সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

  ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

প্রত্যাশা

নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে থাকুক অতিথি পাখি

আমাদের গৃহে কোনো অতিথি এলে আমরা ভীষণ খুশিই হই। বলা হয়ে থাকে, অতিথি নারায়ণ। তাই অতিথি সেবায় সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। আদর-আপ্যায়নে আমাদের কোনো কমতি থাকে না। তবে দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য যে, অতিথি পাখিদের ক্ষেত্রে এর উল্টোটাই ঘটে থাকে। শীতকালে খাবারের সন্ধানে ও নির্বিঘেœ বেঁচে থাকার আশায় হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আমাদের দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে একদল পাখি। ভিনদেশ থেকে আমাদের দেশে আসে বলেই আমরা তাদের বলে থাকি অতিথি পাখি। তাদের আগমনে ও প্রাণবন্ত কোলাহলে যেন শীতের প্রকৃতি প্রাণ ফিরে পায়। প্রকৃতির কাছে গিয়ে তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রকৃতিপ্রেমী উৎসুক মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে জলাশয়কেন্দ্রিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। তবে আমাদের দেশের কিছু অসাধু লোভী মানুষ এই অতিথি পাখিদের শিকার করে নির্বিচারে হত্যা করে আসছে বছরের পর বছর ধরে। সরকার কঠোর আইন করেও এটা পুরোপুরিভাবে বন্ধ করতে পারছে না। এর মূল কারণ হচ্ছে, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাব।

প্রতি বছরই শীতকালে অতিথি পাখিদের কলকাকলীতে মুখর হয় আমাদের দেশ। আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই শীতের অতিথি পাখিদের দেখা যায়। শীতকাল এলে শীতপ্রধান দেশের পাখিরা দেশভ্রমণে বের হয় বেঁচে থাকার জন্য। মূলত আমাদের দেশে আসে সাইবেরিয়া এবং হিমালয় অঞ্চলের পাখিরা। শীতকাল এলে ওইসব দেশের ভূভাগ ও জলাশয়গুলো বরফে ঢেকে যাওয়ায় সেখানকার পাখিরা, বিশেষ করে সেসব দেশের হাঁস, বক ইত্যাদি জলচর পাখি প্রয়োজনীয় খাবার পায় না। তখন তাদের বেঁচে থাকার জন্য তো খাবার প্রয়োজন হয়। শীতপ্রধান দেশের পাখিরা তখন দেশান্তরী হতে শুরু করে। পাড়ি জমায় এমন দেশে যেখানে হাওর-বাওড়, নদীনালার কোনো অভাব নেই, খাবারের সমস্যা নেই। এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের নাম উল্লেখযোগ্য। শীতটা কাটিয়ে আবার ওরা পাড়ি জমায় নিজ দেশে। এরই ভেতর পাখিপ্রেমিকরা মন ভরে দেখে নেয় তাদের।

শীতের মৌসুমে আসা অতিথি পাখিদের মধ্যে রয়েছে বালিহাঁস, পাতিহাঁস, লেজহাঁস, পেরিহাঁস, চমাহাঁস, জলপিপি, রাজসরালি, লালবুবা, পানকৌড়ি, বক, শামুককনা, চখপখিম সারস, কাইমা, শ্রাইক, গাঙ কবুতর, বনহুর, হরিয়াল, নারুন্দি, মানিকজোড়াসহ নাম না জানা আরো অনেক পাখি। প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ১৫ প্রজাতির হাঁস ছাড়াও গাগিনি, গাও, ওয়েল, পিগটেইল, ডাটাস্মক, থাম, আরাথিল, পেরিক্যান, পাইজ, শ্রেভির, বাটান এসব পাখি এসে থাকে। দেশান্তরী এসব পাখির মূল বাসভূমি শীতপ্রধান এলাকা। সাইবেরিয়াসহ হিমালয়ের বনাঞ্চলে এদের বাস। শীত বাড়তেই এরা পাড়ি জমায় হাজার মাইল দূর দেশে। প্রাণীবিজ্ঞানীদের কথায়, বাংলাদেশের পাখি দুই শ্রেণির। আবাসিক আর অনাবাসিক। অতিথি পাখি অনাবাসিক শ্রেণির। আবাসিক ও অনাবাসিক মিলে আমাদের দেশে পাখি প্রায় ৬৫০ প্রজাতির। এরমধ্যে ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক। বাকি ৩০০ প্রজাতি অনাবাসিক। সব অনাবাসিক পাখি শীতের সময় আসে না। ৩০০ প্রজাতির মধ্যে ২৯০টি শীত মৌসুমে আসে ও ১০টি প্রজাতি থেকে যায়।

আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় শীতের এই অতিথি পাখিদের বিচরণ দেখতে পাওয়া যায়। প্রতি বছর শীতের শুরুতেই ওরা আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। নানা রং আর আকৃতির অতিথি পাখির কোলাহলে মুখরিত হয় নদীপাড়, বিল-ঝিল, বন-বাদাড় সব। বাংলাদেশের বেশ কিছু জায়গায় আনা গোনা দেখা যায় তাদের। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, মিরপুর চিড়িয়াখানা, মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের পাশের লেক, মহেশখালী দ্বীপ, পঞ্চগড়, ভিতরগড়, চরভাটা, শিবালয়, হালহাওর, হাকালুকি হাওর, কুয়াকাটা, ঘাটিভাঙা, কলাদিয়া, চরণদ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ, চর ওসমান, শাহীবানীচর, সন্দ্বীপ, চরমনতাজ, নেত্রকোনার কলমকান্দার হাওর, কিশোরগঞ্জ হাওর, সুনামগঞ্জ হাওর হাতিয়া দ্বীপ, চরপিয়া, ডালচর যামিরচর, মৌলভীবাজার, টাঙ্গুয়ার হাওর, চর কুকড়িমুকড়ি, গলাচিপা, খেপুপাড়া, জোনাকচর, বুড়িগঙ্গা নদী, হোয়াইকিয়ং, শাহপরীর দ্বীপ, মনপুরা, সোনারচর, চরনিজাম, চরমানিক, চরদিয়াল, আগুনমুখা প্রভৃতি।

আমাদের দেশে প্রতিনিয়তই অতিথি পাখির আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, খাবারের অনুপযোগী কিংবা মানুষের বসতি হয়েছে। একশ্রেণির লোভী শিকারির নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির অতিথি পাখি। জালের ফাঁদ পেতে, বিষটোপ এবং ছররা গুলি দিয়ে নির্বিচারে অতিথি পাখি শিকার চলছে প্রতিনিয়ত। কেউ শখের বশে আবার কেউ বাজারে বিক্রির জন্য অতিথি পাখিদের ধরে চলেছে। অতিথি পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করে ফেলায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে কৃত্রিম সার এবং মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে তারা মারা যাচ্ছে। এ ছাড়াও আমরা বাঙালিরা অতিথি পাখি দেখতে গেলেই পাখির খুব কাছে যেতে চাই, ছবি তুলতে চাই। ক্যামেরার ক্লিক বা নীরবতা ভঙ্গ করলে পাখিরা বিরক্তরোধ করে এবং অন্যত্র চলে যায়। আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যামেরায় ক্লিক দিই। একই কারণে অনেক পাখির আবাসস্থলে পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এ থেকে আমাদের সতর্ক হতে হবে। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ক্যামেরা বা শব্দযন্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন ছাড়া একেবারেই কমিয়ে আনতে হবে। বেশ কিছু বছর ধরে শীত মৌসুমে বাংলাদেশে অতিথি পাখি এলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে অতিথি পাখি আসাটা অনেকাংশেই কমে যাচ্ছে।

২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী, পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক লাখ টাকা জরিমানা, এক বছরের কারাদন্ড বা উভয় দন্ড। একই অপরাধ আবার করলে শাস্তি ও জরিমানা দ্বিগুণ। একইভাবে কোনো ব্যক্তি যদি অতিথি পাখির মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করেন, দখলে রাখেন কিংবা ক্রয়-বিক্রয় করেন বা পরিবহন করেন, সেক্ষেত্রে তার সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হওয়ার আইন প্রচলিত রয়েছে। অতিথি পাখি নিধন এবং বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ জেনেও আইনের ফাঁক গলিয়ে একশ্রেণির পেশাদার এবং শৌখিন শিকারি কাজগুলো করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনকে প্রয়োগ করতে হবে কার্যকারভাবে। তৎপরতা বাড়াতে হবে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনকে। পাশাপাশি হাওর এলাকার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান দরকার।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যও পাখিদের বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে। পাখি হলো প্রকৃতির কীটনাশক। পাখির সংখ্যা কমে গেলে কীটপতঙ্গের অত্যাচারে অসম্ভব হয়ে পড়বে ফসল ফলানো। সেটিই যদি হয়, তাহলে নির্ভর করতেই হবে কীটনাশকের ওপর। কিন্তু এটি তো পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। যে দেশে পাখি বেশি, সে দেখে পর্যটকের সংখ্যাও বেশি। কাজেই পাখি ঘাটতি অবশ্যই উদ্বেগের ব্যাপার। পাখি নিসর্গকে সুন্দর করে, চোখকে প্রশান্তি দেয়, সৌন্দর্য চেতনাকে আলোড়িত করে। পাখিরা আসুক, ওদের কলকাকলীতে ভরে উঠুক আমাদের চারপাশ। আর আমরা অতিথি পাখিদের শিকার না করে, পাখিদের উৎপাত না করার মাধ্যমে তাদের প্রতি সদয় হয়ে বাড়িয়ে দিই আমাদের মানবিক আচরণ। অতিথি পাখি আমাদের প্রকৃতির বন্ধু, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারা অতিথির ন্যায় আমাদের দেশে কিছুটা সময় নির্বিঘেœ বেঁচে থাকুক এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে মুক্ত ডানা মেলে নিজ দেশে ফিরে যাক।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

"

প্রতিদিনের সংবাদ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • পাঠক প্রিয়