মতামত

শারদীয় দুর্গাপূজা ও সম্প্রীতির বন্ধন

প্রকাশ : ২৬ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০

ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ

যতই আমাদের মধ্যে দেবী ‘মা’র মাতৃভক্তির বিকাশ হবে, ততই আমরা পবিত্র হব আর উন্নতির দিকে এগিয়ে যাব। এতে করে নারীরা যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান পাবেন। নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন রুখে দিয়ে মাতৃরূপে ভক্তি ও সম্মানের দৃষ্টিতে সাম্যের পৃথিবী গড়তে হবে। তাহলেই কেবল সমাজ সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে। দেবী দুর্গা মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করে শুভ ও ন্যায়ের উদাত্ত আহ্বান জানান সবাইকে।

শারদীয় দুর্গাপূজার প্রধান আবেদন হলো ‘দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন’ অর্থাৎ সব অশুভ শক্তির নির্মূল করার জন্যই পৃথিবীতে প্রতি বছর দুবার দেবী দুর্গার আগমন প্রাচীনকাল থেকে হয়ে আসছে। বছরের চৈত্র মাসে বসন্তকালে বাসন্তী দেবী নামে পৃথিবীতে আবির্ভূত হন, যা হিন্দু সম্প্রদায় বাসন্তী পূজা হিসেবে আরাধনা করে থাকে। কিন্তু বাসন্তী পূজার ব্যাপকতা শরৎকালের আশ্বিন-কার্তিক মাসে অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজার মতো আবেদন ও জাঁকজমকপূর্ণ হয় না। হিন্দু পুরাণে আছে রামচন্দ্র রাক্ষস রাজা রাবণকে বধ করার জন্য আশ্বিন মাসে মা দুর্গার আরাধনা করেছিলেন তখন থেকেই দুর্গাপূজার প্রচলন শুরু হয়। স্বাধীনতার পর সারা দেশের পূজার সংখ্যা ছিল ৪ থেকে ৫ হাজারের মতো। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূজার সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

বর্তমান সরকার ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসার পর স্বাধীনতার অন্যতম মূল্যবোধ ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করে দেশ পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসতে পারল না। তারপর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে বিজয়ী হওয়ার পর থেকে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার পরিচালনার মাধ্যমে স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করে দেশ পরিচালনায় এক যুগান্তকারী উন্নয়নের ভূমিকা রাখছে বলেই সব ধর্মের মানুষ নির্বিঘেœ ও স্বাধীনভাবে যার যার ধর্ম পালন করে যাচ্ছে, আর তারই সঙ্গে বেড়ে চলছে পূজার সংখ্যা। আরেকটি বড় কারণ হলো ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র আমাদের সবার’ এটাকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধারণ করে আজ জনপ্রিয় সেøাগান হলো ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই সেøাগান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিশ্বাসের সঙ্গে বলেন বলেই আজ এ সেøাগান সর্বমহল এমনকি রাজনীতিবিদদের মধ্যেও জনপ্রিয়তা লাভ করছে।

রামচন্দ্র যে দুর্গাদেবীর পূজা করেছিলেন তার মর্মার্থটি সর্বাংশে ভুলে গিয়ে আমরা এর খোলশটি নিয়েই মাতামাতি করছি। শক্তি প্রতীক রূপেই দেবী দুর্গার কল্পনা করা হয়েছে। তাই দুর্গাপূজা মানেই হচ্ছে নিজের ভেতর সেই শক্তির সঞ্চার ঘটানো, যে শক্তি দিয়ে সব অপশক্তিতে প্রতিহত ও নির্মূল করা যায়। ত্রেতাযুগের রামচন্দ্র যেমন ‘শস্য’ তথা ধন উৎপাদকদের সংগ্রামী নেতা রূপে সীতা অপহরণকারী (অর্থাৎ উৎপাদক মেহনতী মানুষদের উৎপাদিত সামগ্রীর লুণ্ঠনকারী) রাবণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য দুর্গাপূজা করেছিলেন (অর্থাৎ আত্মশক্তি লাভের সাধনা করেছিলেন), কলিযুগ বা বর্তমান যুগের প্রতিটি শোষিত-বঞ্চিত মানুষকেও তো তা-ই করতে হবে। কারণ এ যুগেও তো রাবণরা প্রবল প্রতাপেই বিদ্যমান। এ যুগের রাবণদের সম্পর্কেই নজরুল বলেছেনÑ ‘দশমুখো ঐ ধনিক রাবণ, দশদিকে আছে মেলিয়া মুখ, বিশ হাতে করে লুণ্ঠন তবু, ভরে নাকো ওর ক্ষুধিত বুক।’ একালের এই রাবণদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দায়িত্ব যে বর্তেছে আমাদেরই ওপর, সে কথা যেন আমরা ভুলে বসে আছি। অথচ প্রতি বছরই সাড়ম্বরে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। কিন্তু সে পূজায় প্রাণ প্রতিষ্ঠায় ও আত্মশক্তির জাগরণ ঘটানোয় পূজারিদের কোনো গরজ নেই। এই অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিকে ধিক্কার জানিয়েই নজরুল একে ‘পূজা-অভিনয়’ আখ্যা দেন।

