আলোচনা

পরাশক্তির পথে তুরস্ক

মো. রাশেদ আহম্মদ

প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

পৃথিবীর মানবসভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য স্বাধীনতা সংগ্রামে অটোমান সাম্রাজ্যের সুদীর্ঘ ৬০০ বছরের অধিক সোনালি শাসনকাল এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে নির্মম পরাজয়ের গ্লানির প্রত্যক্ষ সাক্ষী তুরস্ক। এশিয়া-ইউরোপের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি দেশটি সময়ের পরিক্রমায় বর্তমান আন্তর্জাতিক রাজনীতি অঙ্গনে আবার নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটাতে শুরু করেছে। এই দীর্ঘ পথচলা তুরস্কের জন্য কখনোই সহজ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির (ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ইতালি) কাছে শোচনীয় পরাজয়ের ফলে মূলত দীর্ঘকালের জন্য আন্তর্জাতিক রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ে তুরস্ক। শুধু তা-ই নয়, ওসমানী খেলাফতের সোনালি অধ্যায়ের (১২৯৯-১৯২২) সূর্যাস্ত ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ফলে বৃহত্তর অটোমান সাম্রাজ্য থেকে বের হয়ে নতুন করে স্বাধীনতা লাভ করে ৪০টি রাষ্ট্র। ব্যাপকভাবে পরিবর্তন ঘটে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চেও। তুরস্ককে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিকভাবে যেন শতাব্দী বছরে বিশে^র বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সেই লক্ষ্যে মিত্রশক্তিরা অন্যায়ভাবে অনেকটা জোর করে ১৯২৩ সালে সুইজারল্যান্ডে লুজান চুক্তি সম্পাদিত করে। এই চুক্তির পাঁচটি ধারা কার্যত তুরস্ককে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পঙ্গু করে ফেলে। যার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ফ্রান্স ও ব্রিটেন। লুজান চুক্তির উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো ছিল খেলাফত বিভাজন ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আরবি-ফারসি ভাষা নিষিদ্ধকরণ ও লাতিন ভাষা প্রচলন, নিজ দেশে জ¦ালানি উত্তোলন নিষিদ্ধকরণ ও বাইরেও খনিজসম্পদের বাণিজ্যিক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। বসফরাস প্রণালিতে বিধিনিষেধ এ চুক্তির খেসারত হিসেবে দীর্ঘকালের ইসলামি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতি ভাবধারা হারায় তুরস্ক। ১৯২৪ সালে ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাফত বিলুপ্তির মাধ্যমে কামাল আতাতুর্ক পাশার নেতৃত্বে আধুনিক গণতান্ত্রিক তুরস্কের পথচলা শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত বহমান। উল্লেখ্য, আগামী ২০২৩ সালে লুজান চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন এক পরাশক্তি তুরস্ককে আবিষ্কার করবে সে কথা অনুমেয়। তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে ২০০২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত টানা ১৮ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। যে দলের সফল নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েব এরদোয়ান। এই দীর্ঘ সময়ে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সাময়িক, সামাজিক, অর্থনীতি, রাজনীতি শিক্ষা খাতসহ প্রতিটি খাতে অভূতপূর্ব সাফল্য এনে দেয় দলটি। এমনকি পশ্চিমা বিশ্ব কখনো তুরস্কের নির্বাচন প্রসঙ্গ বা গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহস পায়নি। বরং দেশটি বিশ্বের বুকে উদার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও ২০১৬ সালে সেনা-অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটলে জনগণ তা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিহত করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়। বৈদেশিক পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতি অঙ্গনে তুরস্কের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে একেপি দলটি। ফলে, এশিয়া ও ইউরোপ উভয় মহাদেশে নিজের কদর কয়েক গুণ বাড়িয়েছে তুরস্ক। তুরস্কের বর্তমান অর্থনীতির পরিমাণ ৭৪৩ বিলিয়ন ডলার, যা বিশ্বে ১৯তম দেশ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। মাথাপিছু আয়ের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ডলার। আগামী ২০২৩ সাল ২৫ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নতির লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে তুর্কি সরকার। অথচ একেপি পার্টি ক্ষমতা গ্রহণের আগে মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৩ হাজার মার্কিন ডলার। শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে দেশটিতে। বর্তমান তুরস্কে পুরুষের শিক্ষার হার ৯৫ শতাংশ এবং নারীর শিক্ষার হার ৭৯ শতাংশ। সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি জীবনযাত্রার মান ও গড় আয়ু বেড়েছে কয়েক গুণ। তুরস্কের ৬০০ বছরের পুরোনো ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক এখন বিশ্ব দরবারে। বিভিন্ন ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে সুলতান শাসনামলের পুরোনো রূপকথার গল্প আবার নতুন করে জানার সুযোগ পেয়েছে দেশটির জনগণ। তুরস্কে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে সাময়িক খাতে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে। ১৯৫২ সালে ন্যাটো জোটে অন্তর্ভুক্ত হয় তুরস্ক। এরপর দীর্ঘকাল ন্যাটোর ছায়াতলে থাকলেও এপিকে পার্টি ক্ষমতা গ্রহণের পর নিজের সাময়িক শক্তির প্রভাব বিস্তার শুরু করে তুরস্ক, যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। তুরস্ক ন্যাটো জোট এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের হুমকি উপেক্ষা করে রাশিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের সাময়িক চুক্তিতে আবদ্ধ হয় দেশটি। এ ছাড়া পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র চীন, পাকিস্তান, ইরানের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে দেশটি, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ধরনের সুবিধা পাবে তুরস্ক, সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বর্তমান তুরস্কে নিজ দেশে কুর্দি উপজাতি ইস্যু নিয়ে বেশ অস্তিত্ব বিরাজ করছে। তুরস্ক সরকার কুর্দি সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি বিবেচনা করে সাময়িক অভিযান অব্যাহত রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্কে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। কথিত আছে, কুর্দি বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে তুরস্কের ভূখ-ে জঙ্গি হামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এখন তুরস্কের বিদেশনীতির দিকে একটু লক্ষ্য করা যাক, সিরিয়াযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ এবং নিজ সীমানা অক্ষত রাখতে সাময়িক অভিযান পরিচালনা করে দেশটি। এতে সিরিয়ার মুক্তাঞ্চলের নামে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয় তুরস্ক। এ ছাড়া লিবিয়াযুদ্ধে ত্রিপোলি সরকারের পক্ষে সেনা প্রেরণ করে নিজে দেশের সক্ষমতার পরিচয় দেয় তুর্কি সরকার। ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকায় ২০১৯ সালে ডিসেম্বর লিবিয়া সরকারের সঙ্গে সামুদ্রিক এবং নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর করে তুরস্ক। ফলে ভূ-মধ্যসাগরীয় এলাকায় খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানে দেশটির একক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে তুরস্ক, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সোমালিয়ায় সাময়িক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। সেই সঙ্গে, আফ্রিকা অঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশে সহযোগিতা এবং জঙ্গি দমনের লক্ষ্যে তুরস্ক সেনা পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। তুরস্ক আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। গত বছর আফ্রিকা দেশগুলোতে ১২ শতাংশ বাণিজ্য বৃদ্ধি করেছে। বর্তমান এ অঞ্চলে দেশটির বিনিয়োগের পরিমাণ সাত বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির অন্তর্জালে বেশ ভালোভাবেই প্রবেশ করেছে তুরস্ক। সিরিয়াযুদ্ধ নিরসনে ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তুরস্ক। মধ্যপ্রাচ্যে শান্ত প্রতিষ্ঠা, জঙ্গি বাদ দমনে তুরস্কের ভূমিকা অনবদ্য, যা তাদের বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে কূটনৈতিক সফলতা বহন করে। ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে বরাবরই প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর তুরস্ক। ইসরায়েলের যেকোনো অন্যায় কাজে প্রতিবাদ করে ফিলিস্তিনদের পাশে দাঁড়ায় দেশটি। এ ছাড়া ফিলিস্তিনদের মুক্তি আন্দোলনে হামাস রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ঐতিহাসিক সম্পর্ক বিদ্যমান। বলে রাখা ভালো, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের যেকোনো ইস্যু সমাধানে আঞ্চলিক শক্তি মিসরের জায়গা সুদৃঢ়ভাবে দখল করে নিয়েছে তুরস্ক। উল্লেখ্য, মিসরের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট এবং মুসলিম ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ মুরসির সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হলে গণতান্ত্রিক পথ রুষ্ট হয় দেশটিতে। ফলে দিন দিন আঞ্চলিক শক্তি এবং দক্ষ নেতৃত্ব হারায় মিসর। যে জায়গা এখন পাকাপোক্ত করেছে তুরস্ক। বিংশ শতাব্দীতে নির্যাতিত মুসলমানদের ত্রাণকর্তা হিসেবে তুরস্ক আবির্ভাব লক্ষণীয়। যেখানে রোহিঙ্গা ইস্যু, কাশ্মীর, চীনে উইঘুর মুসলমানদের নিরঙ্কুশ সমর্থন দিয়েছে তুরস্ক। শুধু তাই নয়, প্রায় দুই কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়ে মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এরদোয়ান সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-মধ্যসাগর অঞ্চলে তুরস্কের গ্যাস ও খনিজ তেল মহড়ায় গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে উত্তেজনা বেড়েছে। যেখানে গ্রিসকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিচ্ছে ফ্রান্স ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, যা আঞ্চলিক রাজনীতির প্রভাব লক্ষণীয়। কৃষ্ণ সাগর এলাকায় নিজ সীমানায় ৩২০ ঘনমিটার গ্যাস মজুদের সন্ধান পেয়েছে তুরস্ক, যা ২০২৩ সালে উৎপাদন শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে তুরস্কে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। উল্লেখ্য, তুরস্ক ইরান, রাশিয়া ও আজারবাইজান দেশ থেকে গ্যাস আমদানি করে থাকে। আগামী ২০২৩ সালে শেষ হতে যাচ্ছে তুরস্কের কুখ্যাত লুজান চুক্তির মেয়াদ, এতে দেশটি বিভিন্ন বিধিনিষেধ থেকে মুক্তি মিলবে। ফলে তুরস্কের অর্থনীতির চাকা পাল্টাবে ত্বরিত গতিতে। খনিজসম্পদ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা কমতে নতুন চুক্তির পথ সুগম হবে দেশটির। এ ছাড়া এশিয়া ও ইউরোপের অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ বসফরাস প্রণালি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠবে তুরস্ক, সে কথা অনুমান করা যায়। সুতরাং তুরস্ক হয়তো অদূর ভবিষ্যতে অতীতের সোনালি শাসনকাল ফিরিয়ে আনতে পারবে না কিন্তু আগামী দিনে বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে নতুন পরাশক্তি হিসেবে প্রকাশ ঘটাবে, সে কথা বলার বোধ হয় সময় এসেছে।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

 

 

"