পরিবেশ
দুর্যোগ প্রশমনে বাংলাদেশ হোক উদাহরণ
সাহাদাৎ রানা

আজ আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও বাংলাদেশ দিবসটি পালন করছে। মূলত দুর্যোগ প্রশমন বলতে দুর্যোগ দমন বা নিবারণ করাকে বোঝায়। কিছু দুর্যোগ রয়েছে যেগুলো প্রাকৃতিক, যেখানে মানুষের কোনো কিছু করার থাকে না। কিন্তু প্রাকৃতিক হলেও এসব দুর্যোগ হ্রাসে বা প্রশমনে মানুষের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সাধারণত ভূমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি করে। এতে সেই দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিমন্ডলে ব্যাপক প্রভাব পড়ে। বাস্তবতা হলো কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের কোনো হাত থাকে না। তবে এটাও সত্য বর্তমানে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা রয়েছে। যে কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পরিমাণ বাড়ছে। সহজ কথায় এটা আজ প্রমাণিত হয়েছে বিভিন্ন দুর্যোগের বিষয়ে মানুষ সচেতন হলে এর ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ অনেকাংশে কম হয়। তাই এ বিষয়ে আরো সচেতন হতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে জলাবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে।
কিন্তু পুরো বিশ্ব এখন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সম্মুখীন। বিশেষ করে এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মৃত্যুর আগে আশঙ্কা করেছিলেন, এই ধরিত্রীতে মানুষের বসবাসের খুব বেশি হলে আর কয়েক শ বছর। হকিং যে কারণে এমন আশঙ্কা করেছেন তার মূলে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণ। আর এমন বিরূপ প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়ছে সারা বিশ্বে। বর্তমানে আমরা দেখছি, তুষারে তুষারে ঢেকে যাচ্ছে ইউরোপ। হিমঝড় ও তীব্র তুষারপাতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক হারে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। আবার বিপরীতে অনেক দেশে উচ্চ তাপমাত্রার কবলে পড়ে মানুষ দিশাহারা হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো দেশে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়ানক দাবানল। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্যের। আর এ কারণে চিরচেনা বসবাসযোগ্য পৃথিবী নামক এই গ্রহটি তার প্রাণধারণের ক্ষমতা ক্রমেই হারাতে বসেছে। মূলত ক্রমাগত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক আবহাওয়ায় এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে।
এ পরিবর্তনের বাইরে নয় বাংলাদেশ। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে অনেক বেশি সচেতন বাংলাদেশ। যা বিশে^ প্রশংসিত। তবে এখনো অনেক ক্ষেত্রে আমাদের অনেক বেশি কাজ করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বেশির ভাগই দরিদ্র। আর এই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে জার্মানভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জার্মানি ওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০১৮’-এর প্রতিবেদনে। এ ছাড়া অ্যাসেসমেন্ট অব সি লেভেল রাইজ অন বাংলাদেশ কোস্ট থ্রু ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস অনুযায়ী বাংলাদেশের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতি বছর ২১ মিলিমিটার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূল এবং নিম্নাঞ্চলসহ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যেতে পারে। এতে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৯ জেলার ৭০ উপজেলার প্রায় চার কোটি লোক প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বড় উদাহরণ আমরা প্রায় একযুগ আগে কিছুটা প্রত্যক্ষ করেছি। বিশেষ করে ২০০৭ সালে সিডরের আঘাতে বাংলাদেশের কয়েক লাখ মানুষের ঘরবাড়ি নষ্ট হয়। শঙ্কার খবর হলো, ২০৫০ সালের মধ্যে এ ধরনের ঘূর্ণিঝড় আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উপকূল অঞ্চলে আঘাত হানার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে প্রায় ১ কোটি মানুষের ঘরবাড়ি ডুবে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এসব পরিসংখ্যানের বাস্তবতাকে আমলে রেখেই নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। তবে এটাও সত্য আগের তুলনায় দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এরই মধ্যে যথেষ্ট এগিয়েছে। বিশেষ করে গত এক দশকে বিশেষত নীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেওয়া হয়েছে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের সামগ্রিক সাফল্য যেমন আছে; তেমনি এ ক্ষেত্রে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জও। এর মধ্যে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি আর অর্থায়ন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যে কারণগুলো আমাদের সামনে উপস্থিত তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। বিশ^ব্যাপী শিল্পায়নের জন্য কার্বন নিঃসরণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এজন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ হচ্ছে সবুজের বৃদ্ধি। অর্থাৎ সারা দেশে ব্যাপক বনায়ন। কেবল কার্বন নিঃসরণ হ্রাসই নয়, প্রাকৃতিক দুযোগ মোকাবিলায়ও এই বনায়নের কার্যকর ভূমিকা অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে কেবল সরকার নয়, এগিয়ে আসতে হবে শিল্পপতিদেরও। কেননা, শিল্প-কারখানা ব্যাপকভাবে পরিবেশকে দূষিত করছে। প্রতিটি শিল্প-কারখানায় কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ হ্রাসের পাশাপাশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিল্প-কারখানার মালিকদের এসব বন্ধ করার জন্য বাধ্য করতে হবে। সবুজ ও পরিবেশবান্ধব কারখানা তৈরি, ডেলাইট ডেভিং, উপকরণের পুনর্ব্যবহার এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সর্বোপরি সবুজের বিকল্প নেই। কেননা, ব্যাপক বনায়ন পারে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে আমাদের অনেকটা রক্ষা করতে। তাই ঘূর্ণিঝড়সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক বনায়ন গড়ে তোলার বিকল্প নেই। পাশাপাশি সমুদ্রের লবণাক্ত পানি যাতে কুল ছাপিয়ে মিঠাপানিতে মিশতে না পারে, সেজন্য প্রয়োজন অনুযায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পানিদূষণ যাতে প্রতিরোধ করার পাশাপাশি এর নিয়ন্ত্রণ এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনার জন্য সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে কৃষিজীবীরা কীভাবে খাপখাওয়াতে পারেন; সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন কৃষকরা। তাই তাদের বিষয়ে বেশি করে ভাবতে হবে। কারণ কৃষকরাই দেশের প্রাণ। তারা সঠিকভাবে তাদের কাজ করতে পারলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারবে দেশ।
ঝড়ের মৌসুমে মাঝে মাঝে দেশের বিভিন্ন জায়গায় হঠাৎ আঘাত হানছে ঘূর্ণিঝড়। এসব ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া খুবই জরুরি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ যে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর থেকে পুরোপুরি রক্ষার উপায় না থাকলেও প্রতিরোধ করে ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব। কেননা, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমিকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এজন্য এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের টেকসই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি সবার সমিম্মিত প্রয়াস বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, সবার দায়িত্ব রয়েছে। বিশেষ করে সবাইকে বেশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ আন্দোলন বিষয়ে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সোচ্চার। এটা আমাদের আশাবাদী করছে। আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি এটা আমাদের জন্য একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এটির মোকাবিলা আমরা এককভাবে করতে পারব না। করতে হবে আন্তর্জাতিকভাবেই। তাই আর পেছনে না তাকিয়ে দ্রুত আরো কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে আমাদের। তবে আমরা নিরাপদ থাকব। নিরাপদ থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। ভালো থাকবে বিশ্ব, ভালো থাকবে বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষ। গত বছর জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপখাওয়ানোর ব্যাপারে পুরো বিশ্বের জন্য সেরা শিক্ষক হচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি যথার্থ বলেছেন। কিন্তু এককথায় আনন্দিত হয়ে আমাদের বসে থাকলে হবে না। বান কি মুনের কথা অনুযায়ী বিশ্বের কাছে সেরা শিক্ষক হয়ে থাকতে হলে আরো কাজ করতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণের মতো কাজ করে যেতে হবে বাংলাদেশকে। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবসে সবাইকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। কেননা, এ ক্ষেত্রে সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
"




































