপ্লবীদের একটি দল রেললাইনের ফিশপ্লেট খুলে নেয়, যার ফলে চট্টগ্রাম জেলা সমগ্র বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এদিকে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালান। কিছু বিপ্লবী রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করেন। পুরো চট্টগ্রাম বিপ্লবীদের নিয়ন্ত্রণে এলে পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপ্লবীরা দামপাড়ায় পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করেন। এরপর চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন মাঠে সব বিপ্লবী সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন, এ সময় মাস্টারদা সূর্যসেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সূর্যসেন সেখানে অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।

এই বিপ্লবের ফলে চারদিনের জন্য ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু এরই মধ্যে বিপ্লবীদের খাদ্যসংকট দেখা দেয়। আবার সূর্যসেনসহ ছয়জন শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার ৫০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে (চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পাহাড়) অবস্থান করছিলেন, সেসময় সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাদের আক্রমণ করে। দুই ঘণ্টার প্রচন্ড যুদ্ধে ইংরেজ সেনাবাহিনীর ৭০ থেকে ১০০ জন নিহত হয়। সঙ্গে বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন সদস্য শহীদ হন।

এই যুদ্ধের পর বিপ্লবীদের ধরার জন্য সরকার চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বিপ্লবীরা বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপন করেন। ব্রিটিশ সরকার সূর্যসেনকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে। পুলিশ নিয়মিত তল্লাশি চালাতে থাকে। অবশেষে ১৯৩৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার হন সূর্যসেন। সেখানে কল্পনা দত্তসহ আরো কয়েকজন বিপ্লবী অবস্থান করছিলেন। গ্রেপ্তারের পর সূর্যসেনকে কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে রাখা হয়। কারাভ্যন্তরে প্রতিনিয়ত নির্যাতন করা হতো তাকে। অবশেষে ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে নির্মম নির্যাতনের পর সূর্যসেন ও তার সহযোদ্ধা তারকেশ্বর দস্তিদারের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

মাস্টারদা সূর্যসেন ছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও জালালাবাদের যুদ্ধকে তার বিপ্লবী জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু তার চেয়েও বড় সাফল্য হলো তিনি দেশবাসীর মনে সাহস জাগিয়ে তুলেছেন, মানুষকে স্বাধীনতার স্বপ্নে উজ্জীবিত করেছেন। তার মতো সূর্যসন্তানের জন্ম হয়েছিল বলেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন পেয়েছিল নতুন মাত্রা। বাংলার ইতিহাসকে সূর্যসেন রাঙিয়েছেন আপন রঙে। ব্রিটিশদের শোষণ থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করতে নিজের জীবন বিপন্ন করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। তাই মাস্টারদা সূর্যসেন জাতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম, আজও তিনি অমর হয়ে রয়েছেন কোটি কোটি বাঙালির অন্তরে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ব্যাংকিং অ্যান্ড

ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়