পূজাকে কেন্দ্র করে যে উৎসব তা-ও উৎসবের মূলমর্মকে পরিত্যাগ করে হয়ে ওঠে বহিরঙ্গসর্বস্ব। কোথাও কোথাও তা নানা ক্লেদাক্ততা ও আবিলতায় একান্ত পঙ্কিলও হয়ে ওঠে। অবশ্য এ রকমটি যে কেবল একালেই ঘটছে, তা নয়। একালে বরং দুর্গোৎসবের অনেক বেশি গণায়ন ঘটেছে এবং তার ফলে ক্লেদাক্ততা ও আবিলতাও অনেক পরিমাণে প্রতিরুদ্ধ হয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে রাজশাহীর তাহিরপুরের রাজা কংস নারায়ণ বহু লাখ টাকা ব্যয় করে শারদীয় দুর্গাপূজার সাড়ম্বর অনুষ্ঠান করেন। সেই থেকেই এই দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দুর বিশেষ ধর্মীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়ে যায়। তবে রাজা কংস নারায়ণ কেবল যে একটি ধর্মীয় ঐতিহ্যই সৃষ্টি করেছিলেন তেমন কথাও বলা যায় না। রাজার আসল উদ্দেশ্য ছিল ঐশ্বর্য প্রদর্শন। অর্থাৎ ঐশ্বর্যের দাপট দেখানো। সেই থেকে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঐশ্বর্যশালীদের দাপট দেখানোর একটি অপ-ঐতিহ্যও সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। সেই ঐতিহ্য অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও তার উত্তরসূরিরা বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই বহন করে যেতে থাকেন। তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করে যে নব্যধনী বা ‘হঠাৎ নবাবদের’ উদ্ভব ঘটে, তারা সে ঐতিহ্যকে আরো বেগবান করে ফেলেন। অশ্লীল কদর্য নৃত্যগীত, মদ্যপান ও বেশ্যাগমন তাদের দুর্গাপূজার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে পড়ে। ওইসব উপসর্গ যুক্ত হওয়ার পর পূজা ও উৎসব দুই-ই চরিত্রভ্রষ্ট হয়ে যায়। এই চরিত্রভ্রষ্টতা দূর করা ও পূজা অভিনয়কে অভিনয় মুক্ত করার জন্যই সচেতন জনগণের প্রতি নজরুলের আহ্বান। সে আহ্বানে জনগণকে সাড়া দিতেই হবে। অর্থাৎ একালের দুর্গাপূজা ও দুর্গোৎসবের মূল লক্ষ্য হতে হবে ‘দশমুখো ঐ ধনিক রাবণদের’ উৎখাত করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তি আহরণ করা। জনগণ সেই শক্তি প্রয়োগ করেই যে ওই রাবণদের ‘বিশ হাতে লুণ্ঠন’ করার প্রক্রিয়ার অবসান ঘটাবে নজরুল সে ব্যাপারেও দৃঢ়প্রত্যয় ও সংগত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। পৌরাণিক অনুষঙ্গ প্রয়োগ করেই তিনি জানান যে : ধন-উৎপাদক কৃষক-শ্রমিকদের মধ্য থেকেই রামচন্দ্রের মতো নতুন নেতৃত্বের উদ্ভব ঘটবে এবং সেই নেতৃত্বই এ যুগের রাবণদের তথা শোষক-বঞ্চকদের উৎখাত ঘটাবে।

ধর্ম উৎসব মানুষে মানুষে প্রীতি, প্রেম, সহিষ্ণুতা, ঐক্য ও শান্তির ডাক দিয়ে যায়। তা সত্ত্বেও হানাহানি, লোভ-লালসা, অনৈক্য, অসহিষ্ণুতা ও নিষ্ক্রিয়তা আজ চারপাশে বিরাজমান। তাই সত্যের রক্ষাকর্তা ও দুষ্টের বিনাশকারিণী হিসেবে ‘মা’ আসেন শান্তির বার্তা নিয়ে। এ পূজা আমাদের সমগ্র জাতিসত্তায় মনুষ্যত্বের জাগরণ, মানবকল্যাণ তথা বিশ্ব কল্যাণের পূজা। বর্তমান বাস্তবতায় যে কল্যাণের নামে অকল্যাণ, ধর্মের নামে অধর্ম, স্বার্থপরতা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, পঙ্কিলতা তা দূর করে শান্তি স্থাপন সবচেয়ে বেশি দরকার। শুধু মুখে নয়, কর্মের মাধ্যমে সত্যিকারের প্রেম, ভালোবাসা, মানবতা, ভক্তি, সম্প্রীতি বেশি প্রয়োজন। যতই আমাদের মধ্যে দেবী ‘মা’র মাতৃভক্তির বিকাশ হবে; ততই আমরা পবিত্র হব আর উন্নতির দিকে এগিয়ে যাব। এতে করে নারীরা যথার্থ মর্যাদা ও সম্মান পাবেন। নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন রুখে দিয়ে মাতৃরূপে ভক্তি ও সম্মানের দৃষ্টিতে সাম্যের পৃথিবী গড়তে হবে। তাহলেই কেবল সমাজ সমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যাবে। দেবী দুর্গা মানুষের চিত্ত থেকে যাবতীয় দীনতা ও কলুষতা দূরীভূত করে শুভ ও ন্যায়ের উদাত্ত আহ্বান জানান সবাইকে। সত্যি বলতে, বর্তমান সময়ে পৃথিবীতে করোনা নামক মহামারি পুরো বিশ্বকে কিছুটা হলেও থামিয়ে দিয়েছে। মা দুর্গার আগমনে মহামারিসহ সব ধরনের অনাচার ধুয়ে-মুছে যাকÑ এটাই কামনা। মায়ের আগমনের মধ্য দিয়ে আমাদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন আরো দৃঢ় হোক এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট থাকুক এবং শুভ শক্তির জয় হোক।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

[email protected]

 

"