ড. বেলাল হোসেন

  ২৫ জুন, ২০২০

বিশ্লেষণ

দুধ ও মাংস উৎপাদনে কৃত্রিম প্রজননের অবদান

আধুনিক পদ্ধতিতে ডাকে আসা গাভীকে ষাঁড় ছাড়া কৃত্রিম উপায়ে গাভীর জরায়ুতে উন্নত জাতের ষাঁড়ের বীজ দেওয়াই হচ্ছে কৃত্রিম প্রজনন। সাধারণ একটি ষাঁড় থেকে প্রতি বছর ৬০-৮০টি গাভীর প্রজনন করানো সম্ভব। সেখানে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে ৫ হাজার-১০ হাজার গাভীকে প্রজনন করানো যায়।

১৯৫৮ সালে দেশের ঈশ্বরদী, সৈয়দপুর, চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, প্রজনন এবং রোগ প্রতিরোধকল্পে কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতি চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১-৬৯ সালে সাভারে কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন কেন্দ্র স্থাপিত হয় এবং জার্মান সরকারের সহায়তায় অবকাঠামো উন্নয়নসহ বেশ কিছু যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি সংগৃহীত হয়।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। তারই আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১২৫টি ফ্রিজিয়ান ও জার্সি জাতের ষাঁড় অনুদান হিসেবে সংগ্রহ করার মধ্য দিয়ে কৃত্রিম প্রজননের যাত্রা হয়। ১৯৭৫-৭৬ সালে কৃত্রিম প্রজনন ও ঘাস উৎপাদনের জন্য দেশের ২২টি জেলায় গো-প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন হয়। ১৯৮৮-৮৯ সালে স্থানীয়ভাবে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রমে হিমায়িত সিমেনের ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৫-২০০০ সাল মেয়াদে ‘হিমায়িত সিমেন দ্বারা কৃত্রিম প্রজনন’ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী এ কার্যক্রম আরো সম্প্রসারিত হয়।

বঙ্গবন্ধুর ন্যায় তার সুযোগ্য কন্যাও কৃষিকে সর্বাদিক গুরুত্ব দিয়ে নানমুখী উন্নয়ন কর্মকান্ড হাতে নিয়েছে। যার ফলে দেশে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদফতরে ‘কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম সম্প্রসারণ ও ভ্রƒণ স্থানান্তর প্রযুক্তি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০১৬ সালে; যা সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২৬৫.৪৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশব্যাপী কার্যক্রম শুরু হয় এবং প্রকল্পটির প্রথম ও দ্ধিতীয় পর্যায় সফলতার সঙ্গে শেষ করে তৃতীয় পর্যায়ে চলমান রয়েছে।

২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত দেশে কৃত্রিম প্রজননের জন্য ৮ লাখ ডোজ সিমেন ব্যবহার করা হয়; যা ২০১০-২০১৯ সময়ে সিমেন ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ লাখ ডোজ। প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ৫২ লাখ গাভীকে কৃত্রিম প্রজননের আওতায় আনা হয়েছে। চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র কৃত্রিম প্রজনন সেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে কৃত্রিম প্রজনন পয়েন্ট চালু করা হবে এবং এরই মধ্যে ৩৫০০ পয়েন্ট চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এরই মধ্যে ৭৮০ জন এআই ও ৮৫০ জন এফএ টেকনিশিয়ানের (স্বেচ্ছাসেবী) প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সবাই কৃত্রিম প্রজনন পয়েন্টে কাজ করে যাচ্ছে।

ফরিদপুর ও চট্টগ্রামে বুল স্টেশন কাম কৃত্রিম প্রজনন ল্যাব নির্মাণকাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সিলেট, বগুড়া ও বরিশালে মিনি বুল স্টেশন কাম কৃত্রিম প্রজনন ল্যাব নির্মাণকাজও প্রায় সম্পন্ন হয়েছে এবং খুলনা ও রংপুরে নির্মাণকাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সাভার ডেইরি ফার্মে নিউক্লিয়াস হার্ড তৈরির জন্য ইতোমধ্যে সেক্সড সিমেন আমদানি করা হয়েছে। বর্তমানে মেটিং প্ল্যানিংয়ের কাজ চলছে। ব্রিডিং বুল তৈরির জন্য ইতোমধ্যে ১৭২টি ষাঁড় বাছুর সংগ্রহ করা হয়েছে। এরমধ্যে ৭৫টি ষাঁড়কে নির্বাচিত করা হয়েছে। একেকটি বুল বছরে জাতীয় অর্থনীতিতে পরোক্ষভাবে অবদান রাখবে ৫৩৩.০৩ কোটি টাকার। বাকি বুলগুলো নির্বাচনের জন্যে প্রস্তুত আছে। সুষম গো-খাদ্য নিশ্চিতের জন্য সাভারে একটি টিএমআর প্রদর্শনী প্লান্ট স্থাপনের জন্য পূর্ত কাজ চলছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে এআই কর্মীরা খামার পর্যায়ে মোট সেবার ৫২ শতাংশ সেবা দিয়ে আসছেন। বৃদ্ধি পেয়েছে সিমেন উৎপাদন ও কৃত্রিম প্রজনন।

দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্পটি চলমান থাকায় দেশে মাংস ও দুধের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের দেশের মাংসের চাহিদা ৬.৭৩ মিলিয়ন টন। সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৭.১৬ মিলিয়ন টন। অর্থাৎ চাহিদার থেকে ০.৪৩ মিলিয়ন টন বেশি উৎপাদন হচ্ছে। প্রতিদিন জনপ্রতি মাংসের চাহিদা ১২০ গ্রাম সেখানে পাচ্ছে ১২৪.৯৯ গ্রাম। অন্যদিকে আমাদের দুধের চাহিদা বছরে ১৪.৬৯ মিলিয়ন টন উৎপাদিত হচ্ছে ৯৯ লাখ ২৩ হাজার টন। প্রতিদিন জনপ্রতি চাহিদা ২৫০ মিলির মধ্যে ১৬৫.০৭ মিলি. উৎপাদন হচ্ছে, অচিরেই এই ঘাটতি উৎপাদন পূরণ সম্ভব হবে।

দেশে দুধের উৎপাদন আগের চেয়ে কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তার বহুমুখী ব্যবহার হচ্ছে যেমন প্রাস্তুরাইজড, টঐঞ, কনডেন্সড, চকলেট ইত্যাদি দুধ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি দুধ থেকে তৈরি হচ্ছে মূল্যবান পণ্য ক্রিম, মাখন, ঘি, বাটার, মিষ্টি ইত্যাদি। আর এসব প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প তৈরির ফলে ব্যাপক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

করোনাকালীন ও করোনা-পরবর্তী বিশ্বে আমিষের চাহিদা অনেক বেড়ে যাবে। ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত দেশের লোকসংখ্যা ১৬ কোটি ৬০ লাখ ধরে দুধের যে চাহিদা নিরূপণ করা হয়েছে, তার চেয়ে কম উৎপাদন হলেও দেশের মানুষের একটা অংশ শারীরিক সমস্যাজনিত কারণে দুধ বা দুধজাতীয় কোনো খাদ্য খেতে পারেন না। দেশের দরিদ্রশ্রেণির একটা অংশ সচেতনতা সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণে নিয়মিত পরিমাণমতো দুধ খেতে পারছে না। এর কারণে বর্তমানে দেশে উৎপাদিত দুধের বিরাট একটা অংশ অবিক্রীত থাকে বা কম দামে খামারিদের বিক্রয় করতে হয়। এমতাবস্থায় দেশে চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদিত মাংস ও প্রক্রিয়াজাত দুধ রফতানি করতে পারলে দেশে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। পাশাপাশি দেশে ও দেশের বাইরে চাহিদা তৈরি হলে এই সেক্টরের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিপুল পরিমাণ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বিদেশে রফতানির বাজার সৃষ্টির দিকে ইতোমধ্যে নজর দিয়েছে সরকার; যা বাস্তবায়িত হলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি সম্ভব হবে। সম্প্রতি মিসরের রাষ্ট্রদূত দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রাণালয়ের মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের প্রাণিজ আমিষ রফতানির বিপুল সম্ভাবনার কথা জানান।

টিএমআর গবাদিপশুর জন্য একটি সুষম খাদ্য, যার মধ্যে প্রয়োজনীয় সব খাদ্য উপাদান বিদ্যমান থাকে। ফলে দুধ ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। তার সঙ্গে টিএমআর মেশিন ব্যবহারের ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ষাঁড় ও গাভীসমূহকে কানে ট্যাগিং করে তথ্য সংরক্ষণ করা হবে; যা মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে ডাটা কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে জমা হবে। যার মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজননের সময় প্রজনন কর্মীরা ট্যাগিং-এর তথ্যসমূহ দেখে সঠিক সিমেন নির্বাচন করতে পারবে।

ষাঁড়/বকনার ডিএনএ পরীক্ষা করে পরীক্ষিত বাবা-মায়ের ডিএনএ-এর সঙ্গে মেলানো হবে। ফলে প্রজেনী টেস্টের ফলাফলের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে না। এতে জেনারেশন ইন্টারবেল কমে গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে খামারিদের চাহিদার নিরিখে শতভাগ শাহীওয়ালা ষাঁড়/সিমেন আমদানি বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, দেশব্যাপী কৃত্রিম প্রজননের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় লিকুইড নাইট্রোজেন প্লান্ট স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করি। কৃত্রিম প্রজনন প্রকল্পটির মাধ্যমে একদিকে প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে; অন্যদিকে খামারিদের আধুনিকায়নের সঙ্গে পরিচয় করাচ্ছে কৃত্রিম প্রজনন কর্মীরা।

লেখক : কৃষিবিদ, প্রকল্প পরিচালক

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়