ব্রেকিং নিউজ

মতামত

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে স্বস্তিতে নেই ক্রেতা

প্রকাশ : ২৭ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

সাহাদাৎ রানা

করোনার কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। অসংখ্য মানুষ কাজ হারিয়ে হয়ে গেছেন বেকার। কমে গেছে আয়ের পরিমাণও। এসব কারণে সাধারণ মানুষ রয়েছে চরম অস্বস্তিতে। অস্বস্তি রয়েছে আরো বেশ কিছু জায়গায়। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সবাইকে ভাবাচ্ছে এবং ভোগাচ্ছে। এমনিতেই সবসময় সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সমস্যায় থাকেন। করোনার মতো এমন কঠিন সময়ে এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বমূল্য সাধারণ মানুষকে ফেলেছে কঠিন সংকটে। অথচ বর্তমানে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আজ একটির মূল্যবৃদ্ধি পায় তো কাল আরেকটির। আবার আজ এক দামে কোনো একটি পণ্য কিনে নিয়ে গেলে পরদিন দেখা যায় সেই পণ্যের দাম কেজিতে বেড়ে গেছে কয়েক টাকা। এ বিষয়ে দোকানিদের সহজ ও কমন যুক্তিÑ চাহিদার চেয়ে পণ্যের জোগান কম। আবহাওয়া খারাপ, এমন যুক্তিও মাঝে মাঝে দেখানো হয়। শুধু তাই নয়, পাইকারি বাজারের সঙ্গে নেই খুচরা বাজারের মূল্যের সামঞ্জস্য। অথচ দুঃখের বিষয় বাজার থেকে সাধারণ ক্রেতা যে দামে পণ্য কিনছেন, উৎপাদক সেই দাম কল্পনাও করতে পারেন না। এর সুফল নিচ্ছেন এক শ্রেণির প্রতারক মধ্যস্বত্বভোগীরা। যারা সাধারণ ক্রেতাদের জিম্মি করছেন, জিম্মি করছে কৃষকদেরও। কিন্তু যারা নিজেদের সর্বোচ্চ শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করছেন, সেই কৃষক বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকে। এ ক্ষেত্রে শুধু লাভবান হচ্ছেন একশ্রেণির ব্যবসায়ী। আর ঠকছেন কৃষক ও সাধারণ ক্রেতা। এমন ঘটনা আমাদের জন্য অবশ্য নতুন নয়। কয়েক মাস আগে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি ছিল সবার কাছে আলোচিত। আর এখন সেই জায়গা নিয়েছে আলু।

করোনার সময়ে শুধু আলু নয়, প্রায় প্রতিদিনই মানুষের দৈনন্দিন চাহিদার প্রায় সব পণ্যের দামই বাড়ছে। কখনো কখনো তা হয়ে যাচ্ছে লাগামছাড়া। গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারি বাজারে সব ধরনের সবজি কেজিতে গড়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারেও। সবজির বাইরে আমাদের প্রধান খাদ্য চাল। সেই চালের দামও বাড়ছে কোনো কারণ ছাড়াই। এ ছাড়া নাভিশ^াস উঠেছে ভোজ্যতেল, মসলা, ডালসহ সবকিছুরই দাম বৃদ্ধিতে। এখন প্রায় প্রতি সপ্তাহের নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি যেন সবার কাছে সাধারণ ঘটনা। মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ ঘটনা হলেও বিপরীতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। বর্তমান সরকারের উন্নয়নমুখী নানা উদ্যোগের ফলে আমাদের জীবনযাত্রার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে ব্যয়ক্ষমতাও। এটা হয়েছে সময়ের চাহিদার কারণে। কিন্তু সেই চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয় হয়নি সেভাবে। এর পেছনে রয়েছে অনেকগুলো কারণ। প্রধান কারণ হলোÑ একশ্রেণির আমদানিকারক ও পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যারা মূলত তাদের স্বার্থের জন্য বাজার কারসাজি করছেন। জিম্মি করছেন ক্রেতাকে। তবে এ ক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর দায় এড়াতে পারে না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এসব সিন্ডিকেট বন্ধ করা। কিন্তু মন্ত্রণালয় কতটুকু করতে পারছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রশ্ন উঠছে এ কারণে যেকোনো একটি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পর সেই পণ্যের দাম আর কমে না। বরং সেখান থেকে ধীরে ধীরে আরো বৃদ্ধি পায়।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নি¤œবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যাদের পক্ষে অধিক মূল্য দিয়ে পণ্য কেনা কষ্টসাধ্য। মাসে নির্দিষ্ট যে আয় হয় তা দিয়ে নিত্যদিনের পণ্য কেনা তাদের জন্য রীতিমতো কষ্টকর। বিশেষ করে করোনার এ সময়ে যা হয়ে দাঁড়িয়েছে আরো কষ্টকর। কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে। বাস্তবতা হলো সরকারের ইতিবাচক কাজে মানুষের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস রয়েছে, তেমনি নিত্যপণ্যের বাজারের নিয়ন্ত্রণহীনতা মানুষকে ফেলেছে চরম অস্বস্তিতে। এখন এই অস্বস্তি সরকারকে দূর করতে হবে। আর সেই স্বস্তি আসতে পারে শুধু বাজারে সরকারের ইতিবাচক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই। অবশ্য এর জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। যারা বাজার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির এই ঊর্ধ্বগতি রোধে এখন বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সবার আগে প্রয়োজন সরকারের সদিচ্ছার বাস্তবায়ন। এরপর যে জিনিসটি প্রয়োজন তা হলো- পণ্যসামগ্রীর চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ পণ্যের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কখনো বাস্তবিক লক্ষ্য পূরণ হবে না। এরজন্য দেশের সর্বত্র কৃষিপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি আমদানি ও রপ্তানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যবস্থার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে হবে।

এ ছাড়া পণ্যবাজারের ওপর সরকারের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। যাতে অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছামতো কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে দাম বৃদ্ধি করতে না পারে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি বড় কারণ। বিভিন্ন এলাকা থেকে পণ্যদ্রব্য ঢাকা বা অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার সময় চাঁদাবাজির ঘটনা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব অনিয়মের লাগাম টেনে ধরতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। উৎপাদন উপকরণগুলোর সরবরাহ, যতটা সম্ভব প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ছেড়ে দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ ক্ষেত্রে সর্বত্রই প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা ছাড়া বাজার ব্যবস্থার সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন উৎপাদক কৃষকশ্রেণি। যাদের কেন্দ্র করে কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। দুঃখের বিষয় এসব ক্ষেত্রে সেই উৎপাদক শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়। কিন্তু কোনোভাবেই কৃষকদের বঞ্চিত করা যাবে না। কারণ তারাই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে রয়েছে ব্যবসায়ী। সহজ কথায় ব্যবসায়ী ও উৎপাদক শ্রেণি হচ্ছে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। এদের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় প্রয়োজন। বিশেষ করে উৎপাদক শ্রেণির মধ্যে আস্তা ফিরিয়ে আনা সবার আগে জরুরি। বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে, তারা যে পণ্য উৎপাদন করবেন তার সঠিক ও ন্যায্যমূল্য পাবেন। কোনো সিন্ডিকেটের কাছে তাদের প্রাপ্য মূল্য চলে যাবে না। থাকবেন না জিম্মি হয়ে। আরো একটি বিষয় খুবই জরুরি। সেটা হলো ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান। যা আমরা শুধু রমজান মাসেই বেশি দেখি। বাস্তবতা হলো ভেজাল খাদ্যের বিষয়ে যেমন অভিযান প্রয়োজন, তেমনি অতিরিক্ত মজুদ ও ইচ্ছামতো মূল্যবৃদ্ধি রোধেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি ঠিকমতো বাজার মনিটরিং করা হয়, তবে অনেকাংশে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

আমাদের দেশে আমদানির ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট একটি কমন বিষয়। অধিকাংশ সময়ে আমাদের দেশে মূলত রাজনৈতিক কারণে আমদানির অনুমতি মেলে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক ব্যবসায়ীদের সংশ্লিষ্টতার কারণে সিন্ডিকেটগুলো কাউকে তোয়াক্কা করছে না। তাদের অতি মুনাফালোভী মানসিকতার কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ওই সিন্ডিকেটগুলো ভাঙার ব্যবস্থা করাই হচ্ছে সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। কারণ এটা পরিষ্কার আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। তাই এসব অসাধু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে অভিযান পরিচালনা না করে সারা বছরই অভিযান পরিচালনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবেই হয়তো অসাধু ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্তি পাবে সাধারণ মানুষ।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

"